“আরে! কী করলি কী এটা?” পুশকিন চেয়ারে ঘুরে অবাক হয়ে তাকাল।
“বেশ করলাম,” আপন নাক টেনে পুশকিনের উলটো দিকে রাখা দুটো চেয়ারের একটায় বসে বলল, “শালা, আমার নাড়িভুঁড়ি সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছে টেনশনে, আর ও আমায় ম্যানার্স শেখাচ্ছে!”
পুশকিন কিছু বলতে গিয়েও বলল না। লাভ নেই। সেই স্টুডেন্ট লাইফ থেকে তো দেখছে ও আপনকে। নিজে যা ভাল বোঝে করে। কারও কথা শোনে না। এমনকী, পুশকিনকেও পাত্তা দেয় না। কিন্তু বিপদে পড়লেই পুশকিনের কাছে আসে। আগেও এমনটাই হত। আসলে কিছু জিনিস সারা জীবনেও পালটায় না।
আপন বলল, “আমায় তাড়িয়ে দেবে না তো! মানে তোর ওই সি ফুড কোম্পানি টেকওভারের পাশে আমার শালা এমন ল্যাজেগোবরে দশাটা আরও বেশি প্রকট হয়ে উঠছে। প্লাস, বস তোকে তো পছন্দও করে।”
“ব্যাপারটা ওভাবে দেখছিস কেন?” পুশকিন বলল, “এসব ব্যাপারে কি তুলনা চলে? আর পছন্দ করে মানে! তুই সেই সবসময় এমন করে ভাবিস কেন?”
আপন উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ারটা পেছন দিকে ঠেলে বলল, “তোমার আর কী গুরু! ঝাড়া হাত-পা। আমার মতো এক পিস বউ গলায় ঝুললে বুঝতে। সারাক্ষণ তার সারা পৃথিবীর জিনিসপত্তর চাই! আমার তো পেছনে ইংরেজি বাজনা বাজার উপক্রম! শালা, ভালই ছিলাম নয়ডায়। বেশি মাইনে, কলকাতায় থাকব, এসবের লোভে এখানে এসেই ডুবেছি! আমি তো রোজ ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি, ভগবান আমার বউ যেন অন্যের প্রেমে পড়ে! শালা বউটাও এক পিস! আমায় ছেড়ে নড়বে না! ভাগ্যবানের বউ পালায় জানিস তো?”
কথাটা বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
পুশকিন তাকিয়ে রইল আপনের চলে যাওয়ার দিকে। ওর ফেলে রাখা শূন্য চেয়ারটার দিকে। স্মিতা মারা গিয়েছে প্রায় চার বছর! কিন্তু তাও আজও ওর বুকের মাঝখানে, প্রকাণ্ড হলঘরের ভেতর এমন একটা ভাঙা পুতুল কেন বসে থাকে? উসকোখুসকো, জামা ছেঁড়া, রং লেপটে যাওয়া একটা পুতুল আজও কেন বসে থাকে এমন আনমনে? কেন ও পুতুলটাকে মন থেকে বের করে দিতে পারে না? কেন সব কিছু করার পরও ওর মনে হয় হেরে গিয়েছে ও? কেন নিজেকে এমন প্রকাণ্ড ব্যর্থ এক কচ্ছপের মতো লাগে পুশকিনের? কেন পারে না পুরনো পুশকিনটাকে বের করে আনতে? কেন মনে হয়, স্মিতাকে আসলে বুঝতে ভুল হয়েছিল! কেন মনে হয় ওর দোষে আজ স্মিতা নেই! সেই রাতে ও যদি অমন অবস্থায় না থাকত তা হলে… তা হলে যে কী, সেটা আজও বুঝতে পারে না পুশকিন। ওদের সম্পর্কটা কেমন একটা অন্ধ গলিতে ঢুকে গিয়েছিল যেন! থাকার উপায় নেই, পালানোর পথ নেই! যেন ডেড লক! আর সেটা ভেঙে দিতেই যেন এসেছিল মৃত্যু!
স্মিতা যা করেছিল তার পিছনে কি কোনও যুক্তি আছে? জানে না পুশকিন। কী এমন হয়েছিল যে, স্মিতা অমন করল? কাজ না করলে জীবন চলবে কী করে! আর স্মিতাই-বা ওকে নিজের কাছে তা হলে ডেকেছিল কেন?
