রাধিয়া বুঝল কারণটা। সুম্পাদের বাড়ি এসে গিয়েছে!
বাড়িটা দেখেই ভাল লেগে গেল রাধিয়ার। বেশ পুরনো। আগেকার সেই লাল ইটের তৈরি। আর্চ বসানো, রংবেরঙের কাচের জানলা-দরজা। সামনে একটু বাগান। ছাদে ছোট-ছোট কয়েকটা মূর্তিও দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। বাড়ি মাথায় লেখা আছে ‘বসু ভিলা’।
রাধিয়া দেখল লোহার গেটের ওপরটা একটা তারজালির আর্চ করা আছে। আর তাতে লতিয়ে উঠে একটা ফ্রেমের মতো করে আছে বোগেনভেলিয়া গাছ। তাতে গোলাপি কাগজফুল হাওয়ায় নড়ছে। আকাশের দিকে তাকাল রাধিয়া। রাসবিহারীর দিকের মেঘটা কাঁকুলিয়া অবধি ঢেকে ফেলেছে! হাওয়া দিচ্ছে বেশ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঠান্ডা শিরশিরে ভাব একটা। বোঝা যাচ্ছে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে নিশ্চিত। গরমে ক্লান্ত আর বিরক্ত শহরকে কিছুটা স্বস্তি দিতে আসছে কালবৈশাখী।
বেল বাজাতে হল না। দরজাটা খোলাই ছিল। দরজার গোড়ায় জুতোর সাম্রাজ্য দেখে রাধিয়া বুঝল বেশ কিছু মানুষজন ইতিমধ্যেই এসে পড়েছে। ওর একটু অস্বস্তি হল। সুম্পার সঙ্গেই ওর যা জানাশোনা। ওদের বাড়ির আর কাউকেই তো ও চেনে না!
দরজা দিয়ে ঢুকেই লম্বা টানা বারান্দা। সেখানে জুতো খুলতে-খুলতেই সুম্পা বসার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ঝিলমিল করে বলে উঠল, “কী রে! তোদের কাণ্ডজ্ঞান নেই? এখন ক’টা বাজে! আসতে বলেছিলাম সেই চারটের সময়! দেখ তো, কত লোকে এসে গিয়েছে! জয়তী আর রাখি তো এখনও এল না। কী যে করিস না তোরা! দেখ, কত গান আর কবিতা হয়ে গেল এর মধ্যে! রাধিয়া, তুই গান গাইবি বলেছিলি। চল।”
রাধিয়া জুতো খুলে ঠিকমতো দাঁড়াতে না-দাঁড়াতেই সুম্পা ওকে হাত ধরে টেনে ঘরে নিয়ে গেল।
ঘরটা বড়। না রাধিয়ার বাড়ির তুলনায় নয়, কিন্তু বড়ই। উঁচু সিলিং। বড় তিনটে সোফা ঘরটার কিছুটা ভরে রেখেছে। রাধিয়া দেখল, অন্যান্য আসবাব পেছনে সরিয়ে মেঝেতেই বেশ সাদা ফরাস পেতে দেওয়া হয়েছে। রাধিয়া সকলের দিকে তাকাল। সকলের বয়সই ওর মতো। কিন্তু তার মধ্যেই চোখ আটকে গেল একজনের ওপর। আরে নিশান!
