শুভর সঙ্গে ওর বিয়েটা শুভর দিক থেকে প্রেমে পড়ে হলেও, ওর কাছে সেটা ছিল একটা সুরক্ষিত জীবনের হাতছানি। থাকতে-থাকতে একটা মায়া আর ভাললাগা জন্মালেও সেই যে সর্বগ্রাসী প্রেম, সেটা কিন্তু হয়নি। আর আইকা যেমন, ওর প্রেমে গন্ডগোল হলে, তার জন্য মনখারাপ করে না থেকে সেটা কী করে সমাধান করা যায় সেটার দিকেই ওর বেশি ঝোঁক থাকত। এসব লবঙ্গলতিকা হয়ে ফুল স্পিডে ডিপ্রেশন চালিয়ে যাওয়ার মেয়ে ও নয়।
নোঈকে ও পছন্দ করলেও নোঈর এই জিনিসটা ওর ভাল লাগে না! কিছু-কিছু মানুষ আছে প্রেমের জন্য বড্ড হেদায়! জীবনে যেন আর কিছু নেই!
পুশকিনের সঙ্গে কথা বলে আসার সেই দিনেই রাতে নোঈদের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল আইকা।
পুটুমাসি টিভি দেখছিল। রাঙামেসো যথারীতি নিজের ঘরে ল্যাপটপে বিদেশি ফিল্ম নিয়ে বসেছিল।
আইকা ঘরে ঢুকেই পুটুমাসিকে বলেছিল, “নোঈ কোথায় গো? ওর সঙ্গে জরুরি কথা আছে।”
পুটুমাসি টিভি থেকে চোখ না সরিয়ে বলেছিল, “ওর ঘরে আছে, যা না।”
“না, ওকে ডাকো,” আইকা ইচ্ছে করে টিভিটা আড়াল করে দাঁড়িয়েছিল।
“আরে,” পুটুমাসি ছটফট করে উঠে বলেছিল, “আরে, ঝগড়াটা দেখতে দে ভাল করে, সর!”
“ডাকো নোঈকে,” আইকা বলেছিল, “আর অত ঝগড়া দেখার ইচ্ছে হলে আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।”
নোঈকে ডাকতে হয়নি।
“কী রে দি? কিছু বলবি?” নোঈ হাতে মোবাইলটা নিয়ে নিজেই বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে।
নোঈর চোখে বেশ হাই পাওয়ারের চশমা। আইকা কতবার বলেছে সেটা পালটে কন্ট্যাক্ট করে নিতে, কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই নেবে না। এত সুন্দর দেখতে নোঈকে, কিন্তু একটুও সাজে না। শুধু মাঝে মাঝে টিপ পরে। তাও সামান্য ওপরে। এখন আবার এই ফ্যাশনটা ফিরে এসেছে!
শাড়ি পরেছিল নোঈ। আর কপালে একটা অনুস্বরের মতো দেখতে আঁকা টিপ!
“এই ফিরলি নাকি?” জিজ্ঞেস করেছিল আইকা।
নোঈ বলেছিল, “হ্যাঁ, শ্বেতার বাড়িতে একটা নেমন্তন্ন ছিল। ও চণ্ডীগড় থেকে এসেছে সাতদিনের জন্য। কিছু বলবি দি?”
আইকা কিছু বলার আগেই পুটুমাসি বলেছিল, “তোরা আমায় দেখতেই দিলি না সিরিয়ালটা! শাশুড়িটা বউয়ের রান্না করা খাবারে সব লঙ্কার গুঁড়ো মিশিয়ে দিল লুকিয়ে। এবার কী যে হবে!”
“ধ্যাত্তেরি!” আইকা রিমোট তুলে টিপে বন্ধ করে দিয়েছিল টিভিটা! বলেছিল, “অফিস থেকে এসেছি দরকারি কথা বলতে! সেখানে এসব চালিয়ে রেখেছে!”
নোঈ সোফায় বসে তাকিয়েছিল আইকার দিকে, “কী হয়েছে দি?”
