“ওহো! তবে তো অসুবিধে করে ফেললাম!” আইকার মুখে কেমন একটা অপরাধীর ছাপ।
খারাপ লাগল পুশকিনের। ও কোনও বিষয়ে কাউকে খুব একটা বারণ করতে পারে না। খবর না দিয়ে চলে আসাতে ওর অসুবিধে হল জেনে আইকা যে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে, সেটায় কেন যেন খারাপ লাগল ওর।
ও বলল, “আরে, আধঘণ্টা তো কথা বলাই যেতে পারে!”
আইকা সামান্য হাসল। কিন্তু তাও দ্বিধার ভাবটা কাটছে না ওর।
“চল, ক্যাফেতে যাই। ডোন্ট লুক সো গ্লুমি। ইট ডাজ়ন্ট সুট ইউ!” পুশকিন আলতো করে হাসল।
এই বিল্ডিংটা বেশ বড়। পেছনের দিকে একটা ক্যাফে আছে। চা, কফি ছাড়াও টুকটাক খাবার পাওয়া যায়। পুশকিন নিজে চা বা কফি কিছু খায় না। কিন্তু তাও মাঝে মাঝে আসে এই ক্যাফেতে। এরা একটা দারুণ আঙুরের শরবত বানায়।
ক্যাফেতে ছোট-ছোট কয়েকটা চেয়ার-টেবিল আছে। তবে এখন তার একটায় মাত্র দু’জন মেয়ে বসে রয়েছে। বাকি চেয়ার-টেবিলগুলো ফাঁকা।
জানলার কাছে একটা চেয়ার দেখে বসে পড়ল পুশকিন। হাতের ব্যাগটা টেবিলের একপাশে রেখে সামনের চেয়ারটা টেনে বসল আইকাও।
“কফি?” পুশকিন জিজ্ঞেস করল।
“তুই তো খাস না। তুই কী খাবি?” আইকা ভুরু তুলে তাকাল পুশকিনের দিকে।
“গ্রেপ জুস। আর তোর কফি বলি?”
আইকা মাথা নাড়ল।
পুশকিন “চাচা” বলে কাউন্টারের লোকটিকে ডেকে একটা গ্রেপ জুস আর কফি দিতে বলে গুছিয়ে বসল এবার।
“বল।”
আইকা নাক টানল, “এই এসেছিলাম কাছের একটা কোম্পানিতে, ‘কোডি স্টিল’। আমরা একটা বড় সেমিনার করছি। তাই এসেছিলাম ওদের জেনারেল ম্যানেজারকে নেমন্তন্ন করতে। মানে, ওঁকে তো আর যাকে-তাকে দিয়ে নেমন্তন্নের কার্ড পাঠানো যায় না! কাজটা শেষ করে ভাবলাম, তুই সেদিন বলেছিলি এখানে আছিস। তাই টুক মাই চান্স। বুঝতে পারিনি তুই বিজ়ি! সরি।”
“আরে, তা নয়,” পুশকিন হাসল, “এই অফিসটা গোটাটাই আমায় আর আপনকে দেখতে হয়। আমরা এই রিজিয়নে নতুন। উই হ্যাভ টু হ্যাভ আ গুড হোল্ড অন দ্য রিজিয়ন। তাই একটা কাজের চাপ আছে। দিল্লির হেড কোয়ার্টার থেকে চাপ দেয়। বাদ দে। তারপর? কী খবর বল।”
আইকা কিছু বলতে গিয়েও থমকাল। কাউন্টারের বয়স্ক মানুষটি এসে ওদের সামনে কফি আর একটা শরবতের গেলাস রেখে গেল।
আইকা ব্যাগ থেকে একটা ওয়াইপ বের করে হাত মুছল। তারপর কাপটা টেনে নিয়ে বলল, “আসলে তোকে এত বছর পরে আচমকা দেখে এত ভাল লাগছে! মাঝে তো পুরো হারিয়ে গিয়েছিলি! তোর সঙ্গে সেই বিকেলের পরে এই দেখা হচ্ছে। মেসেজ করলে রিপ্লাই দিস না কেন রে?”
