আইকা জানে এই প্রজেক্টটা ওর ওপরে ওঠার সিঁড়িও। এটাকে যদি ক্র্যাক করতে পারে, তা হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রজেক্ট-এর জন্য হয়তো ওর নামটা উঠবে।
স্নান সেরে বেরিয়ে আইকা দেখল ঋষি জামাকাপড় পরে নিয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথার চুল সেট করছে। চুল ঋষির একটা অবসেশন। কতরকমের স্প্রে আর জেল যে লাগায়!
ওকে আয়না দিয়ে দেখে ঋষি ঘুরে দাঁড়াল, “লুকিং হট ইন টাওয়েল!”
আইকা বিরক্ত গলায় বলল, “সারাক্ষণ এসব ভাল লাগে না আমার। তুমি কি ম্যানিয়াক?”
ঋষি থমকে গেল, “তাওয়া গরম হ্যায় কেয়া?”
আইকা নিজের ব্যাগ আর জামাটা তুলে পাশের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, “শাট আপ।”
পাশের ঘরটাও বড়। কিন্তু ফ্ল্যাট বেশির ভাগ সময় খালি থাকে বলে এই ঘরে তেমন কিছু আসবাব নেই। শুধু একটা দেওয়ালজোড়া আলমারি আর তাতে লাগানো আয়না রয়েছে।
দ্রুত জামাকাপড় পরে নিল আইকা। তারপর ব্যাগ থেকে চিরুনি বের করে চুলটা আঁচড়ে নিল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। একটা লিপস্টিক বের করে হালকা করে বুলিয়ে নিল ঠোঁটের ওপর। নিজেকে সামান্য দেখে নিল, তারপর ঋষির ঘরের দিকে এগোল।
ঋষি বিছানায় বসে গাড়ির চাবিটা ঘোরাচ্ছিল হাতে। ওকে দেখে উঠে দাঁড়াল, “তুমি এতক্ষণ ধরে স্নান করো কেন?”
“আমার ইচ্ছে!” আইকার যেন সহ্য হচ্ছে না ঋষিকে। ওর নিজের এমন রূঢ় ব্যবহার নিজের কাছেই কেমন যেন আশ্চর্য লাগছে।
ঋষি ভুরু কুঁচকে বলল, “কী হয়েছে? আরে, তোমার এই স্নানের জন্য পাপার কাছে আমায় ঝাড় খেতে হল। বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল আগেই। পলকের বাবা-মা আজ আসবে ডিনারে। তারা শালা, এক ঘণ্টা আগেই এসে গিয়েছে। এখন পাপা আমার জান খাচ্ছে! সল্ট লেক থেকে বুয়াদের তুলে নিয়ে যেতে হবে আমায়। আই অ্যাম অলরেডি সো লেট!”
আইকা বলল, “তাতে আমি কী করব! তোমায় আমি বলেছিলাম, আজ এখানে আসব? অফিসের পরে তুমিই তো আমায় জোর করে নিয়ে এলে। আমার গাড়িটা পর্যন্ত আনতে দিলে না! ইফ ইউ কান্ট কন্ট্রোল দ্যাট টাইনি থিং অফ ইয়োর্স, হোয়াট দ্য ফাক ক্যান আই ডু?”
“টাইনি?” ঋষি অবাক হয়ে নিজের প্যান্টের দিকে তাকাল।
“নয়তো কী! আর মুখ খুলিয়ো না,” আইকা বিরক্ত হল, “পলক কি এমনি তোমার সঙ্গে বেড শেয়ার করে না!”
ঋষি থতমত খেয়ে কী বলবে বুঝতে পারল না কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “আরে, এসব কথা বলছ কেন? বুঝতে পারছ না, আমার দেরি হয়ে গিয়েছে?”
