ঋষি হাসে, বলে, “ডার্টি সেক্স ইজ় দ্য রাইট কাইন্ড অফ সেক্স ডিয়ার!”
বিরক্ত লাগছে আইকার। আজকাল ঋষির ওপর খুব বিরক্ত লাগে। আগে যাও-বা আড্ডা হত, ইদানীং সেটাও হয় না। শুধু কোন কোম্পানির শেয়ার উঠল, কোন কোম্পানির শেয়ার পড়ল! অসহ্য বোরিং সব তথ্য! আর সেটা শেষ হলেই মারামারি করে সেক্স! আইকার মনে হচ্ছে একটা সীমারেখা টানতে হবে এবার। ঋষিকে ঝেড়ে ফেলার সময় এসে গিয়েছে! কিন্তু এখনই এসব মনে হচ্ছে কেন? ঋষি কি সত্যি বাড়াবাড়ি করে ফেলছে, নাকি ওর মনটা অন্যদিকে টাল খেয়ে যাচ্ছে!
আজ সেক্স করার সময় আবছায়া ঘরে যখনই চোখ বন্ধ করছিল, বারবার ওই মুখটা ভেসে উঠছিল কেন? কেন ওই মুখটাকে মনে করে বারবার ও ঋষিকে আঁকড়ে ধরছিল? কীসের জন্য ওই রাজারহাটের অফিস-ফেরতা বৃষ্টির গন্ধটা স্মৃতির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল?
ঋষির কাছে আসার আগে একটা মজা ছিল, কিন্তু এখন কেমন যেন একটা ঋষির মনরক্ষার দায় হয়ে পড়েছে। তারপর এমন করে আঁচড়ে, কামড়ে ওকে যন্ত্রণা দেওয়াটা আর নিতে পারছে না।
রাজারহাটের এই ফ্ল্যাটের বাথরুমটা বেশ বড়। ফ্রস্টেড কাচের বাক্সের মধ্যে দারুণ সুন্দর শাওয়ার লাগানো আছে। শুধু মাথার ওপর থেকেই নয়, নানা জায়গা থেকে জল এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীরে।
সাদা বড় শ্বেতপাথরের বাথটাবও রয়েছে এক পাশে। পাথুরে বেসিনের পাশের কাবার্ডে নানারকম বাথসল্ট আর কোলন। ঋষি খুব যত্ন করে সাজিয়েছে বাথরুমটা।
এই বাথরুমে এলেই আইকার মনে পড়ে যায় ওদের সেই যাদবপুরের ভাড়াবাড়ির বাথরুমের কথা! অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ঘর। দুর্বল চল্লিশ পাওয়ারের হলদেটে বাল্ব। শ্যাওলা-পড়া মেঝে। এক কোণে রাখা ভাঙা টিনের বালতি। প্লাস্টিকের, তলা সাদা হয়ে যাওয়া মগ। একপাশে টাঙানো একটা নাইলনের দড়ি। বড়জোর একজন মানুষ দাঁড়িয়ে স্নান করতে পারে। আইকার যে কী কষ্ট হত! দেওয়ালের ঝুল, আরশোলার ওড়াউড়ি আর জাল পেতে বসে থাকা ডোরাকাটা মাকড়সা দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত আইকা! শুধু ভাবত জীবনে যদি কোনওদিন ভাল করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তা হলে যে-বাড়িটা করবে সেখানে সুন্দর একটা বাথরুম তৈরি করবে ও।
ভবানীপুরে ওদের বাথরুমটা সুন্দর করে সাজিয়েছে আইকা। কিন্তু ঋষির এই বাথরুমের মতো নয় সেটা।
কাচের ঘরে ঢুকে শাওয়ারটা খুলে দিয়ে আইকা ভাবল, ঋষির সঙ্গে দেখা না হলে ওর কোনও আফশোস থাকবে না, শুধু এই বাথরুমটার জন্য ওর মনখারাপ করবে মাঝে মাঝে!
গায়ে জল পড়ামাত্র কেমন পিঠের চিড়চিড়ে জ্বলুনিটাও আরও বেড়ে গেল যেন! আইকার মাথাটা গরম হয়ে গেল আরও! ঋষিটা একটা জানোয়ার! আইকার অবাক লাগছে, কী করে ও এই দেড়বছর ঋষিকে সহ্য করল!
