“নোঈ কী পাশ করেছে? মানে কোয়ালিফিকেশন কী! আমাদের এখানে রিক্রুটমেন্ট চলছে। ইফ শি ইজ় ইন্টারেস্টেড, তা হলে…”
পুশকিনকে কথা শেষ করতে দিল না আইকা। প্রায় ছোঁ মেরে ওর মুখ থেকে কথাটা তুলে নিয়ে বলল, “আরে, নিশ্চয়ই ইন্টারেস্টেড হবে।”
“দেখ, ওকে আগে বল,” পুশকিন সাবধানি গলায় বলল, “নোঈকে আগে বলে দ্যাখ। ইউ ডোন্ট কমিট। প্লাস ভবানীপুর থেকে রাজারহাট আসবে কি না, সেটাও একটা ব্যাপার। আমায় দু’দিনের মধ্যে জানা, তা হলেই হবে,” পুশকিন ঘড়ি দেখল আর দেরি করা যাবে না।
আইকা হাসল, “আমি জানাচ্ছি। খুব ভাল হবে এটা। তোদের বাড়িতে আপত্তি হবে না তো?”
“মানে?” পুশকিন ভুরু তুলল, “বাড়িতে আপত্তি কেন? অফিস আর বাড়ি তো আলাদা। আর বিয়ের কথা মানেই তো বিয়ে নয়। এসব ভাবিস না। যদি ইন্টারেস্টেড হয় আসতে বলিস। কেমন?”
“যদি বলছিস কেন?” আইকা তাও যেন ছাড়ছে না!
“সেদিন গাড়িতে উঠতে বলেছিলি, ও কি উঠল!” হাসল পুশকিন, “দ্যাখ, যদি আসে।”
আইকা বলল, “আজ তবে আসি। আমি আবার আসতে পারি তো?”
“তুই?” পুশকিন সামান্য থমকাল। এর আগের দিন রাস্তায় আচমকা দেখা হয়ে গিয়েছিল বলে লিফট দিয়েছিল গাড়িতে। কিন্তু আবার আসবে? পুশকিন সামান্য ঘাবড়ে গিয়েছিল। দ্বিধা নিয়ে তাকিয়েছিল আইকার দিকে। তারপর কোনওমতে মাথা নেড়ে বলেছিল, “শিয়োর।”
আইকা সামান্য এগিয়ে এল কাছে। তারপর আলতো করে হাতটা ধরল ওর। বলল, “স্কুল অনেকদিন আগে শেষ হয়ে গিয়েছে পুশকিন। সেই আইকাটা আর নেই কিন্তু।”
এই বিল্ডিংটার নীচের তলাটা বেশ ফাঁকা থাকে। বড়-বড় থাম। উঁচু সিলিং! থমথমে লম্বা সাদা দেওয়াল— গোটা জায়গাটাকে যেন আরও নির্জন করে দেয়!
আইকা পায়ের জুতোর আওয়াজ তুলে চলে গেল। আর সেই খটখট আওয়াজ যেন ছোট ছোট ফুটো করে দিল নিস্তব্ধতার আলখাল্লায়!
পুশকিন চুলের ভেতর হাত ডোবাল। বাইরে ছিল ভাল ছিল। কলকাতায় এসেই আবার চুঁইয়ে-চুঁইয়ে অতীত এসে ঢুকছে ওর জীবনে! বাবা ঠিকই বলেছে, “পালিয়ে বাঁচতে পারবি না বাবু।”
বাবার কথা মনে পড়তেই ঘড়ি দেখল পুশকিন। আজ বাবার ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার কথা, গিয়েছে কি!
বাবা রাসবিহারী মোড়ের কাছে ওদের বড় বাড়িতে থাকে ভাই আর ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে। সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের ওপর রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামের কাছে ওর ফ্ল্যাটে থাকে না।
এটা পুশকিনের একটা কষ্টের জায়গা। বাড়ির অমতে স্মিতাকে বিয়ে করেছিল পুশকিন। সবাই বাধা দিয়েছিল। মা তো সাংঘাতিক অসুস্থ হয়েও পড়েছিল। কিন্তু তাও পুশকিন কারও কথা শোনেনি! স্মিতা এমন করে টেনেছিল ওকে! আর সে সময় পুশকিনের মনে হয়েছিল, স্মিতাকে ও কথা দিয়েছে বিয়ে করবে! প্রেমের চেয়েও কথা রাখাটা জরুরি!
