রাধিয়া বলল, “কী বলছেন?”
মেয়েটা খরখরে গলায় বলল, “মেহেন্দি পরবেন?”
“আমি? না তো!” রাধিয়া মাথা নাড়ল।
“তো, বেকার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বিজ়নেসের সময়! সরে যান! তখন থেকে জ্যাম করে রেখেছেন সামনেটা!” মেয়েটা ঝাঁজিয়ে উঠল।
রাধিয়া কী বলবে বুঝতে পারল না। ভালমানুষি দেখিয়ে মধুদাকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেই তো নিজের বিপদ ডেকে এনেছে। সেই সোনাঝুরিতে একা লোকাল ট্রেনে করে যাওয়ার যে-অ্যাডভেঞ্চার ছিল, সেটার তুলনায় এই ভিড় ও মানুষের স্রোত ভেঙে কাঁকুলিয়া রোড পৌঁছনো অনেক কঠিন।
“কী হল? কথা কানে যাচ্ছে না!” মেয়েটা এবার বেশ রেগে উঠল, “দোকানের সামনে থেকে সরুন। এভাবে দাঁড়ালে আমাদের অসুবিধে হচ্ছে!”
রাধিয়া ঘাবড়ে গেল এবার। মেয়েটার গলার তীক্ষ্ণতা বড্ড বেশি। আশপাশের সবাই মুখ ফিরিয়ে তাকাচ্ছে। সকলের চোখেই বিরক্তি। আসলে সকলেই আজকাল সবসময় বিরক্ত হয়ে থাকে। সকলেই খুব ব্যস্ত। সকলের কার সঙ্গে যেন অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। কারা যেন সকলের জন্য অপেক্ষা করে আছে। সকলেই যেন এক মঞ্চ থেকে নেমে আর-এক মঞ্চে উঠবে। সকলেই সেলেব্রিটি। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে সকলের পাঁচশো বন্ধু। সকলের ছবিতে শ’য়ে-শ’য়ে লাইক। সকলেই অটোগ্রাফ দেবে বলে উদ্গ্রীব, কিন্তু অটোগ্রাফ নেওয়ার লোকটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সকলেই বিরক্ত। যেমন এই মেয়েটি।
রাধিয়া দ্বিধা নিয়ে বলল, “আমি কাঁকুলিয়া রোড যাব কী করে বলতে পারেন?”
মেয়েটা হয়তো আরও খারাপ কিছু বলত এবার, কিন্তু রাধিয়ার কথার ভঙ্গি আর গলার স্বর দেখে থমকে গেল। বুঝল কিছু একটা। তারপর বলল, “এ তো কাছেই। আপনাকে সামনে যেতে হবে। রাস্তায় নেমে দাঁড়ান। একটা অটো ধরুন। গড়িয়াহাটার অটো নয়, বালিগঞ্জের অটো ধরবেন। তারপর ফার্ন রোডের মোড়ে নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করে নেবেন। ভেতর দিয়ে হেঁটে কাছেই। বুঝলেন?”
“থ্যাঙ্ক ইউ,” রাধিয়া নরম করে বলল।
তারপর ব্যাগটাকে সামলে মেহেন্দি পরানোর দুটো স্টলের মাঝখানের জায়গা দিয়ে রাস্তায় নামল। যেতে যখন হবেই তখন সত্যি এরকম ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থেকে তো আর লাভ নেই।
রাস্তায় লোক গিজগিজ করছে। পুজোর আগেও এমন অবস্থা হয়। কিন্তু সত্যি বলতে কী, রাধিয়া এভাবে ফুটপাথে ঘুরে-ঘুরে বাজার করে না। তাই এই ভিড়টা ওকে ঠেলতে হয় না!
রাধিয়া ডান দিকে তাকাল। বাস, ট্রাম, গাড়ি সব ধেয়ে আসছে। কিন্তু সব ক’টাই তো ভরতি। তবে? রাধিয়া কিছু ভাবার আগেই আচমকা চিৎকার শুনল একটা। খোনা গলা। পুরুষের। সকলের মতো রাধিয়াও চমকে পেছনে তাকাল।
একটা লোক। বেঁটে। কাঁচাপাকা এলোমেলো চুল। ছাই রঙের হাফহাতা শার্ট আর গোড়ালির ওপর অবধি গোটানো একটা আধময়লা প্যান্ট। কাঁধে পেটমোটা একটা ঝোলা। লোকটার গায়ের রং পুড়ে ইটের মতো হয়ে গিয়েছে। গাল দুটো তোবড়ানো। থুতনিতে সাত দিনের না-কাটা কাঁচাপাকা দাড়ি। শুধু লোকটার বড় কালো চোখ দুটো উজ্জ্বল! লোকটা একটু লেংচে হাঁটছে। তার মধ্যেও মুখে হাসি আর হাতে-ধরা গোছা পাতলা চটি বই। লোকটা বইগুলো হাতপাখার মতো করে নাড়াচ্ছে!
