মায়ের মুখাগ্নিটা পর্যন্ত করেছিল ভাই। দূরে অপরিচিতের মতো দাঁড়িয়ে পুশকিন দেখেছিল মা চলে যাচ্ছে সারা জীবনের মতো! সেই ছোটবেলায় মুখ ধুইয়ে আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দেওয়া মা। সেই পক্সের সময় সারা রাত জেগে বসে থাকা মা। এক মনখারাপের দুপুরে পাশে এসে মাথায় হাত রাখা মা। চলে যাচ্ছে। ওর মনে হচ্ছিল, বাবা, ভাই আর এত আত্মীয়স্বজন কী করে জানবে মা ওর কতটা ছিল! একটা মেয়েকে বাড়ির অমতে বিয়ে করেছে বলে ওকে এমন করে সবাই দাগ কেটে বাইরের লোক করে দিল। মা-ও বুঝল না পুশকিনকে।
সেদিন শেষরাতে বাড়ি ফিরেছিল পুশকিন। স্মিতা জেগে বসেছিল বসার ঘরে। এতক্ষণের কান্নাটা স্মিতাকে দেখে কেমন যেন বেরিয়ে এসেছিল বাইরে। মাটিতে বসে স্মিতার কোলে মুখ গুঁজে দিয়েছিল পুশকিন। বন্ধ চোখের অন্ধকারে দেখেছিল মা ধীরে-ধীরে মিশে যাচ্ছে আগুনের সঙ্গে!
স্মিতা মাথার চুলে হাত ডুবিয়ে বলেছিল, “কাঁদে না সোনা। আমি তো আছি।”
কেউ থাকে না। ভাই থাকে না। বন্ধু থাকে না। বাবা থাকে না। মা থাকে না। স্ত্রী থাকে না। প্রেমও থাকে না। নিস্তব্ধতা আর একাকিত্ব তার কালো আলখাল্লা দিয়ে ঢেকে দেয় মাথা-নিচু মানুষের জীবন।
লিফট থেকে বেরিয়ে অফিসে পা রাখল পুশকিন।
“কোথায় ছিলে গুরু? বস এসে গিয়েছে!” আপন হাতে একটা ফাইল নিয়ে এগিয়ে এল সামনের একটা কিউবিকলের ভেতর থেকে।
এই কিউবগুলোর সবটায় লোকজন নেই। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানিতে লোকজন বাড়লে এই মৌমাছির খোপগুলো ভরে উঠবে।
পুশকিন কিছু না বলে বসের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ভারী কাচের দরজার বেশির ভাগটাই ফ্রস্টেড। তার ফাঁক দিয়েও বসের ভ্যানিটি ব্যাগটা দেখা যাচ্ছে।
“স্যার,” আচমকা কানের কাছে ফিসফিস করে একটা গলা পেল পুশকিন। সামান্য চমকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল ও। স্মরণ এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। বেঁটে, রোগা পাতলা ছেলেটার চুলগুলো উসকোখুসকো হয়ে আছে এখনও। সঙ্গে জামাটাও অর্ধেক গোঁজা আর বাকি অর্ধেক বেরিয়ে রয়েছে প্যান্টের বাইরে।
পুশকিনের আবার হাসি পেল। এমন কাকতাড়ুয়া হয়ে আছে কেন ছেলেটা! আর ফিসফিস করেই-বা কথা বলছে কেন?
হাসি চেপে পুশকিন গম্ভীরভাবেই বলল, “কী হয়েছে?”
“স্যার বস, মেয়ে?” স্মরণের চোখগুলো গোলগোল হয়ে আছে।
“হ্যাঁ, কেন? কী হয়েছে?”
স্মরণ বলল, “না মানে, হিন্দি সিনেমায়, বাংলা সিনেমায় যে দেখায় বস মানে ছেলে?”
“বস মানে ছেলে? তাই নাকি?” পুশকিন আর না হেসে পারল না!
