ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে আবার মাথার ওপরের সুইচটা টিপল রাধিয়া। নাঃ। সেই কালো স্ক্রিন! চোয়াল শক্ত করল রাধিয়া। আজ দিনটাই কেমন যেন। তার ওপর রাসবিহারীর দিকটায় আকাশটা কালো হয়ে এসেছে। প্রথম এপ্রিলের সাংঘাতিক গরম ভেদ করে তবে কি এবার বৃষ্টি আসবে? শহর কি শেষ চৈত্রে এসে প্রথম মাথা পেতে নেবে কালবৈশাখীকে!
রাধিয়া অসহায়ের মতো একবার আকাশ আর একবার সামনে ছড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়টাকে দেখল। এই কি ব্যূহ! এটা ভেদ করে ও যাবে কী করে?
বিকেল সাড়ে পাঁচটার গড়িয়াহাটা মানে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটা। তার মধ্যে সব দোকানদার ‘সেল’ ঝুলিয়ে ক্রমাগত চিৎকার করে চলেছে কার জিনিসপত্র কত সস্তা। কে কত ডিসকাউন্ট দিচ্ছে। এর মধ্যে কীভাবে সুম্পার বাড়ি পৌঁছবে ও! এর চেয়ে মাঝসমুদ্রে রবারের ডিঙিতে ভাসাও বোধহয় ভাল ছিল।
রাধিয়া ভাবল মধুদার কথা শুনলেই ভাল হত। মধুদা তো বলেছিল ওর অসুবিধে হবে না। মধুদার বউ না হয় ডাক্তারের চেম্বারে একটু অপেক্ষা করবে।
কিন্তু রাধিয়ার একটুও ভাল লাগছিল না। আসলে মা এমন বিচ্ছিরিভাবে মধুদাকে বকাবকি করেছিল যে, রাধিয়ার কেমন যেন অপরাধবোধ হচ্ছিল একটা।
এটা হয় রাধিয়ার। কেউ কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে, ওর নিজের কেমন একটা অপরাধবোধহয়। রাধিয়া কিছু বলেইনি। ও কোনওভাবে হয়তো সেই ঘটনাতে যুক্তও নয়। তবু ওর মনের ভেতরটা কেমন করে! কেমন যে করে সেটা ঠিক নিজের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে করে কিছু একটা। বকুনি খাওয়া, মনখারাপ করে, ম্লান মুখে চলে যাওয়া মানুষগুলোর মন, কিছু একটা করে ভাল করার চেষ্টা করে রাধিয়া। পলি বলে, “বড্ড বাড়াবাড়ি করিস তুই রাধি।”
তা হবেও-বা বাড়াবাড়ি। কিন্তু রাধিয়া কী করবে! ওর তো এমনটাই মনে হয়। জোর করে কিছু করবে কী করে ও!
গাড়িতে উঠে সামনের আয়নায় মধুদার মুখটা অর্ধেক দেখতে পাচ্ছিল রাধিয়া। কেমন একটা ঘষা কাচের মতো চোখ। লম্বাটে ঝুলে পড়া মুখ। কাঁচা-পাকা ভুরুগুলো কেমন যেন কষ্টে কুঁকড়ে গিয়েছে।
আলিপুর জেলের সামনেটা পেরোনোর সময় রাধিয়া জিজ্ঞেস করেছিল, “ক’টায় শিখামাসির ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট মধুদা?”
“শিখার?” মধুদা মুখ না ফিরিয়েই ক্লান্ত গলায় বলেছিল, “সোয়া ছ’টা।”
“কোথায়?”
“ওই প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের ওখানে একটা পলিক্লিনিকে। কেন গো রাধিদিদি?”
