রাধিয়া হাঁ হয়ে গেল। একটানা কথাগুলো বলে লোকটা থমকাল একটু। হাঁপাচ্ছে! রাধিয়া দেখল আশপাশের ভিড়টা কেমন যেন থমকে গিয়েছিল এই সময়টায়। তারপর লোকটা থামতেই কেমন চটরপটর হাততালি আর হাসির ছররা উঠল চারিদিকে। লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন গ্রহণ করল। তারপর উপস্থিত সকলের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল বই বিক্রি করার জন্য।
রাধিয়া এরকম কাউকে কখনও দেখেনি। এভাবে যে কেউ বই বিক্রি করতে পারে ভাবতেও পারেনি। ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। বেঁটে, সামান্য-খুঁড়িয়ে-হাঁটা একটা মানুষ। গায়ে ময়লা জামাকাপড়। কাঁধে ঝোলা। হাতে একগোছা বই। বোঝা যাচ্ছে যে, ঝোলাটা বইতে কষ্ট হচ্ছে। তবু হাসিমুখে লোকটা যাচ্ছে সকলের কাছে। অধিকাংশই কিনছে না। কিন্তু লোকটার মুখের হাসিটা অমলিন। এমন করেও বেঁচে থাকে লোকে! এই মিনিটদশেক এখানে দাঁড়িয়েই কত কিছু যেন শিখে গেল রাধিয়া! ‘হ্যাপি প্রিন্স’-এর মতো বাবার ছোটবেলার পরি যেন আজ এই সময়টুকুতেই কিছুটা স্বাদ পেল আসল পৃথিবীর। এই মানুষটারও তো বাড়িতে বউ আছে নিশ্চয়। ছেলেমেয়ে? তাও আছে। তাদের ইচ্ছে, আহ্লাদ আর আনন্দগুলো লোকটা এই সামান্য বই বিক্রি করে মেটাতে পারে। এই চারদিকে উপচে পড়া পণ্যের ভেতরে এইসব মানুষগুলো কীভাবে এমন শান্ত মুখে থাকে! এদের লোভ নেই? ইচ্ছে নেই? এদের বাচ্চাদের জীবনে সেল বা পুজোয় নতুন জামা নেই?
“দাদা,” রাধিয়া লোকটাকে ডাকল।
লোকটা সামান্য খুঁড়িয়ে এগিয়ে এল ওর দিকে।
“আমায় একটা সেট দিন!”
লোকটা ভুরু তুলল। তারপর হেসে বলল, “শিয়োর ম্যাডাম।”
কাঁধে ঝোলানো নীল তাপ্পিমারা ঝোলার ভেতর থেকে বের করে আনল একটা প্লাস্টিক। তারপর তাতে ভরে দিল বইগুলো, “এই যে ম্যাডাম।”
রাধিয়া একটা একশো টাকার নোট দিল লোকটাকে।
লোকটা বলল, “এই রে! খুচরো নেই?”
রাধিয়া বলল, “না তো!”
“আচ্ছা, দাঁড়ান, দেখি ওরা দিতে পারে কি না!” লোকটা ফুটপাথের ধারে এগিয়ে গেল মেহেন্দির দোকানের দিকে।
রাধিয়া পিছিয়ে এল দু’পা। তারপর রাস্তার দিকে তাকাল। একটা অটো এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। পেছনের সিট থেকে নামল দু’জন। কালো, রোগা, মাথায় ঝাঁকড়া চুলোগুলো হেয়ার ব্যান্ড দিয়ে আটকানো। অটোচালকটি চিৎকার করছে, “বালিগঞ্জ, বালিগঞ্জ।”
রাধিয়া দ্রুত এগোল। একজন মোটামতো ভদ্রমহিলাকে সামান্য ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়ল অটোর ভেতরে। ভদ্রমহিলা রাগতস্বরে কিছু একটা বললেন। কিন্তু রাধিয়া পাত্তা দিল না। ও বসামাত্রই ওর পাশে এসে বসে পড়ল একজন বয়স্ক লোক। গাড়ি ভরতি। অটোচালকটি আর দেরি না করে ছেড়ে দিল গাড়ি।
“ম্যাডাম…”
চারদিকের চিৎকার, গাড়ির হর্ন আর অটোর আওয়াজের মধ্যে আবছাভাবে “দিদি!” ডাকটা শুনতে পেল রাধিয়া। ও হাসল শুধু। তারপর সামনের অটোচালকটিকে বলল, “ভাই ফার্ন রোডে নামব। ভাড়া কত?”