পুশকিন গেলাসে সামান্য চুমুক দিয়ে শুনল কথাগুলো। আইকা এমন এলোমেলো কথা বলছে কেন! আসলে কী বলতে চাইছে, সেটা ঠিক বুঝতে পারছে না! ও তাকিয়ে রইল।
“আমার এত খারাপ লাগছে! কী বলব তোকে!” আইকা কাপের মুখটায় আঙুল বোলাতে লাগল এবার।
“খারাপ? কেন?” পুশকিনের এক সেকেন্ডের জন্য মনে হল আইকা কি স্কুলের সেই কথাটা তুলছে নাকি!
“খারাপ লাগবে না? কী বলছিস?” আইকা ঠোঁট কামড়ে তাকাল।
পুশকিন ক্যাফের দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটা দেখল একবার। আইকা কী শুরু করল এসব!
“কী ব্যাপার বল তো!” পুশকিন গেলাসে লম্বা চুমুক দিয়ে তাকাল আইকার দিকে।
আইকা কিছু বলতে গিয়েও কেমন যেন থমকে গেল। তারপর আচমকা হাত বাড়িয়ে পুশকিনের ঠোঁটের ওপর লেগে থাকা আঙুরের পাল্প মুছে নিল আঙুল দিয়ে। তারপর সেটা মুখে ঢুকিয়ে খেয়ে নিল। বলল, “ইয়াম!”
পুশকিনের ধক করে উঠল বুকটা। এটা কী করল আইকা! এর মানে কী! ও চট করে দেখে নিল আশপাশটা। দূরের টেবলে বসা দুটো মেয়ে কি দেখল এটা!
আইকা হাসল, “কফি না বলে আমিও শরবতটা খেতে পারতাম মনে হচ্ছে।”
পুশকিনের এবার বিরক্তি লাগছে। কী চায় আইকা? ও এল কেন? পাঁচটা বাজে প্রায়। এই আইকার মধ্যে যেন স্কুলের রাগী, অহংকারী সেই মেয়েটা আর নেই।
“তুই কিছু বলবি?” পুশকিন আর থাকতে না পেরে বলল এবার।
“ও হ্যাঁ, মানে… আসলে তোকে দেখতে ইচ্ছে করল!” আইকা তাকাল পুশকিনের দিকে।
পুশকিন হাসল সামান্য। অস্বস্তি হচ্ছে ওর। কিন্তু কী বলবে! আইকা দেখতে খুবই সুন্দরী। রূপচর্চার ফলে সেটা আরও খুলেছে। এমন একটা মেয়ে এসব বললে যে-কোনও ছেলেরই মনে নানা রঙের এলইডি জ্বলতে পারে। কিন্তু পুশকিনের জ্বলল না। এই আইকাকে ও চেনে। স্কুলে এমন কাজ করেছিল যে, এখনও ওর মন তেতো হয়ে আছে। নেহাত অভদ্রতা করতে পারে না তাই কিছু বলছে না!
পুশকিন উঠে দাঁড়াল, “তোর কীসে খারাপ লাগল যখন বললি না, তখন আমি আজ আসি রে। বস যে-কোনও সময় ঢুকবেন।”
হা-হা করে এবার হেসে উঠল আইকা, “ভয় পেয়ে গেলি! এখনও ভিতুই আছিস! কিচ্ছু পালটাসনি তুই পুশকিন।”
পুশকিন হাসল। যদিও এতে হাসির কী আছে বুঝল না। ও হাত তুলে চাচার দিকে ইঙ্গিত করল।
আইকা বলল, “দামটা?”
“আমার খাতা চলে এখানে। ডোন্ট ওয়ারি।”
ক্যাফের বাইরে এসে আইকা ঘড়ি দেখল। বলল, “যা বলছিলাম। আসলে নোঈ যে এমন করে তোর ওই খুড়তুতো ভাইকে বাতিল করে দেবে, আমরা বুঝতে পারিনি। তাই খারাপ লাগছে আমার।”
“এতে খারাপ লাগার কী আছে?” পুশকিন বলল, “ওর জীবন, ও যেটা ভাল বুঝবে সেটাই করবে। প্লাস ডিনো বিদেশে ফিরে গিয়েছে। এটা এমন কিছু ব্যাপার নয়।”
“আসলে মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তায় আছি আমরা। একটা চাকরি করত। সেটা ছেড়ে দিয়েছে। কাজ খুঁজছে। পাচ্ছে না। ওর মা বিয়ে দেবে বলে উঠে-পড়ে লেগেছে, কিন্তু সেটাও করবে না। কাকু আমায় বলছিল যদি…”