আপন একটু পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। এবার ও বলল, “শালা, এই জ্ঞান বসের সামনে ফলাস না স্মরণ। আর এখন কাট এখান থেকে। ডাকলে আসবি, না হলে আসবি না। বস কিন্তু খুব রাগী।”
স্মরণ কী বুঝল কে জানে! নিজের খোপের দিকে যেতে-যেতে মাথা নেড়ে বলল, “বস শব্দের জেন্ডারটা না জানা গেলেও এটা জানা গেল যে, বস খুব ডেঞ্জার!”
আপন পাশে এসে দাঁড়াল পুশকিনের। বলল, “যা রিক্রুট করেছ না গুরু, জানলে ইন্ডিয়ান ফুটবল টিমের সিলেক্টার বানিয়ে দেবে।”
পুশকিন বলল, “ছেলেটা কাজ করে মন দিয়ে। সিনসিয়ার। অনেস্ট। একটু খ্যাপাটে। কিন্তু তাতে কাজের ক্ষতি তো হচ্ছে না।”
আপন বলল, “শালা, বরাবর দেখছি তোর ট্যান টাইপের জিনিসই বেশি ভাল লাগে। নিজেও তো শালা তার-কাটা!”
পুশকিন হাসল। আপনের কথায় ও কিছু মনে করে না। আপন ওর পুরনো বন্ধু বটে, কিন্তু ও বোঝে আপন সারা জীবন ওর মধ্যে একজন প্রতিদ্বন্দ্বীকেই দেখে এসেছে!
পুশকিনের কারও সঙ্গে কোনও প্রতিযোগিতা নেই। ওর কেবল এক ক্লান্তি আছে। মনের মধ্যে সহস্র বছরের জমে থাকা এক ঘুম আছে। ওর মাঝে মাঝে মনে হয় একদিন সব ছেড়ে ও দূরে কোনও ঠান্ডা পাহাড়ি শহরে চলে যাবে। সেখানে নির্জন একটি ঘরে বসে দেখবে আকাশ থেকে নেমে আসা ক্যান্ডিফ্লসের মতো তুষারের চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে এক ছোট্ট নিশ্চুপ জনপদ।
আচমকা আকাশ ফাটিয়ে কড়কড় করে মেঘ ডেকে উঠল। কাচের বড় জানলাগুলোর দিকে তাকাল পুশকিন। বাইসনের দল এসে গিয়েছে। তাদের খুরের ধুলোয় চারদিক অন্ধকার! কতদিন বৃষ্টি হয় না! আজ কি হবে?
“স্যার, আপনাদের ম্যাডাম ডাকছেন।”
কাচের দরজা ঠেলে হাবু বেরিয়ে এসে দাঁড়াল ওদের সামনে।
আপন হাত দিয়ে সামনে ঠেলে দিল পুশকিনকে, “এগো, চল। শালা আজ আমার বাম্বু ডট কম হবে শিয়োর।”
কাচের দরজা ঠেলে দু’জনেই অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকল।
বস বড় কাচের টেবিলের অন্য পারে বসে মন দিয়ে সামনে খুলে রাখা কিছু কাগজ দেখছেন। ওদের দিকে না তাকিয়েই হাত নেড়ে বসতে বললেন।
এই ঘরটা বন্ধই থাকে, বস এলেই শুধু ঝাড়পোঁছ করে খোলা হয়। মিসেস মালভিকা আইয়ার কড়া হলেও মানুষ ভাল। সিনসিয়ারিটি না দেখলে যেমন রেগে যান খুব, তেমনই ভাল কাজের প্রশংসা করতেও কার্পণ্য করেন না কখনও।
গত আড়াই বছর হল এই কোম্পানিতে জয়েন করেছে পুশকিন। সেখানেই কাজের সূত্রে দেখেছে, ঢিলেমি একদম পছন্দ করেন না বস।
এই যে কলকাতায় ওকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে, সেখানেও ওকে বলা হয়েছে যে কোম্পানির কাজ এই অঞ্চলে পুশকিন আর আপনের পারফরম্যান্সের ওপরেই নির্ভর করবে। সেখানে যেন কেউ গাফিলতি না দেখায়!
বসের বয়স চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন। মাথার চুল বড়। কিন্তু কাঁচায় পাকায় মেশানো। পরনের শাড়িটা যে খুব দামি, সেটা আর বলে দিতে হবে না।