রাধিয়া দেখল লোকটাকে। তারপর শুনল, লোকটা চেঁচিয়ে বলছে, “মানুষ ফুরিয়ে যায় আর থেকে যায় তার কথা। তার নিজের কথা, তার মনের ভেতর জমা হওয়া কথা। ইতিহাস সাক্ষী আছে, মানুষ লিখতে পছন্দ করে। স্টোন ট্যাবলেট, মাটির ট্যাবলেট, মোমের ট্যাবলেট থেকে শুরু করে নীল নদের পাশে পাওয়া প্যাপিরাস ছুঁয়ে, পার্চমেন্ট স্পর্শ করে আধুনিক কাগজ হয়ে এখন ইলেকট্রনিক ট্যাবলেটে মানুষ লিখে যাচ্ছে ক্রমাগত! সারা জীবন ধরে লিখেই যাচ্ছে সে! সেই আদিম ট্যাবলেটকে জড়ো করে রাখা থেকে প্যাপিরাসকে গুটিয়ে স্ক্রোল বানানো থেকে মানুষ চিরকাল চেয়েছে তার নিজের কথাকে যত্ন করে ধরে রাখতে! হেরোডোটাস বলেছেন, ফোনেশিয়ানরা এই প্যাপিরাস আর লেখার প্রক্রিয়া নিয়ে এসেছিল প্রাচীন গ্রিসে। সেই তার জয়যাত্রার সূচনা। প্যাপিরাস হয়ে কাঠের পাতলা ‘ব্যাম্বু বুক’ হয়ে আমাদের তালপাতার পুঁথি ছুঁয়ে, গুটেনবার্গের ছাপাখানা অবধি পৌঁছে এ জিনিস মানুষের সভ্যতা ও তার উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে। এ সেই জিনিস, যা মানুষকে বাড়তে দিয়েছে, জানতে দিয়েছে, ছড়িয়ে পড়তে দিয়েছে! সেই জিনিস, যে মানুষের একলা সময়ের বন্ধু। দূর সফরের সঙ্গী। পালা-পার্বণে উপহার। প্রেমপত্র বহন করার মাধ্যম। সাজিয়ে রাখার অহংকার। সেই জিনিস, যা প্রাচীনকাল থেকে প্রতিটি বিজ্ঞানী আর দার্শনিকের মনের আলো। সেই জিনিস, যা এখনকার পৃথিবীতে আমাদের রোজকার সঙ্গী। আমি আজ এই সেলের বাজারে মানুষের উপকারের জন্য আবার একবার নিয়ে এসেছি তাকে। কমপিউটারের যুগে যা আজও অপরিহার্য। আমাদের সংস্কৃতির যা অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি নিয়ে এসেছি সেই জিনিস যা ওল্ড ইংলিশে ‘বক’, স্লাভিক ভাষায় ‘বাকভা’, চিনেভাষায় ‘শু’, আরবিতে ‘কিতাব’, আরমেনিয়ানে ‘গির্ক’, ফরাসিতে ‘লিভ্রা’, স্পেনীয় ভাষায় ‘লিব্রো’ আর আমাদের মাতৃভাষায় বই। সুধীজন, বেজুবান, কদরদান ও ফ্যান অফ শাহরুখ খান। নিয়ে যান, নিয়ে যান, নিয়ে যান। বাচ্চাদের গ্রামার শেখানোর, ফ্লুয়েন্টলি ইংরেজি বলার জন্য এই সেলের বাজারে আমার বই। শুধু গায়ের পোশাক নয়, নিয়ে যান মনের আশ্রয়। আমার এই চারটে বই একসঙ্গে মাত্র কুড়ি টাকায়। স্পেশ্যাল অফার। কুড়িয়ে নিন কুড়িকে। আর নিজেকে অংশ করে তুলুন মহান হেরোডোটাস থেকে কোপারনিকাস হয়ে ইবনবতুতা, শেক্সপিয়র, মিলটন, কিটস, নিউটন, আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, জয়েস, মিলার হয়ে এখনকার হকিং, কামু আর পামুকের। গর্ববোধ করুন তাদের সঙ্গে আপনার মিল থাকার বিন্দুর। গর্ববোধ করুন যে, আপনিও এই সব মহান মানুষের মতোই বই হাতে তুলে নিয়েছেন। আর তাই সেই সু্যোগ হাতছাড়া না করে, নিয়ে নিন আমার আনা স্পেশ্যাল শিক্ষার মাধ্যম। চারটে বই। একসঙ্গে মাত্র কুড়ি! কুড়ি টাকা! খরচা কম, চর্চা বেশি। কাকা কথা হবে না!”
