পুটুমাসি শেষ চেষ্টা করার মতো করে বলেছিল, “আবার একবার ভেবে দেখ, আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যাবে কিন্তু।”
নোঈ শুধু ছোট্ট করে বলেছিল, “এত দুর্বল ঘাড় হলে তো মুশকিল!”
আচমকা মুঠোর মধ্যে থাকা মোবাইলটা কেঁপে উঠল। আইকা চমকে উঠল। ও কি ঘুমিয়ে পড়েছিল! কতটা এল গাড়ি? সামান্য সোজা হয়ে বসল আইকা। আবছায়া গাড়ির ভেতরে সামান্য একটু সময় আইকার কেমন যেন লাগল। মাথাটা যেন পুরো ফাঁকা হয়ে গিয়েছে!
ও আলগোছে পাশে তাকাল একবার। ছেলেদুটো নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় কথা বলছে। এবার রাস্তার দিকে তাকিয়ে সায়েন্স সিটি চিনতে পারল আইকা। মানে সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছিল ও!
ফোনটা এখনও মুঠোর ভেতর কাঁপছে! আইকা দেখল স্ক্রিনটা। অচেনা নাম্বার! এখন কে ফোন করল?
ও ফোনটা ধরে কানের কাছে নিল। আলতো গলায় বলল, “কে বলছেন?”
“আমি তারকবাবুর কাছ থেকে বলছিলাম,” ও পাশের গলাটা খরখরে। সামান্য রূঢ়।
“পার্ডন,” নিজের অজান্তেই আইকার ভুরু কুঁচকে গেল। আজকাল কী যে হয়েছে! বেশির ভাগ মানুষ কেমন একটা বিরক্তি আর রাগ মেশানো গলায় কথা বলে! সবার যেন প্রচুর তাড়া! সবার প্রচুর কাজ! সবাই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে, এমন একটা ভাব। আইকার মনে হয়, আসলে কি সবাই একটা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগে? তাই কি বাইরে এমন একটা বর্ম পরে থাকে?
“কী?” লোকটা থমকে গেল এক মুহূর্ত।
আইকা বুঝল ইংরেজিটা বুঝতে পারেনি।
তারপর আবার বলল, “আরে, আমি সোনাঝুরির তারক চক্রবর্তীর অফিস থেকে বলছি। স্যারকে আপনি ফোন করেছিলেন না কাজের ব্যাপারে, তাই স্যার বললেন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন,” আইকা এবার নড়েচড়ে বসল। আরে, লোকটা সোনাঝুরি থেকে ফোন করেছে! ওই প্রজেক্টের ব্যাপারে কথা বলতে সত্যিই তারক চক্রবর্তীকে কয়েকদিন আগে ফোন করেছিল আইকা। কিন্তু ভদ্রলোক কথা বলতে পারেননি। শুধু বলেছিলেন, ঠিক সময়ে ডেকে নেওয়া হবে। আইকা বুঝতে পারেনি কতদিনে ঠিক সময় হবে!
এখন ভাবল লোকটা ভুলে যায়নি।
লোকটা বলল, “স্যার বললেন, আপনি পরশুদিন একবার আসবেন। এই সকাল দশটার দিকে।”
“ঠিকানাটা একটু বলবেন?”
“ঠিকানা?” লোকটা হাসল, “আরে, স্টেশনে নেমে যে-কোনও রিকশাওয়ালাকে বলবেন তারক চক্রবর্তীর অফিসে যাব, নিয়ে যাবে। আর গাড়িতে এলে সোনাঝুরি ব্রিজের কাছে এসে একই কথা যে-কাউকে জিজ্ঞেস করবেন। সোনাঝুরিতে থাকতে হলে তারক চক্রবর্তীর অফিসটা চিনতে হয়। বুঝলেন? দেরি করবেন না। স্যারের হেভি কাজ থাকে। নমস্কার।”
ফোনটা কেটে চুপ করে বসে রইল আইকা। গাড়ি জ্যামে থামতে-থামতে এখন বালিগঞ্জ স্টেশন পেরিয়ে গড়ি়য়াহাট মোড়ের দিকে দৌড়োচ্ছে।
রুপিনকে কি একবার ফোন করে জানাবে? রাত হয়ে গিয়েছে। যদিও রুপিন একাই থাকেন। আলিপুরে কোথাও একটা ফ্ল্যাট আছে। কিন্তু তাও এমন সময় কি ফোন করে জানানোটা ঠিক হবে?
