“আবার শালা…” জিৎ লাফিয়ে উঠতে গিয়েছিল। কিন্তু সুম্পা সামনে এগিয়ে জিৎকে চেপে বসিয়ে বলল, “চুপ সবাই। রাধিয়া গান গাইবে। কেমন?”
রাধিয়া দেখল, ঘরের সবাই তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে! আজ শাড়ি পরে এসেছে রাধিয়া। ও আঁচল দিয়ে ঠোঁটের ওপরের ঘামের ফুলস্টপগুলো মুছল চেপে-চেপে। তারপর তাকাল সবার দিকে। আসলে ঠিক সবাই নয়, একজনের দিকে। নিশানের দিকে। কেন তাকাল! রাধিয়া জানে না। শুধু মনে হল, আবার সেই মিষ্টি কর্পূরের গন্ধটা ফিরে এল।
রাধিয়া চোখ বন্ধ করে সময় নিল একটু। ভিড় থেকে, কোলাহল আর হুল্লোড় থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিল। দ্রুত শ্বাসকে সংযত করল। শরীরকে নমনীয় করে নিল। তারপর তাকাল। বলল, “গান নয়। আমি একটা কবিতা বলব। আমার ঠাকুরমা মাঝে মাঝে বলে এই কবিতাটা। না, আমায় বলে না। নিজের মনে, একা বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কখনও কখনও বলে, আমি আড়াল থেকে শুনেছি। আমি সেটা বলব।”
পলি আর বুদা বসে পড়েছে ফরাসে। সুম্পা বসেছে একটা সোফার চওড়া হাতলের ওপর। স্মরণ মোটা চশমার ওপার থেকে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। জিৎ পাশের একটা ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে দেখছে ওকে। পেছন থেকে নিশানও অপলকভাবে দেখছে। ঘরের সবাই তাকিয়ে রয়েছে রাধিয়ার দিকে।
রাধিয়া আর-একটু সময় নিল। ঘরের ভেতর ফ্যানের গুঞ্জন ছাড়া আর কিছু নেই!
রাধিয়া এবার সেই গুঞ্জন ভেঙে তুলো-খসে-পড়া আওয়াজে বলল:
“আকাশ জুড়ে জোনাকিদের বাড়ি
বুকের নীচে পাগলা রাজার ঘোড়া
তখন থেকে সবার সঙ্গে আড়ি
তখন থেকে আমার শহর পোড়া!
ধ্বংস ঘেঁটে তোমায় পেলাম মোহর
তোমার আলোয় বাঁচল আমার প্রাণী
কক্ষ থেকে ছিটকে যেত গ্রহ…
উল্কা তোমার কাচের ফুলদানি!
কেমন ছিল সেসব ধুলোখেলা!
কেমন ছিল সাগরপারের রানি!
এই জীবনের নরম বিকেলবেলায়…
আমরা দু’জন, কেবল দু’জন জানি
আমরা দু’জন, মাত্র দু’জন জানি।”
.
০৮. পুশকিন
কলকাতায় বরফ পড়ে না কেন? সাদা তুলোর মতো, নরম, হালকা বরফ কেন নেমে আসে না কলকাতায়? ভিক্টোরিয়ার পরির পাখনায় বেশ বরফ জমে থাকবে! শহিদ মিনারের মাথায় জমে থাকবে সাদা ফেনার মতো বরফ! মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়েই মানুষজনের পা ডুবে যাবে ফুটপাথের পাশে জমে থাকা বরফে! ট্র্যাফিক পুলিশের হেলমেটের মাথায়, স্কুলফেরতা বাচ্চাদের পিঠের ব্যাগের ওপর, সবুজ-হলুদ অটোর ছাদে বা সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের গাছপালার গায়ে চুড়ো করে জমে থাকবে বরফ! লাল নীল ক্রেয়নের মতো উলের জামাকাপড় পরে মানুষজন জমা হবে রাস্তায়! আর আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করবে ছোট্ট বাচ্চার গালের মতো তুলতুলে বরফকুচি! ইস, কলকাতায় বরফ পড়লে কী ভালই যে হত! কেন যে বরফ পড়ে না! যা-যা হলে ভাল হয়, ভাল হত, কেন যে সেসব কিছু হয় না!
