ড্রাইভার সিগন্যাল পার করে ওদের নামিয়ে দিল। ওরা নামবে বলে আইকাকেও নেমে দাঁড়াতে হল। আইকা শুনল ওই টিটি বলে ছেলেটা চাপা গলায় বলছে, “কী বলল শুনলি? স্যার! শালা খিস্তি দিয়ে ছাড়া আর কেউ কোনওদিন কিছু বলে ডেকেছে আমাদের? এটাও রিতুদার জন্য।”
ফ্ল্যাটের সামনে যখন পৌঁছল আইকা, সাড়ে ন’টা বেজে গিয়েছে। গেটের কাছে সুশান্ত মাগোকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাগো আইকাকে দেখামাত্র হাত বাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ল! আইকা হেসে কোলে তুলে নিল ওকে।
সুশান্ত বলল, “দিদি, আপনি এই এলেন। ফ্রেশ হয়ে নিন, তারপর ওকে আমি দিয়ে আসব আপনার কাছে!”
আইকা মাগোকে কোলে করে লিফটের দিকে এগোতে-এগোতে বলল, “চড় খাবি বুড়োবয়সে?”
লিফটের মধ্যে আইকা মাগোর সঙ্গে একটু খেলে নিল। মেয়েটা খিলখিল করে খুব হাসে। আইকার কাঁধের ব্যাগের মধ্যে ঝুঁকে পড়ে খোঁজে আজ আইকা কী নিয়ে এসেছে ওর জন্য।
আইকা রোজ মাগোর জন্য কিছু না-কিছু নিয়ে আসে। আজও ট্যাক্সি থেকে নেমে মিল্ক চকোলেট নিয়ে এসেছে। মাগো ব্যাগের চেন খুলতে চেষ্টা করছে দেখে আইকা নিজেই সেটা বের করে দিল। মেয়েটা সেটা নিয়েই হেসে উঠল আবার!
আইকা জানে মাগো এটা একা খাবে না। প্যাকেট খুলে নিজের হাতে আইকাকে খাইয়ে দেবে কিছুটা। ওইটুকু সময়ের জন্য সারাদিন আইকা অপেক্ষা করে। খুব খারাপ কাটা দিনও ওইটুকু সময়ের ছোঁয়ায় কতবার যে ভাল হয়ে উঠেছে!
আইকা নিজের ফ্ল্যাটের দিকে যাওয়ার সময় আচমকা থমকে দাঁড়াল। আরে, পুটুমাসিদের ফ্ল্যাটের দরজা সামান্য খোলা কেন?
পাশের ফ্ল্যাট, সামনে দিয়েই যেতে হয়। আইকা একবার বেলটা বাজিয়ে দরজাটা সম্পূর্ণ ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। দেখল, আজ বসার ঘরে রাঙামেসোও বসে আছে। টিভি বন্ধ। কেমন একটা খুশি-খুশি হাওয়া খেলছে ঘরে।
ওকে দেখেই মেসো হাসল। বলল, “তুই আবার কবে থেকে বেল বাজিয়ে ভেতরে আসতে শিখলি!”