নাঃ, কাল অফিসেই জানাবে। মত বদলে বাইরের দিকে তাকাল আইকা। গড়িয়াহাটের সিগন্যালটা আজ খোলা আছে। তাই জ্যাম পেরিয়ে গাড়ি রাসবিহারীর দিকে যাচ্ছে। তবে দ্রুত যেতে পারছে না। সিগনালটা পেরিয়েই অটোস্ট্যান্ড। সেখানে এমন করে গাড়িগুলো জটলা পাকাচ্ছে, বিরক্ত লাগছে আইকার! নিজের গাড়িটা আনলে কত সুবিধে হত! ঋষিটাকে আর জাস্ট নিতে পারছে না ও! আইকা ভবানীপুর যাবে। ছেলেগুলোও নিশ্চয় সামনে কোথাও নামবে।
বাইরের দিকে চোখ থাকলেও এবার ছেলেগুলোর কথা কানে আসতে লাগল ওর।
জানলার দিকে বসা মাথায় ব্যান্ড পরা ছেলেটা চাপা গলা বলল, “তুই শালা গান্ডুই রয়ে গেলি। তোকে রিতুদা বলল একটা মেশিন রাখতে, তুই সতীপনা করতে শুরু করে দিলি। আরে, দাদার কথা শোন, পেলেয়ার কোটায় ভাল জাগায় ঢুকিয়ে দেবে। রিতুদা তোর ওপর ভরসা করে মাহির। এমন উদো হয়ে থাকিস না।”
মাহির বলে ছেলেটা যে আড়চোখে আইকাকে দেখল একবার, সেটা খুব ভাল বুঝতে পারল ও।
মাহির এবার চাপা গলায় বলল, “তোকে বলেছি না, এমন জায়গায় মুখ সামলে কথা বলবি! এত গালাগালি দিস কেন? তোর লজ্জা নেই, আমার আছে। এদিকে আমার মাথাখারাপ হয়ে যাচ্ছে! জানিস তো ভাইটার কী হাল! ডাক্তার বলেছে ডায়ালিসিস করতে হবে। এক-একদিন কত করে টাকা লাগবে বুঝতে পারছিস? আমরা কোথায় যাব বল তো?”
“আঃ,” অন্য ছেলেটা বলল, “সামনে টাকার আলমারি নাচছে, সেখানে ঢ্যামনামো করছিস কেন? তোর ভাই পটল তুললে সতীপনা করিস একা-একা।”
মাহির বলল, “পতাদা বলল, আর-একটা ট্রায়াল আসছে। সেটায় নামকরা সব কোম্পানি আসবে। চাকরি হতেও পারে রে, টিটি।”
“তোর ওই বা…” টিটি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “পতাদার পাছায় তিনটে লাথ মারা উচিত। ঢপবাজ বুড়ো। শালা। রিতুদাকে বল মাহির। হাতের লক্ষ্মী বুঝলি! এই যে কাজটায় এলাম। পেমেন্ট নিলাম। এই যে এসি গাড়িতে ফিরছি, সেটা কি রিতুদা না থাকলে হত! শালা বাসে ধাক্কা খেয়ে ঘামের গন্ধ শুঁকে ঢিকিরঢিকির করে ফিরতে হত! বোঝ রে গা…” টিটি আবার নিজেকে সামলে নিল।
“স্যার, আপনারা কোথায় নামবেন?” সামনের দিক থেকে ড্রাইভারটি মুখ না ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“রাসবিহারীর সিগন্যাল তো খোলা আছে, ওই রাইট টার্ন নিয়ে হাজরার দিকে ঘুরিয়ে বাঁ দিক করে নামিয়ে দিন,” টিটি বলল।
