পেখম এসেছিল বিকেলের দিকে। একটা পামগাছের নীচে অপেক্ষা করছিল কাজু। নরম ঘাসের ওপর শুয়ে একটা বইয়ের পাতা উলটোচ্ছিল। তখনই শাড়ির খসখস শুনতে পেয়েছিল ও।
পেখম কোনও সেন্ট ব্যবহার করে না, কিন্তু তাও ও কাছে এলেই কাজু কী অদ্ভুত একটা নরম চন্দন মেশানো কর্পূরের গন্ধ পায়! কেন পায়? কোথা থেকে এই গন্ধ ভেসে আসে কে জানে!
আর শুধু কাছে এলেই নয়, ঘুম ভেঙে উঠে বসা মাঝরাতে, একাকী দুপুরের মনখারাপে বা ভোররাতের স্বপ্নের মধ্যেও এই অদ্ভুত নরম একটা গন্ধ জোনাকির মতো একা পিটপিট করে বুকের মাঝে! ওর অন্ধকার জীবনে কেমন অদ্ভুত সবুজ-হলুদ এক আলো জ্বালিয়ে দেয়! সেই আলোটুকুতেই যেন কাজু দেখতে পায় নিজেকে। ওর মনে হয় জোনাকির আলোর গন্ধ কি এমন চন্দন মেশানো কর্পূরের মতো হয়?
গতকাল ঘাসে শুয়ে বইয়ের দিকে চোখ থাকলেও সেই গন্ধটা আচমকা ভেসে এসেছিল বিকেলের রোদে। আর কাজু না তাকিয়েও বুঝতে পারছিল কে এসে দাঁড়িয়েছে মাথার কাছে।
লেবু-হলুদ শাড়ি আর ঘন সবুজ ব্লাউজ় পরেছিল পেখম। গায়ে পাতলা একটা চাদর জড়ানো।
উঠে বসেছিল কাজু। বইটা ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রেখেছিল পাশের ঝোলায়। বুকের ভেতরে তিতির পাখি কাঁপছিল কাজুর! পেখমকে দেখলেই এমন একটা কাঁপন টের পায় ও।
পেখম বসেছিল ঘাসে। শীতের মফস্সলে বিকেল নামছিল ধীরে। আকাশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া সূর্য দিগন্তের দিকে যেতে-যেতে আরও কমলা হয়ে উঠছিল যেন। আর হাওয়া আসছিল। শেষ শীতের দিক থেকে বসন্তের দিকে যেতে-যেতে হাওয়া সোনাঝুরি ছুঁয়ে যাচ্ছিল একটু-একটু করে। কাজুর মনে হচ্ছিল এই বিকেলটা যেন সারা জীবন ধরে চলে।
“বলো!” পেখমের স্বরে অজস্র প্রজাপতি ছড়িয়ে গিয়েছিল সোনাঝুরির হাওয়ায়।
কাজু তাকিয়ে ছিল সেই সব প্রজাপতির দিকে। কথা বলতে পারছিল না একটুও। মনে হচ্ছিল ওর গলার আওয়াজ পেলেই সব প্রজাপতি মিলিয়ে যাবে নিমেষে।
“আরে! খালি তাকিয়ে থাকে!” পেখম সামান্য লজ্জা পেয়ে আলতো করে চিমটি কেটেছিল কাজুর হাতে।
কাজু হেসেছিল। কথা, শব্দ, বাক্য মাঝে মাঝে অর্থহীন হয়ে যায়। মাঝে মাঝে দৃষ্টিপাতের চেয়ে সহজ কথোপকথন আর কিছু হয় না।
“আচ্ছা, আমি তবে আসি,” সামান্য বিরক্ত হয়ে পেখম উঠে যাচ্ছিল।
এবার ওর হাতটা ধরেছিল কাজু। বলেছিল, “ছটফট করছ কেন?”
পেখম বলেছিল, “মা রাগ করছিল খুব। বলছিল, কোথায় যাচ্ছি? কলেজ নেই কিছু নেই, তাও কেন বেরোচ্ছি। জানোই তো! আর তুমি তো কাল আসতেই বাড়িতে। কেন আজ ডাকলে?”
