আপনের ঘরের ঘষা কাচের দরজা বন্ধ। ভালই হয়েছে। ওকে দেখলেই আবার এসে হাবিজাবি কথা শুরু করবে। আপনের সব কথাতেই একটা সূক্ষ্ম হুল টের পায় পুশকিন! কেন কে জানে! পুশকিন ভদ্রতাবশত কিছু বলতে পারে না, কিন্তু মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত লাগে! ওর কোথায় যেন পুশকিনকে নিয়ে সমস্যা আছে!
লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে কল-বাটনটা টিপে ঘড়ি দেখল পুশকিন। সাড়ে চারটে বাজে। বস আসবেন পাঁচটা নাগাদ। কলকাতায় পৌঁছে গিয়েছেন উনি, নিজের কী একটা কাজ সেরে তারপর আসবেন।
টুং শব্দে লিফটের দরজাটা খুলে গেল। বারো তলার ওপরে অফিস ওদের। তবে নীচে একটা রিসেপশন-স্পেস নেওয়া আছে।। সামনের দু’বছরের ভেতরে অফিস স্পেস আরও বাড়াতে হবে।
একতলার বোতামটা টিপে লিফটের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল পুশকিন। লিফটটা ফাঁকা। নরম হলুদ আলোয় ভরতি। এই আলোটাকে কেমন একটা জ্যোৎস্নার মতো লাগে পুশকিনের। মনে হয় এই বুঝি মেঘ এসে মুছে দেবে আলোটুকু!
ছ’তলায় এসে লিফটটা থামল। দরজা খুলতেই স্মরণকে দেখতে পেল পুশকিন। বেঁটে রোগা। চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ মতো। ছেলেটা মাসখানেক হল ওদের কোম্পানিতে জয়েন করেছে। অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। তবে বললে নানা চিঠি-চাপাটিও করে দেয়। কোনও কাজে ‘না’ বলে না। আসলে ওর এখনও কোনও নির্দিষ্ট কাজ নেই।
তবে ছেলেটা যেন কেমন। কখনও মাথার চুল আঁচড়াতে দেখল না ছেলেটাকে! জামাটাও কেমন যেন এলোমেলো। হাজারবার বলেও শু পরাতে পারেনি কেউ। সারাক্ষণ একটা সবুজ রঙের স্নিকার পরে থাকে।
লিফটের ভেতরে পুশকিনকে দেখে একটু থমকাল স্মরণ। তারপর কাঁচুমাচু হয়ে একপাশে দাঁড়াল।
“তুমি ফিফথ ফ্লোরে কী করছ নিজের টেব্ল ছেড়ে?” পুশকিন অবাক হয়ে তাকাল।
“স্যার ওই মানে…” স্মরণ মাথা চুলকোল।
“ওই মানে?” পুশকিনের হাসি পেলেও নিজেকে সংযত করল ও। মাথার চুল এবার পুরো ঘেঁটে গিয়েছে ছেলেটার।
স্মরণ বলল, “স্যার, মানে পারসোনাল একটু।”
পুশকিন কড়া চোখে তাকাল স্মরণের দিকে, “অফিস টাইমে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছ নিজের সিট ছেড়ে! আবার জিজ্ঞেস করলে বলছ পারসোনাল?”
স্মরণ জিভ কেটে বলল, “সরি স্যার। মা কালী বলছি, অন্যায় কিছু করিনি!”
“হোয়াট!” পুশকিন কী বলবে ভেবে পেল না! প্রচণ্ড হাসি পাচ্ছে ওর। কিন্তু কোম্পানির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হয়ে তো আর এভাবে হাসা যায় না!
লিফটটা এসে থামল গ্রাউন্ড ফ্লোরে। পুশকিন বাইরে বেরোল। স্মরণও বেরিয়েছে ওর সঙ্গে।
পুশকিন আবার বলল, “এসব কী বলছ! নিজের সিট ছেড়ে কী করছ তুমি? ফিফথ ফ্লোরে তো অন্য একটা কোম্পানির অফিস। সেখানে কী করছিলে?”