কিন্তু বুঝতে পারেনি একটা কথা রাখতে গিয়ে জীবনের অন্যদিকটা নষ্ট হয়ে যাবে! ওর বিয়ের চার মাসের মধ্যে মা মারা গিয়েছিল!
এখনও বিকেলটার কথা মনে আছে পুশকিনের। তখনও প্যারিসে পোস্টিং হয়নি ওর। কলকাতাতেই ছিল। অফিসে বসের ঘরে মিটিং হচ্ছিল সেদিন। নতুন চাকরি। পুশকিন সারাক্ষণ তটস্থ থাকত সেই সময়।
মার্কেটিং চিফ একটা গ্রাফ নিয়ে কথা বলছিলেন, এমন সময় পুশকিনের পকেটের মোবাইলটা তারস্বরে বেজে উঠেছিল। ঘরের সবাই খুব বিরক্ত হয়ে তাকিয়েছিল পুশকিনের দিকে। পুশকিনের মনে হচ্ছিল ন’তলার ওপর থেকে ঝাঁপ মারে রাস্তায়। ফোনটা বের করে সুইচ অফ করতে গিয়েও থমকে গিয়েছিল একদম! স্ক্রিনে দেখেছিল বাবার মোবাইল থেকে কলটা এসেছে!
নিস্তব্ধ ঘরের মাঝখানে বিরক্ত মুখের বেশ কয়েকজন মানুষকে তোয়াক্কা না করেই খ্যানখ্যান করে বাজছিল ফোনটা! কিন্তু বাবা ফোন করল কেন? পুশকিন ফোনের ‘রিজেক্ট’ বোতামটা টিপতে পারছিল না।
বিয়ের আগে সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, তারপর একবারই বাড়িতে গিয়েছিল পুশকিন। কিন্তু কিছুতেই ওকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি ওর ভাই আর কাকারা। বাবা দোতলার বারান্দা থেকে সেদিন দাঁড়িয়ে দেখেছিল সবাই মিলে পুশকিনকে কীভাবে বাড়ির দরজা থেকে দূর করে দিয়েছিল! ভাই যখন ওর কলার ধরে ওকে ধাক্কা মেরে বাড়ির দরজা থেকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলছিল, বাবা কী অদ্ভুত নিস্পৃহ ভঙ্গিতে তাকিয়ে দেখছিল ওকে! ভাইয়ের সেই ধাক্কা, কাকাদের গালাগালি ওকে কষ্ট দেয়নি! কিন্তু বাবার ওই ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকাটা ভেতরে-ভেতরে একদম মেরে ফেলেছিল ওকে।
সেই বাবা নিজে ফোন করেছে! কেন? হঠাৎ কী হল? ফোনটা হাত-পা ছুড়ে একগুঁয়ে বাচ্চার মতো চিৎকার করে চলছিল!
আচমকা বস শান্ত গলায় বলেছিল, “টেক ইট আউটসাইড। ইট মাস্ট বি ইমপর্ট্যান্ট!”
ঘরের কাচের দরজাটা ঠেলে বাইরে এসে ফোনটা ধরেছিল পুশকিন।
বাবা শান্ত গলায় বলেছিল, “তোমার মা আর নেই। আজ একটু আগে দেহ রেখেছেন। উনি শেষ মুহূর্তেও চাননি তোমায় খবর দিতে। কিন্তু আমি মনে করি, কোনও কিছুই মৃত্যুর চেয়ে বেশি নয়, বড় নয়। যা কিছু মনোমালিন্য তার থেকে মৃত্যুকে দূরে রাখাই ভাল। পারলে কেওড়াতলায় এসো।”
সেদিন অনেক রাতে শ্মশানে একটা সিঁড়িতে একা বসেছিল পুশকিন! ওদের অনেক আত্মীয়স্বজন এসেছিল। কিন্তু কেউই কথা বলছিল না ওর সঙ্গে। বরং এমন একটা ভাব নিয়ে ঘুরছিল যাতে পুশকিনের মনে হচ্ছিল, মায়ের মৃত্যুর জন্য ওই দায়ী!