কাজু হেসেছিল সামান্য। তারপর বলেছিল, “আচ্ছা, এমনি ডাকা যায় না?”
পেখম মাথা নিচু করে নিয়েছিল। বলেছিল, “যায় তো। কিন্তু মা… মা খুব রাগ করে… আমার ভয় করে, যদি তোমায় আর আমাদের বাড়ি যেতে না দেয়! তাই আমি সাবধানে থাকি। আমার ইচ্ছে-টিচ্ছেয় তো মা তেমন আমল দেয় না কখনও!”
কাজু মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। ওই মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে বলে যাওয়া পেখমের কথাগুলো আসলে কথা নয়! এসব ধ্বনি আসলে প্রজাপতিদের জন্ম দেয়!
কাজুর এমনি পেখমকে দেখতে ইচ্ছে করছিল বলে ও বিজনকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিল। ও জানে পেখমের বাড়িতে এসব অসুবিধে আছে। কিন্তু তাও আজ এমন একটা কষ্ট হচ্ছিল যে, ইচ্ছে করছিল এই নির্জনে দেখা করতে।
পেখম আবার বলেছিল, “ঠিক আছে দেখা তো হল, এবার আমি আসি?”
কাজু হেসেছিল, “কেন? আর-একটু বোসো। আশপাশে কে আছে যে, দেখে ফেলবে?”
“মিল ছুটি হলেই কাতারে-কাতারে লোক বেরিয়ে আসবে। তখন? মিল ছুটির সময় হয়ে গেল তো!”
কাজু হেসে বলেছিল, “দেখলে কী হবে? বাড়িতে বলে দেবে?”
পেখম নামিয়ে নিয়েছিল মাথা। বলেছিল, “গতকালও মা খুব অশান্তি করেছে। ছোটকাকিমার বাপের বাড়ি জামশেদপুর। সেখান থেকে কে যেন একটা সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে। ছেলে ডাক্তার। আমি ‘না’ বলেছি বলে মা গতকাল খুব রাগ করছিল। আমার আজ বাইরে থাকাটা মা ভাল মনে নেবে না। তাই বলছি দেখা তো হল… আর কী-ই বা এত দেখো! এলাম তো! কী হল এতে!”
কাজু তাকিয়েছিল পেখমের দিকে। বুকের ভেতর অসংখ্য তিতির এসে ডানা ঝাপটাচ্ছিল! ওই মুখ নিচু করে বসে থাকা পেখম। ওই ছোট্ট গোলাপি পাপড়ির মতো ঠোঁট! কমলা আলো লেগে সামান্য রাঙা হয়ে ওঠা গাল কোথায় যেন মেরে ফেলছিল ওকে! প্রেম এমন নিঃশব্দে এসে মেরে ফেলে যে, মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না কখন সে আর নেই!
“কী দেখি? কেন পাগল হই? কী হল এতে?” কাজু হাসল। চোখ বন্ধ করল খানিক তারপর বলল:
“Come to the orchard in Spring.
There is light and wine, and sweethearts
in the pomegranate flowers.
If you do not come, these do not matter.
If you do come, these do not matter.”
পেখম কিছু না বলে শুধু ছলছলে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। আর দূরে বসেও সেই কর্পূর-চন্দনের গন্ধটা আবার পেয়েছিল কাজু!
পেখম আর-একটু সময় বসেছিল। তবে কথা বলেনি একবারও। শুধু কমলা বিকেল গাঢ় হয়ে উঠছিল পেখমকে নিজের কাছে পেয়ে।
একসময় পেখম উঠে চলে গিয়েছিল নিঃশব্দে। কিন্তু আসলে নিঃশব্দে নয়। যাওয়ার আগে পেখম একবার চোখ তুলে তাকিয়েছিল কাজুর দিকে। আর কাজু আবার স্পর্শ পেয়েছিল। শব্দের অতীত এক স্পর্শ! হাজার-হাজার বছর ধরে যা গ্রন্থিবিহীনভাবে বেঁধে রেখেছে প্রেম-বদ্ধ নারী-পুরুষকে!
