“রাধি!” আচমকা চিৎকারে রাধিয়া চমকে পেছনে তাকাল। আরে, এই তো বুদা আর পলি! ওঃ! প্রচণ্ড ভিড়, গরম আর ঘিঞ্জি কলকাতা ভিজিয়ে যেন বৃষ্টি নামাল রাধিয়ার মনে!
পলি আর বুদা এসে দাঁড়াল ওর সামনে।
“তুই, অটোয়! কোক কি পেপসির ক্যানে বিক্রি হচ্ছে নাকি রে?”
রাধিয়া কিছু না বলে হাসল।
পলি হয়তো আরও কিছু বলত, কিন্তু রাধিয়ার পেছনে কাউকে দেখে যেন থমকে গেল। রাধিয়া পেছনে ফিরল। অটোটা সিগনালে দাঁড়িয়ে। পলি তাকিয়ে রয়েছে অটোর সামনের সিটে বসা ছেলেটার দিকে। ছেলেটাও তাকিয়ে দেখছে পলিকে। ছেলেটার মুখে একটা হাসি আসবে কি আসবে না ধরনের দ্বন্দ্ব নিয়ে লুকোচুরি খেলছে।
পলি কিন্তু হাসছে না। রাধিয়া অবাক হল। ছেলেটা এবার হাসল, কিন্তু হাসিটা সম্পূর্ণ হল না। কারণ, সিগনাল পেয়ে অটোটা দ্রুত ছিটকে বেরিয়ে গেল সামনে!
রাধিয়া তাকাল পলির দিকে, “তুই ছেলেটাকে চিনিস?”
পলি নাক টানল। তারপর বলল, “চিনি মানে দু’বার কথা হয়েছে। প্রতাপাদিত্য রোডে রিতুদা বলে এক পার্টি নেতার কাছে গেছি তো কয়েকবার। ওই আমাদের ‘ব্রোঞ্জ ইয়ারস’-এর জন্য একটা বাড়ির তদবির করতে। সেখানে দু’-তিনবার দেখা হয়েছে। তবে বেশি না। জাস্ট কয়েকটা সেনটেন্স। তাও লাস্ট কয়েকবার দেখিনি।”
বুদা বলল, “দেখে তো ভাল বাড়ির মনে হয় না!”
রাধিয়া বলল, “আবার শুরু করলি! মানুষকে ওভাবে চেনা যায়? কী মেয়ে রে তুই! আবার রাজনীতি করিস!”
বুদা হাসল, “তুই শালা এত ফেদার-টাচ টাইপ কেন বল তো? দেখে যা মনে হল বললাম। কী বল পলি?”
পলি রুমাল দিয়ে চেপে ঠোঁটটা মুছল। তারপর কী মনে পড়ায় ডানদিকে হাত দিয়ে ব্লাউজ়ের পাশ দিয়ে হালকা উঁকি দেওয়া ব্রেসিয়ারের স্ট্র্যাপটা ব্লাউজ়ের ভেতরে গুঁজে দিয়ে নিজের মনে সামান্য হাসল। তারপর বলল, “চল তাড়াতাড়ি। সুম্পা রাগ করবে! বাকিরা বোধহয় এসে গেল।”
রাধিয়া বলল, “অনেকটা নাকি রে? মানে অনেকটা হাঁটতে হবে?”
বুদা বলল, “তা তো একটু হবে রূপাঞ্জেল! টাওয়ারে থাকতে-থাকতে তোমার অভ্যেস খারাপ হয়ে গিয়েছে সোনা। তবে তুই পারবি। এই সেলের ভিড়ের গড়িয়াহাট ঠেলে যখন অটোয় চড়ে এসেছিস, তখন এটুকু হাঁটা তো নস্যি জানেমন!”