শাওয়ারের তলায় চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল আইকা। সারা দিনের কাজের পর এখানে এসে ঋষিকে সহ্য করে এখন শরীরটা কেমন যেন ছেড়ে দিচ্ছে। ঘুম এসে জড়িয়ে যাচ্ছে চোখে। মনে হচ্ছে জলের তলায় দাঁড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়ে!
মে মাসের কলকাতা বাইরে জ্বলছে! সন্ধেবেলাতেও কেমন একটা গরম ভাপ যেন! এ বছর একটা মাত্র কালবৈশাখী হয়েছে। তারপরে আর মেঘের ছিটেফোঁটা দেখা যাচ্ছে না আকাশে! ধুলোমাখা একটা শহর ক্রমশ আরও ধুলোটে আর আবছায়া হয়ে যাচ্ছে যেন!
সেই সব থেকে দূরে এই জলের তলায় শরীর আস্তে-আস্তে কেমন যেন নিভে আসছে আইকার।
“উই হ্যাভ টু বি ভিজিলেন্ট আইকা,” আজ রুপিন বলছিলেন ওকে, “যেভাবে কমপিটিশন বাড়ছে, উই হ্যাভ টু বি ভিজিলেন্ট। রিয়েল এস্টেট একটা অদ্ভুত ব্যাবসা! মানুষ তার অনেক সাধ আর পরিশ্রম এখানে ইনভেস্ট করে। ইটস নট ওনলি অ্যাবাউট মানি। প্লাস এত রাজনৈতিক ইন্টারফেয়ারেন্স! এভরিবডি ওয়ান্টস হিজ় পিস অফ কেক উইদাউট এনি এফর্ট! লাস্ট ইয়ার আমাদের বিজ়নেস ডিপ করেছে খানিকটা। এমনিতেই রিসেশন আর ডিমনিটাইজ়েশন আমাদের থমকে দিয়েছিল কিছুটা। তাই সামনে উই হ্যাভ আ স্টিপ ক্লাইম্ব! ব্যাবসা বাড়াতেই হবে। নো আদার ওয়ে। ম্যানেজমেন্ট তোমার ওপর ভরসা করছে। এই কাজে নানা ফাইনান্সারও ইন্টারেস্টেড। সোনাঝুরির প্রজেক্টটা কিন্তু হট প্রপার্টি। অনেকের নজর আছে ওতে। ইউ মাস্ট স্টেপ অন দ্য গ্যাস! গঙ্গার পাশে অত সুন্দর জায়গা! ওই বড় বাড়ি প্লাস আশপাশের জমিগুলো নিয়ে নিতে পারলে আমাদের বিজনেস বুস্ট হবে। বুঝলে?”
আইকা এর সবটাই জানে। রুপিন তাও কেন যে এসব বারবার বলেন কে জানে! সোনাঝুরি জায়গাটা গঙ্গার বাঁকের পাশে। সুন্দর ছিমছাম একটা মফস্সল। এখানে হাউজ়িং হলে খুব ভাল হবে, সেটা জানে আইকা। কলকাতা থেকে মাত্র চোদ্দো-পনেরো কিলোমিটার দূরত্ব। তার সঙ্গে নদীটাকেও ব্যবহার করার একটা ভাবনা আছে ওদের মাথায়। আমাদের এখানে এত রাস্তা কম। গাড়ি, ট্রেন আর মেট্রোর ওপর এমন বিশাল চাপ! কিন্তু একটা এত বড় নদী পড়ে আছে সেটাকে আমরা কাজে লাগাই না সেভাবে! কেন কে জানে! হ্যাঁ, স্থানীয়ভাবে কিছু লঞ্চ, স্টিমার আর ভটভটি চলে বটে, কিন্তু সেটা দরকারের তুলনায় খুব কম। জলপথে কি অনেকটা জুড়ে ফেরি চালানো যায় না?
রুপিন মানুষটা ভাল। ঠিক টিপিকাল বস নন। বরং অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করেন। কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য কখনও বকাবকি করেন না।