“তোর চাকরির কথা বলতে এসেছি আমি,” আইকা সময় নিয়ে তাকিয়েছিল নোঈর দিকে। মেয়েটা কারও থেকে কিছু নেয় না। এই কথাটায় কী প্রতিক্রিয়া দেবে বুঝতে পারছিল না।
নোঈ কিছু বলেনি। বড়-বড় চোখ করে তাকিয়েছিল আইকার দিকে। পুটুমাসির মুখে বরং আগ্রহ ছিল বেশি।
আইকা বলেছিল, “আমি আজ গিয়েছিলাম পুশকিনদের অফিসে। ওরা বিশাল বড় কোম্পানি! মাল্টিন্যাশনাল জায়ান্ট! রিকো গ্রুপ! কলকাতায় সদ্য অফিস খুলেছে। প্রজেক্টের কাজ করে। রিক্রুট করছে। আমি তোর কথা বলেছি। পুশকিন বলল তোর সিভিটা পাঠাতে।”
“পুশকিন কে?” পুটুমাসি ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল।
আইকা বলেছিল, “তুমি কিছু মনে রাখতে পারো না কেন গো? সেই যে ডিনো না কে এসেছিল না নোঈকে দেখতে, ওর সেই দাদা!”
পুটুমাসি থমকে গিয়েছিল একটু। তারপর ছিটকে দাঁড়িয়ে উঠেছিল, “না না, একদম নয়। নোঈ ওদের সঙ্গে যা করেছে তাতে কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবে ওদের সামনে? সম্ভব নয়!”
“আরে,” আইকা বিরক্ত মুখে বলেছিল, “কেন সম্ভব নয়? চাকরি করতে অসুবিধে কোথায়? আর বিয়ের সম্বন্ধ না-ই হতে পারে! তাতে কি জীবন আটকে থাকবে?”
পুটুমাসি বলেছিল, “আমাদের একটা মানসম্মান নেই নাকি? চাকরি দেবে বললেই যেতে হবে?”
“চাকরি দেবে বলেনি। বলেছে যোগাযোগ করতে!” আইকার মাথা গরম হচ্ছিল, “তুমি এসব কেন কমপ্লিকেটেড করছ? কাজ তো রে বাবা!”
“না, ও যাবে না,” পুটুমাসি গোমড়ামুখে বলেছিল, “সহজ ব্যাপারটা বুঝতে পারছিস না? আমাদের এতে অসম্মান হবে। নোঈ যাবে না।”
“আরে, যুক্তিটা কী?” আইকা কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
পৃথিবীতে গোঁয়ারতুমির মতো অসুখ কমই আছে! ইগো আর গোঁয়ারতুমির জন্য সারা পৃথিবীর আজ এই অবস্থা!
“আমি বলেছি যাবে না, সেটাই শেষ কথা,” পুটুমাসি বুকের কাছে হাতদুটো আড়াআড়িভাবে জড়ো করে এমন একটা ভঙ্গি করেছিল, যার অর্থ হল এর পর আর কথা চলে না!
“দি আমায় ই-মেল আইডিটা দিস, আমি সিভি পাঠিয়ে দেব,” নোঈ শান্ত গলায় বলেছিল।
“কী?” পুটুমাসি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, “তুই… তুই ওখানে চাকরি করবি? মানে ওদের ওখানে…”
“ওদের ওখানে মানে?” নোঈ ঠান্ডা চোখে তাকিয়েছিল পুটুমাসির দিকে, “অফিসটা কি ওই ডিনোদের নাকি? পুশকিন নিজেও চাকরি করে। আমার করতে অসুবিধে কোথায়!”
পুটুমাসি কিছুক্ষণ নোঈর দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের মনে বলেছিল, “ঠিকই তো। আমি আর কে হই? যেমন বাপ তেমন মেয়ে! আমি তো দাসীবাঁদি হয়ে থাকার জন্যই এসেছি এই বাড়িতে! যা পারিস কর, কিন্তু পরে কিছু হলে আমার কাছে কাঁদতে আসবি না!”
আইকা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিল পুটুমাসিকে। আর ভাবছিল পরে কী হতে পারে? পুটুমাসি কী হবে বলে ভয় পাচ্ছে?
আইকা ই-মেল আইডি দিয়েছিল নোঈকে। তারপর পুশকিনের মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে বলেছিল, “সিভিটা পাঠিয়ে একটা মেসেজ করে দিবি। ও ইন্টারভিউয়ে ডেকে নেবে।”