আইকা কী বলবে বুঝতে পারল না। ও অবাক হয়ে দেখল পুটুমাসি আর নোঈর মাঝখানে সোফায় বসে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে পুশকিন।
১০. কাজু
ঘোষ বাইন্ডিং-এর সামনের কাঠের নড়বড়ে বেঞ্চটায় বসে রয়েছে ঝিকু। একমাথা কাঁচা-পাকা চুল। কালো-সাদায় জড়িয়ে যাওয়া গোঁফদাড়ি। চোখ দুটো হলদেটে। বেঞ্চটায় উবু হয়ে বসে এদিক-ওদিক দেখছে। রাস্তার উলটো দিক থেকে মানুষটাকে দেখল কাজু। সতু পাশে দাঁড়িয়ে বিড়ি কিনছে দোয়ারিদের দোকান থেকে। বিড়ি আর মৌরি লজেন্স। কাজু নেশা করে না কোনও। সতুকেও বকে এইসব বিড়ি-সিগারেট খায় বলে। কিন্তু সতু তো আর শোনার ছেলে নয়, বরং বিড়ি খেলে সমাজের কী উপকার হতে পারে, সেটা ওকে সবিস্তারে বলে দেয়। এও যে একটা কুটির শিল্প এবং এটাকেও যে বাঁচিয়ে রাখা মানুষের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, সেটা নানাভাবে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করে।
কাজু মানতে চায় না। কিন্তু মনে মনে এটাও বোঝে, ও যেমন মানতে চাইছে না তেমন সতুও মানতে চাইছে না ওর কথা। আসলে জীবনে একটা সময়ের পরে কেউ কারও কথাই মানতে চায় না। ইগো, লজিকের চেয়ে বড় হয়ে যায়। আজকাল তাই আর কিছু বলে না সতুকে। কিন্তু সতু বোঝে। তাই বিড়ি-সিগারেট খাওয়ার সময় কাজুর সঙ্গে নরম করে কথা বলে।
কাজু তাকাল ঝিকুর দিকে। মানুষটা কেমন হয়ে গিয়েছে! ছোটবেলায় দেখত এই লোকটাই কী ফিটফাট হয়ে মিল-এ যাচ্ছে চাকরি করতে। কিন্তু তারপর যে কী হল!
কেউ বলে প্রেমে পড়ে ঝিকুর এমন অবস্থা হয়েছে। কেউ বলে ওর ভাইরা ওকে খাবারে ওষুধ মিশিয়ে পাগল করে দিয়েছে। কেউ আবার বলে, ও নাকি পরি দেখেছিল জোনাক-বাড়ির পেছনের গঙ্গায়!
যাই হোক না কেন, মানুষটা এমন একটা বাতিল অঙ্ক-খাতার মতো পড়ে আছে, দেখতে খুব খারাপ লাগে ওর। কষ্ট হয়। মনে হয় কিছু করে। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারে না।
গতকাল পেখমকে দেখে হঠাৎ ঝিকুর কথা মনে পড়েছিল কাজুর।
পেখম এসেছিল হস্টেলের মাঠে। সোনাঝুরির এই দিকটা খুব সুন্দর। মিলের লোকজনের জন্য যেমন কিছু কোয়ার্টার্স আছে, তেমনই হস্টেলও রয়েছে। হস্টেলের পেছনেই খাবারের মেস। হৃষীকেশদা রান্না করে মেসে। দুপুরে আর রাতে বেশ ভিড় থাকে। কিন্তু বিকেলের দিকটায় হস্টেলের পেছনের মাঠটা খুব নির্জন আর শুনশান হয়ে থাকে।
ওদিকটায় বেশ কিছু সার দেওয়া পামগাছ আছে। আর আছে বট-অশ্বত্থের ভিড়। এদের ছায়ায় জায়গাটায় কেমন একটা একা-একা ভাব তৈরি হয়।
পেখমকে ও বলেছিল ওইখানে আসতে। পেখম খুব একটা বাড়ি থেকে বেরোয় না এখন। ওর মা সারাক্ষণ ওকে চোখে-চোখে রাখে। এমনকী পারলে, ওর সঙ্গে কলেজেও যায়!
সতু বলে, “তুই শালা সোনাঝুরিতে দেখা করিস কেন ওর সঙ্গে? কলকাতায় দেখা করতে পারিস না?”
কলকাতায় পেখমের সঙ্গে দেখা করে কাজু, কিন্তু সেটা খুব অল্প কয়েকবারই হয়েছে। আসলে নয়না থাকে পেখমের সঙ্গে। নয়না কলেজ না গেলে ওদের দেখা হয়। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, নয়না কেমন যেন পেখমের সঙ্গে সেঁটে থাকে, একটুও জায়গা দেয় না ওদের।
নয়নারা এখন নেই এখানে। পুরী বেড়াতে গিয়েছে। নয়নার জ্যাঠার একটা ফোটো স্টুডিয়ো আছে স্টেশনের কাছে। ওর জেঠতুতো দাদা সেটা চালায়। তার কাছ থেকেই জেনেছে যে, সাত দিনের জন্য বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছে নয়না।