“বললে রাগ করবেন না তো স্যার?” স্মরণের মুখটা কেমন যেন ভয়ে শুকিয়ে গেল।
“আশ্চর্য তো!” পুশকিন ঠোঁট কামড়ে কড়া চোখে তাকাল, “ডু ইউ থিঙ্ক দিস ইজ় ফানি? আজ বস আসছেন, জানো তো! আর সেখানে উনি হিসেব দেখতে চাইলে দেখাতে পারবে? সব আপ টু ডেট আছে তো? না হলে কিন্তু তোমার বিপদ আছে। এখনও পারমানেন্ট হওনি!”
“প্যাঁও, স্যার।”
“হোয়াট?” পুশকিন থমকে গেল, “প্যাঁও মানে?”
“একটা মেয়ে, স্যার। আমার ইয়ে স্যার। ওই ছ’তলার অফিসটায় এসেছিল স্যার।”
পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না।
স্মরণ বলল, “স্যার, আসলে আমি কাজ করছিলাম। প্যাঁও এল। তাই আমায় ডাকল আর কী! আর আমি…”
“ওকে, ওকে…” পুশকিন হাত তুলে থামাল স্মরণকে, “আই ডোন্ট ওয়ন্ট এনি ডিটেল অফ ইয়োর পারসোনাল লাইফ! নীচে এসেছ কেন? সিটে যাও।”
“স্যার, একটা কথা স্যার!” স্মরণ এখনও আমতা-আমতা করে যাচ্ছে!
“কী?” পুশকিন জিজ্ঞেস করল।
“সোনাঝুরিতে যে-প্রজেক্টের কাজ হচ্ছে, সেই টিমে আমায় নেবেন স্যার? আমার তো তেমন কাজ নেই। আমি স্যার তার ফাঁকে এখন যেটা করছি সেটাও করে দেব। কাইন্ডলি যদি আমায়…”
“সোনাঝুরির কাজটা তো এখন আপন দেখছে। আমি তো দেখছি না! ওকে বলো।”
“উনি স্যার খ্যাঁকখ্যাঁক করেন!” স্মরণ ব্যাজার মুখে বলল, “কিছু বলতে গেলেই এমন করেন যেন, আমি ওঁর টিফিন চুরি করে খেয়েছি!”
“কী সব বলছ!” পুশকিন হাসল এবার। আস্ত পাগল একটা ছেলে!
“সত্যি স্যার। অন গড!”
“ঠিক আছে। আমি মনে রাখব। এখন নিজের জায়গায় যাও। নীচে এলে কেন?” পুশকিন কথা শেষ করতে চাইল!
“স্যার, একটু কোল্ড ড্রিঙ্ক খেয়েই চলে যাচ্ছি!” স্মরণ আর না দাঁড়িয়ে হনহন করে বিল্ডিং-এর বাইরে হাঁটা লাগাল।
পুশকিনের হাসি পেল। প্যাঁও! এটা কোনও নাম! ছেলেটা ইয়ারকি মারল না তো!
পাশে বড়-বড় কাচের জানলার দিকে তাকাল পুশকিন। আকাশের রং পালটে গিয়েছে আরও! বাইসনরা আরও কাছে চলে এসেছে শহরের! তবে কি আজ সত্যি বৃষ্টি আসবে?
লিফট থেকে নেমে ওদের রিসেপশন স্পেসটা কয়েক পা দূরে। কাছাকাছি পৌঁছতেই পুশকিন দেখল সামনে রাখা চেয়ারে আইকা বসে আছে। দিন এতটা গড়িয়ে গিয়েছে, তাও সাজগোজ এখনও নিখুঁত। ছোট করে কাটা চুল এখনও পাট করে আঁচড়ানো!
মার্বেলের মেঝেতে পুশকিনের জুতোর শব্দ পেয়ে মুখ তুলে তাকাল আইকা। তারপর হেসে উঠে দাঁড়াল।
“তুই!” চশমাটা খুলে পকেটে রেখে বলল পুশকিন।
“কেন আসতে নেই?” আইকা হেসে চুলটা অকারণে হাত দিয়ে ঠিক করল।
“হ্যাঁ, মানে…” পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না, “আসলে আজ একটু ব্যস্ত আছি। দিল্লি থেকে বস আসছে। তাই সবাই একটু বেশি অ্যালার্ট আর কী!”