ভাড়া বলে অটোচালকটি বলল, “ভাড়া হাতে রাখুন, দিদি…” তারপর সামনের সিটে ওর পাশে বসে থাকা লম্বাচওড়া ছেলেটাকে বলল, “তুই মাইরি নকশা করেই গেলি! দ্যাখ, রিতুদা আমায় অটো কিনে দিল। পারমিট নেই, তাও দাবড়ে বিজ়নেস করছি। কারও বাপ শালা কিছু করতে পারবে না। জানিস তো আমি এটা ভাড়ায় দিই, আবার কখনও-কখনও নিজেও চালাই! মাল্লু আসে কাকা! সেখানে তোকে এত করে বলল, তুই দু’-একদিন গিয়ে আবার বসে গেলি। মাইরি, রিতুদা খচে গেলে কিন্তু বিলা কেস হয়ে যাবে। একটু বোঝ মাহির!”
রাধিয়া দেখল বড়সড় চেহারার ছেলেটা কিছু বলল না। বরং চুপ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকল।
গাড়িটা এসে গড়িয়াহাটার সিগনালে দাঁড়িয়েছে। চালকটি পেছনে ফিরে সকলের কাছ থেকে ভাড়া নিল। তারপর যাকে যার মতো খুচরো ফেরত দিয়ে আবার বড় চেহারার ছেলেটার দিকে তাকাল, “তুই মাইরি ক্যালানে না শয়তান, কে জানে! রিতুদা কালকেও বলল আমায়। বলল, ওকে নিয়ে আয়, কলকাতার ফার্স্ট ডিভিশনে চান্স করিয়ে দেব। আর তুই…”
“ফার্স্ট ডিভিশনে!” এবার ছেলেটা ঘুরে তাকাল।
সামনে সিগনাল খুলে গিয়েছে! গাড়িটা স্টার্ট করে চালকটি বলল, “তবে তোকে কী বলছি! চল ভাই। আর কতদিন তোদের পতাদার ভুঁড়ি দেখে দিন কাটাবি! চল।”
“ফার্স্ট ডিভিশনে! সত্যি!”
“শালা, আমি কি ঢপ দিচ্ছি? আর রিতুদা কি ঢপ দেয়? চল আজকেই। দাদা হেব্বি খুশি হবে।”
রাধিয়ার ইচ্ছে করছে না এসব শুনতে। বরং ফার্ন রোডে নেমে কীভাবে কাঁকুলিয়া রোডে যাবে সেই নিয়ে যথেষ্ট চিন্তায় আছে!
অটোটাও বাস আর গাড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ফুটপাথের লোক উপচে এসে পড়েছে রাস্তায়। মানুষজন প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে গাড়ির ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে রাস্তা পার হচ্ছে! রাধিয়ার বাঁ দিকের লোকটি বড্ড ঘেঁষে বসেছে রাধিয়ার দিকে। লোকটার শরীর থেকে নোনতা একটা গন্ধ হাওয়ার সঙ্গে এসে ঢুকছে। ওঃ, গা গুলোচ্ছে রাধিয়ার।
“দিদি, ফার্ন রোড,” লাল সিগন্যালের সামনে ফুটপাথ ঘেঁষে অটোটা দাঁড় করাল চালকটি।
রাধিয়া পাশের লোকটিকে বলল, “এক্সকিউজ় মি।”
লোকটা তাকাল রাধিয়ার দিকে। তারপর নেমে দাঁড়াল রাস্তায়। রাধিয়া নিজেকে যতটা পারল সংকুচিত করে নেমে পড়ল। কিন্তু তাও লোকটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নোনতা গন্ধটা আবার নাকে এল। ইস! রাধিয়া বাজে গন্ধ একদম নিতে পারে না। ও কোনওমতে নিজেকে সামলে দাঁড়াল ফুটপাথ ঘেঁষে।