স্মিতার হয়তো চার মাসের প্রেম ছিল, কিন্তু পুশকিনের তো আর তা নয়। সাড়ে তিন বছর ধরে স্মিতাকে ভালবেসেছিল ও!
এমবিএ করে তখন সবে একটা কোম্পানিতে যোগ দিয়েছে। জীবনের প্রথম চাকরি। মনে মনে খুব সিরিয়াস ছিল পুশকিন। চার মাসের ট্রেনিং-এ ভেবেছিল কোনওদিকে তাকাবে না। জীবনে ভালভাবে দাঁড়াতেই হবে। কাজ শিখতে হবে। ওদের কোম্পানির সল্ট লেক অফিসে ট্রেনিং হত। ক্যান্টিনটা ছিল এক তলায়। লাঞ্চের সময় ওখানেই খেতে যেতে হবে জানত।
কিন্তু সেদিনই ক্যান্টিনে কী একটা ঝামেলা ছিল। তাই অফিস থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী খাবে সেটাই ভাবছিল পুশকিন।
অফিসের সামনে বেশ কয়েকটা দোকান ছিল। কিন্তু তাদের দেখে খুব একটা ভক্তি আসছিল না। খাবার নিয়ে একটা সময় বেশ পিটপিট করত পুশকিন। তাই কী করবে বুঝতে পারছিল না। কিন্তু খিদে বড় বালাই। তাই এদিক-ওদিক দেখে, অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ও।
স্যান্ডউইচ! নিজের মনকে মেরে, এক প্লেট স্যান্ডউইচ নিয়ে সকলের কাছ থেকে দূরে একটা বড় গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল পুশকিন।
সেদিন মেঘ ছিল আকাশে। গাছের ছায়া আরও একটু বেশি ছায়াময় ছিল যেন। উলটো ফুটের বিশাল বড় বিল্ডিংটা দেখে সেটাকে রাক্ষস মনে হচ্ছিল পুশকিনের। মনে হচ্ছিল একটু পরেই এটা সামনে ছড়ানো মানুষগুলোকে আবার গিলে নেবে! হাতে ধরা স্যান্ডউইচের প্লেটের দিকে তাকিয়ে পুশকিনের নিজেকেও তেমনই একটা খাবার মনে হয়েছিল।
আর ঠিক তখনই কান্নার শব্দটা ভেসে এসেছিল গাছের অন্যদিক থেকে।
ক্লিংক্লিং করে সামনে রাখা ইন্টারকমটা বেজে উঠল এবার। পুশকিন তাকাল। এখন আবার কার ফোন এল! চশমাটা চোখ থেকে খুলে রেখে রিসিভারটা তুলল পুশকিন, “হ্যালো।”
“স্যার, আপনার সঙ্গে আইকা নামে একজন দেখা করতে এসেছেন। মিসেস আইকা বাসু।”
“আইকা!” অবাক হল পুশকিন। ওর আবার কী দরকার পড়ল!
“হ্যাঁ স্যার। শুড আই সেন্ড হার আপ?”
“না,” পুশকিন বলল, “আমি আসছি। ওকে একটু অপেক্ষা করতে বলুন।”
ফোনটা রেখে উঠল পুশকিন। আজ বস আসবেন, আর আজকেই মেয়েটা এল! আর আসবি তো আয় এমন সময়! প্লাস, একটা ফোন তো করবে! এমন হুট করে কেউ কাজের জায়গায় আসে!
পুশকিন নিজের ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। করিডর নির্জন। আসলে এই রাজ্যে ওদের এই অফিসটা নতুন। মাসপাঁচেক হয়েছে। এখনও রিক্রুট চলছে। তাই জনাদশেক কর্মী আর দু’জন রিসেপশনিস্ট আছে। আরও কিছু ছেলেমেয়ে দরকার। সি-ফুড কোম্পানিটার মেরামত আর সঙ্গে সেটাকে আবার সচল করতে হলে, বিদেশে মার্কেট ধরতে হলে আরও লোক লাগবে। আর পাশাপাশি তো আরও নানা সেক্টরে কাজ চলছে! তাই লোকজন নিতেই হবে। সেই কাজ নিয়ে আলোচনা করতেই দিল্লি থেকে বস আসছেন।