ডিমের কুসুম রঙের পাঞ্জাবি পরে বসে রয়েছে নিশান। রাধিয়ার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। মুখে মিটিমিটি হাসি।
রাধিয়া অপ্রস্তুত হল একটু। কেন হল সেটা নিজেই বুঝতে পারল না। সেদিন সোনাঝুরি স্টেশনে এই ছেলেটা নিতে এসেছিল ওকে। তারপর স্টেশন থেকে একটা রিকশায় উঠিয়ে রিকশার পেছন-পেছন ফলসাদের বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়েছিল! না, তেমন কথা বলেনি ওর সঙ্গে। শুধু ফলসাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে ফেরার সময় হেসেছিল একটু। সামান্য হাওয়ায় নিশানের গা থেকে গন্ধ ভেসে এসেছিল খানিক। কী সুন্দর মিষ্টি কর্পূরের গন্ধ! কী পারফিউম ওটা! না, রাধিয়া জিজ্ঞেস করতে পারেনি। ও শুধু দাঁড়িয়ে দেখেছিল, ফলসাদের বাড়ির সামনের আধো-আলো আধো-অন্ধকার রাস্তা ধরে একটা সাইকেল মিলিয়ে যাচ্ছে আবছা ঝিমঝিম অন্ধকারে।
তারপর কয়েকদিন কখনও সন্ধেবেলা, আবার কখনও রাত্রিবেলা, আচমকাই হাওয়ার সঙ্গে মিশে, হাওয়ায় ভেসে-ভেসে ওর কাছে ফিরে আসছিল গন্ধটা। আর রাধিয়া যেন দেখতে পাচ্ছিল, একটা সাইকেল আধো অন্ধকারে ডুবে, ভেসে মিলিয়ে যাচ্ছে কোথায়! শুধু ছোট্ট প্রজাপতির মতো হাওয়ায় উড়ছে আলতো হলুদ একটা পাঞ্জাবি!
সেদিনের পরে নিশানকে আজ এই দেখল ও। কী বলবে এখন রাধিয়া! প্রায় জনাপঁচিশেক ছেলেমেয়ের মধ্যে পেছনের দিকে বসে রয়েছে নিশান। সোজা তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। ও কেন তাকাচ্ছে অমন করে! আর রাধিয়ারই-বা ওর দিকে কেন বারবার চোখ পড়ে যাচ্ছে!
সুম্পা রাধিয়ার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে ফরাসের একদিকে রেখে, সামনে তাকিয়ে বলল, “দিস ইজ় রাধিয়া, পলি অ্যান্ড বুদা…” তারপর হেসে ভিড়ের দিকে হাত দেখিয়ে রাধিয়াদের বলল, “আর শোন, দিস ইজ় এভরিবডি।”
পলি রাধিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “সুম্পার দাদা বিখ্যাত আঁতেল, জানিস তো! এরা বোধহয় ওর সেই কবি-সাহিত্যিক বন্ধুরা।”
“কী রে ফিসফিস করছিস?” সুম্পা পলিকে সামান্য ধাক্কা দিল। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “রাধিয়া খুব ভাল গান গায়। এখন ও গান গেয়ে শোনাবে। আমায় বলেছিল, আজ ও গান গাইবে।”
“গান?” রাধিয়া একটু চমকে গেল, “আমি কবে বললাম রে?”
সামনের সারি থেকে রোগা, বেঁটে, চশমাপরা একজন বলে উঠল, “কেন, না বললে কি শোনানো যায় না? আমার প্যাঁও তো কিছু না বললেও শোনায়!”
“আবার শুরু করেছিস, স্মরণ!” পাশ থেকে একটা ছেলে বলে উঠল, “সবসময় প্যাঁও! শালা প্যাঁওটা কে রে? একদিনও তো দেখলাম না!”
সুম্পা দ্বিতীয় ছেলেটাকে বলল, “শোন জিৎ, স্মরণের কোনও প্যাঁও নেই। ও ঢপ মারে!”
“প্যাঁও নেই?” স্মরণ সোজা হয়ে বসে একটু উত্তেজিত হল, “আরে, প্যাঁও আমার প্রেমিকা। কতবার বলেছি তোদের! তবে সবার সঙ্গে মেশে না। তোদের সঙ্গে মিশবে না। আর তোর সঙ্গে তো মিশবেই না। যারা বিদেশে থাকে তাদের সঙ্গে মেশে না, তাই আসে না।”
জিৎ বলল, “তোর সঙ্গেও তো মেশে না! তাই ঢপ মারিস!”
ঝগড়াটা বাড়ত। কিন্তু সুম্পা হাত তুলে বলল, “কেক কাটার আগে রাধিয়া গান গাইবে। কেউ ঝগড়া করবে না কেমন!”
“ওরে, তুই এই বুড়ো বয়সে কেকও কাটবি!” স্মরণ মোটা চশমার পেছনে চোখগুলো গোল করল, “তবে আমায় এক পিস এক্সট্রা দিয়ে দিস তো। প্যাঁওকে দেব।”