“ডোন্ট ইয়েল!” আইকার মনে হল হাতের ব্যাগটা ছুড়ে মারে ঋষির মুখে। ও বলল, “চলো এখন।”
ঋষি ঘড়ি দেখল একবার। ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা লাগাতে-লাগাতে বলল, “শিট, আই অ্যাম সো লেট। আইকা, আমি তোমায় কিন্তু ভবানীপুরে ড্রপ করতে পারব না। তুমি একটা অ্যাপ-ক্যাব ধরে নাও।”
“মানে?” আইকা ভুরু কুঁচকে তাকাল, “এখন সাড়ে আটটা বাজে। এই সময়ে রাজারহাট থেকে আমি ট্যাক্সি করে বাড়ি যাব?”
“হ্যাঁ, যাবে,” ঋষি বিরক্ত হল, “আরে, আমার বাম্বু হয়ে গিয়েছে পুরো। আমাদের নতুন পেপার মিলে পলকের বাবাও ইনভেস্ট করবে। পাপা চায় আজকেই কথা ফাইনাল করে নিতে। আমায় প্রেজ়েন্ট থাকতে হবে। পলক যদি কিছু ট্রাবল ক্রিয়েট করে, অল উইল বি লস্ট! আমি পারব না তোমায় পৌঁছে দিতে।”
আইকা আর কথা বাড়াল না। লিফটে করে নেমে সোজা বড়রাস্তার দিকে হাঁটা দিল। ঋষি দেখেও কিছু বলল না। গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করার জন্য উলটো পথে চলে গেল ও।
আইকা বড়রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল একটু। রাগে গা-হাত-পা জ্বলছে! আর কোনওদিন একবার ঋষি আসতে বলুক! বাপের সঙ্গে ওর শ্বশুরেরও বিয়ে দেখিয়ে ছাড়বে!
রাজারহাট এখন অনেক জমজমাট। মোবাইল দিয়ে গাড়ি বুক করতে অসুবিধে হল না ওর। কাছেই ছিল গাড়িটা। এসে পড়ল মিনিটপাঁচেকের মধ্যে। শেয়ারের গাড়ি। পেছনের সিটে দু’জন বসে রয়েছে। গাড়ির ভেতরের অন্ধকারে স্পষ্ট করে মুখ দেখতে পেল না আইকা। কিন্তু বুঝল, খুব কিছু ভাল ঘরের নয়। জানলার দিকে বসে থাকা ছেলেটার মাথায় আবার একটা ব্যান্ড! রোগা-পাতলা চেহারায় ঝাঁকড়া চুলের মধ্যে ব্যান্ডটা দেখতে কেমন যেন লাগছে! আইকা গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করে দিল। ওর পাশে বসা ছেলেটার চেহারাটা বেশ বড়সড়। ও বসতেই ছেলেটা যথাসম্ভব সংকুচিত হয়ে বসল।
গাড়ি চলতে শুরু করলে আইকা জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। এই দিকটা এখনও মূল শহরের তুলনায় ফাঁকা। তবে বছরপাঁচেকের মধ্যে একদম পালটে যাবে সবকিছু।
গাড়ির এসি চলছে। আইকার কেমন যেন ঘুম-ঘুম পাচ্ছে! সারাদিন অফিসের পরে ওর ঋষির সঙ্গে এখানে আসা ঠিক হয়নি।
আইকা ঘুম কাটাতে মোবাইলটা বের করে দেখল। নোঈকে একটা মেসেজ করেছিল, এখনও ‘সিন’ হয়নি। মেয়েটা গিয়েছিল কি? আজ তো যাওয়ার কথা ছিল। নোঈকে বিশ্বাস নেই। যা জেদি মেয়ে! সামান্য কিছু হলেই গোঁজ হয়ে থাকে মাঝে মাঝে! কী যে করবে বোঝা যায় না।
পুশকিনের কাজ়িনের সঙ্গে বিয়েটা ভেস্তে দিল! কেন দিল কে জানে! প্রেম-টেম যে নোঈর নেই, সেটা জানে আইকা। আগে একটা ছেলে ছিল। কিন্তু ছেলেটা নিজে ওকে ছেড়ে গিয়েছে। নোঈ দীর্ঘদিন এই নিয়ে ডিপ্রেসড ছিল। এখন তাও কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু মাঝে মাঝে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যায়। আসলে এই ব্যাপারগুলো ঠিক ভাল করে বোঝে না আইকা।