রাস্তাটা পার হয়ে ফার্ন রোডে ঢুকল ওরা। রাস্তার ওপর সার দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। গোলপার্কের দিক থেকে আসছে অধিকাংশ গাড়ি। ফুটপাথের ওপরে হকার বসে আর লোকজন থাকতে শুরু করায় এমনিতেই তো হাঁটার জায়গা আর নেই কলকাতায়। তারপর রাস্তাজোড়া গাড়ি! রাধিয়া বারবার পিছিয়ে পড়ছে। ডান দিকে বাঁ দিকে জামা-কাপড়ের দোকানের সঙ্গে রংচটা সোনার দোকান, পুরনো বইয়ের দোকান, স্টেশনারি দোকান। পলি আর বুদা কিছুটা এগিয়ে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ছে আর এগিয়ে আসতে বলছে রাধিয়াকে।
রাধিয়ার অসহায় লাগছে খুব। এত দোকানপাটের মধ্যে ফুটপাথে হাঁটার সরু জায়গা। তার মধ্যে কলকাতার লোকজনের তো বেশ একটা গদাইলশকরি চাল আছেই! তাই তাদের রাস্তা জুড়ে ‘একদিন ঠিক পৌঁছব’ ধরনের হাঁটা ঠেলে এগোতে পারছে না ও।
ব্যাপারটা বেশ কয়েকবার দেখে বুদা পিছিয়ে এসে হাত ধরল রাধিয়ার। বলল, “শালা, এমন করে হাঁটলে সুম্পার নেক্সট ইয়ার বার্থডে-তে পৌঁছব। ধাক্কা মেরে, খিস্তি করে পথ বের করতে হয় এখানে। এরা সব দুর্যোধন। বিনা রণে সূচ্যগ্র মেদিনীও দেবে না, বুঝলি?”
বলেই রাধিয়ার হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে-টানতে নিয়ে আশপাশের লোকজনকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে, গুঁতিয়ে এগিয়ে গেল। তারপর গলির আরও ভেতরে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় গিয়ে শ্বাস নিল ওরা।
বুদা হাতটা ছেড়ে বলল, “রাধিয়া, তুই বিদেশে বিয়ে করে চলে যাস। এখানে থাকিস না। নির্ঘাত মারা পড়বি!”
পলি বলল, “দেশটার কী অবস্থা বল তো! কেউ কোনও নিয়ম মানে না। পুলিশ প্রশাসনের লোকজনের কি চোখ নেই?”
বুদা হাসল, “খোঁকি শ্বশুরবাড়ি যাবিস-এর সময় নেই খেন্তিপিসি! সকলের চোখ আছে। তার চেয়েও বেশি আছে মাথা। তুই ভোট দিস? এরা দেয়। এরাই রিয়েল পাওয়ার। এদের চটালে চট নিয়ে বসতে হবে রাস্তায়, সেটা নেতারা জানে। তাই ‘লুটেপুটে যা খুশি করো’-র লাইসেন্স এদের দেওয়া হয়েছে। তুই নালিশ করতে গেলে বলবে, একটু অ্যাডজাস্ট করে নিন না! নিজের জীবনে বেহায়াপনাটা জাস্ট অ্যাড করে নিতে পারলে আর এখন বাঁচতে অসুবিধে হবে না। ফলে কানে তুলো, পিঠে কুলো। বুঝলে খুকুমণি!”
রাধিয়া দেখল, কথাগুলো হাসতে-হাসতে বললেও বুদার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। বুদা ইউনিভার্সিটিতে প্রথমদিকে পলিটিক্স করত। এখন আর করে না। কিন্তু একটু র্যাডিকাল পলিটিক্সে ওর আগ্রহ আছে। সেটা মাঝে মাঝে কথায় ফুটে বেরোয়।
পলি বলল, “এটা একটা দিক। কিন্তু গরিব মানুষগুলোর কথা ভাববি না? এরা যাবে কোথায়?”
“স্বাধীনতার পর থেকে এতদিন গেল, কলকাতা কতটুকু বাড়ল রে! আর-একটা সিটি তৈরি হল না কেন, যে কিছুটা এই শহরের ভার নিতে পারবে! রাজারহাটের কথা বলবি না, ওটা এখনও কিছুই করতে পারেনি। শালা হেরিটেজ নষ্ট করে, সারা শহরটায় গিজগিজে লোক বসিয়ে, মোচ্ছব আর পুজো করে গোটা সমাজটা ভোগে গেল! আর সব সেই ভোগ খাবে বলে পাতা হাতে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সব সমান! শালা…” দু’ অক্ষরেই থেমে গেল বুদা।