রাধিয়া গাড়ির ড্যাশবোর্ডে লাগানো ঘড়িটা দেখে নিয়ে বলেছিল, “তুমি আমায় রাসবিহারীতে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যাও। তারপর সব কাজ মিটিয়ে আমায় আবার পিক আপ করে নেবে কাঁকুলিয়া থেকে।”
“সে কী!” এবার মধুদা একটু সময়ের জন্য পেছনে ফিরে তাকিয়েছিল। তারপর আবার সামনে তাকিয়ে বলেছিল, “এ হয় না রাধিদিদি। ম্যাডাম জানলে রাগ করবে।”
“আরে দূর, জানলে তো করবে!” রাধিয়া এগিয়ে বসে বলেছিল, “মধুদা, আমি যা বলছি শোনো। আমায় নামাও। আমি ঠিক চলে যাব। তুমি কাজ সেরে আবার এসো। কেউ জানতে পারবে না।”
মধুদা বলেছিল, “তুমি চেপে বোসো দেখি। আমি পরে শিখাকে নিয়ে যাব।”
“আঃ,” রাধিয়া বলেছিল, “তোমরা কেউ আমার কথা শোনো না কেন? আমি কি বাচ্চা আছি নাকি এখনও? আমি মোটেও খুকি নই। রাস্তাঘাটে ভিড় বাস বা অটো দেখে মোটেও ভয় পাই না আমি।”
মোবাইলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে আতঙ্ক নিয়ে রাস্তায় উপচে পড়া বাস আর হেলে পড়া গাড়ির মধ্যে দিয়ে মাথা নিচু করে ছোটা অটোগুলোকে দেখল রাধিয়া! এগুলোয় উঠবে কী করে ও! ভয়ে গলা শুকিয়ে গিয়েছে রাধিয়ার। ও বুঝল যে, আসলে আমরা অনেক কথাই তাৎক্ষণিকভাবে বলে ফেলি। অনেক কথাই বলি নিজেদের মাপ আর ধারণক্ষমতা না বুঝে। কিছুটা আবেগ আর কিছুটা নিজের মনের মধ্যে অবচেতনায় বহন করা নায়ক বা নায়িকার প্রোজেকশনের পাল্লায় পড়ে আমরা এমন কাজ করে ফেলি। যাতে, পরে নিজেরই মনে হয় এমনটা না করলেই ভাল হত!
মধুদা রাসবিহারীতে ছাড়েনি ওকে। কিন্তু রাধিয়ার দেওয়া চাপে বাসন্তী দেবী কলেজের সামনে ওকে ছেড়ে মধুদা গাড়িটা ডান দিকে টার্ন করে বেরিয়ে গিয়েছে সাদার্ন অ্যাভেনিউয়ের দিকে। বলে গিয়েছে, আটটার মধ্যে ঠিক পৌঁছে যাবে কাঁকুলিয়া রোডে।
কলেজটার সামনের দেওয়াল ঘেঁষে শাড়ির দোকান। উলটোদিকে সার দিয়ে বসে রয়েছে মেহেন্দি এঁকে দেওয়ার ছেলেরা। তবে শুধু ছেলে নয়, কিছু মেয়েকেও দেখল রাধিয়া। তারা কাস্টমারদের হাতে মেহেন্দি পরাচ্ছে।
ভিড়ের চাপে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না ও। কলেজের পাশেই ছোটখাটো একটা মল। সেখান থেকেও গলগল করে মানুষ বেরোচ্ছে!
এ কী বেকায়দায় পড়ল রাধিয়া! এখন ও কী করবে! মোবাইলটা বন্ধ। আর সত্যি বলতে কী সুম্পার নম্বরটাও মুখস্থ নেই। এই হয়েছে এক বিপদ। এখন মোবাইলে সব নাম লেখা থাকে বলে কারও নম্বর মুখস্থ থাকে না। দরকার পড়ে না তো!
“দিদি, পরবেন নাকি? ও দিদি?”
একটা তীক্ষ্ণ মেয়েলি গলার ডাকে সামনে তাকাল রাধিয়া। লাল কুর্তি আর জিন্স পরে একটা মেয়ে বসে রয়েছে সামনের মেহেন্দি স্টলটায়। মেয়েটার বয়স ওরই মতো। চোয়াল নড়ছে মেয়েটার। বোঝা যাচ্ছে পানমশলা খাচ্ছে। খয়েরি রঙের চুলগুলো গোছা করে বাঁধা। ওর স্টলের সামনে চারটে সিট। চারটেই ভরতি।