জানলায় দাঁড়িয়ে দূরে আকাশের গায়ে জমতে থাকা পেশিবহুল বাইসনের মতো মেঘগুলো দেখে ছোটবেলার মতো আবার এইসব মনে পড়ল পুশকিনের।
এপ্রিলের শেষ হতে চলল, কলকাতা আলকাতরার মতো ফুটছে। সবাই চাইছে একটা অন্তত কালবৈশাখী আসুক। মাসের প্রথমদিকে একদিন একটু বৃষ্টি হয়েছিল। তারপর আবার সেই এক আগুন! এক যন্ত্রণা!
এত লোকের ডাকেই কিনা কে জানে, আজ পশ্চিম দিকটায় বেশ মেঘ করেছে! জঙ্গল থেকে ছাড়া পেয়ে একপাল বাইসন যেন ধুলো উড়িয়ে ছুটে আসছে শহরের দিকে! শেষমেশ কি আসবে তারা? মানুষ কি আজ বৃষ্টি পাবে?
পুশকিন জানলার কাচে নাক ঠেকিয়ে সামনের দিকে তাকাল। এত ওপর থেকে কলকাতার আকাশটাকে অদ্ভুত লাগে। রাজারহাট এমনিতেই বেশ ফাঁকা। আকাশের বিস্তার এখানে বেশি। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতেও আকাশ চোখে পড়ে। তাই এখানে অফিস হওয়ায় মনে মনে বেশ খুশিই পুশকিন। এই ক’মাসে রাজারহাটকে ভালবেসে ফেলেছে ও। কিন্তু আজ যেন একটু বেশি ভালবাসা পাচ্ছে ওর! এমন বাইসন যে এখানে দাঁড়িয়ে দেখতে পাবে, আগে বুঝতে পারেনি।
“শালা, কাচের গন্ধ শুঁকছিস নাকি?”
আপনের গলা পেয়ে পেছনে ফিরে তাকাল পুশকিন। দরজাটা অর্ধেক খুলে মাথা বের করে আছে আপন। মুখে একটা সিগারেট। এই ছেলেটা কথা শোনে না। অফিসের মধ্যে স্মোক করা বারণ। কিন্তু ও কিছুতেই শুনবে না। আজ আবার বস আসছে। আপন একটা কেলেঙ্কারি না করে থামবে না!
“কী রে, এমন মুখ করে তাকিয়ে আছিস কেন?” আপন হাসল।
পুশকিন বলল, “তোকে বলেছি না নক না করে ঘরে ঢুকবি না? আর মুখে সিগারেট কেন? তোকে কতবার বলব?”
আপন দাঁত বের করে হাসল। তারপর সিগারেটটা ঠোঁট থেকে হাতে নিয়ে বলল, “টেনশনে সিগারেট না খেয়ে থাকতে পারছি না। বস আসছে। শালা কোন-কোন অ্যাঙ্গেল থেকে বাঁশ দেবে কে জানে!”
“ভয়ের কী আছে? বস ওরকম নাকি?” পুশকিন জানলার কাছ থেকে সরে এসে চেয়ারে বসে বলল, “প্লাস, কাজ তো ভালই হচ্ছে, অ্যাটলান্টিস সি ফুডের টেক ওভারটা তো মসৃণভাবেই হল। তুই বেকার এত টেনশন করছিস কেন কে জানে!”
“আরে, তুই তো ভালই কাজ করেছিস। কিন্তু আমি সোনাঝুরি নিয়ে কী ঝুলে আছি জানিস না। শালা তারক চক্কোত্তি মাইরি হারামি দ্য গ্রেট! যা ঝোলাচ্ছে না!” আপন হাতের সিগারেটটা একবার টেনে মুখটা বিকৃত করল। তারপর কোথায় ফেলবে বুঝতে না পেরে সটান এসে পুশকিনের চেয়ারের পেছনের জানলাটা এক হ্যাঁচকায় খুলে নীচের দিকে ছুড়ে দিল!
