মা এই বলে, বাবাকে ওর নামে বলবে। এই বলে, বাবা সময় দেয় না। মা যে কী চায়! ওদের বিশাল বড় ব্যাবসা। সেদিকে বাবার সময় না দিলে চলবে? বাবা অনেক সময় নানা টুরে যায়। সেটা তো ব্যাবসার জন্যই না কি? শুধু তো আর সোনাঝুরির জুটমিল নয়, ওদের কাপড়ের ব্যাবসা আছে। রাইস মিল আছে। ফুড প্রোডাক্টের ব্যাবসা আছে। এখন বাবা একটা অন্য ব্যাবসা শুরু করবে। এত কিছু যে-মানুষটা করে, তার কি অন্যদিকে মন দেওয়ার সময় আছে? মা এত তলিয়ে ভাবে না।
রাধিয়া ঘড়ি দেখে বলেছিল, “তুমি আমার ওপর রাগ করে টাইম নষ্ট করছ কেন? তোমায় না পার্লারে যেতে হবে!”
“অ্যাঁ!” মা এবার চমকে উঠে তাকিয়েছিল রাধিয়ার দিকে, “তাই তো! বুজু তো গাড়িটা এখনও বের করল না! কী যে করে না!”
হাসি পেয়ে গিয়েছিল রাধিয়ার। বুজু হল মায়ের রাইটহ্যান্ড। মায়ের সব কাজ বুজু করে দেয়। এমনকী, মায়ের গাড়িটাও বুজুই চালায়। সবাই একটু থমকে যায় বটে মহিলা গাড়িচালক দেখে। কিন্তু বুজুর মজা লাগে! বলে, “জানো রাধি, আমার যা মজা লাগে না! সব বাড়ির ড্রাইভাররা তো পুরুষ। তাই আমায় দেখে সবাই চমকে যায়!”
তবে রাধিয়ার মনে হয় ঠিকই আছে। বুজুর গাড়ি চালানোর হাত খুব ভাল। ওদের চারটে গাড়ি। একটা বাবা চড়ে অফিস যায়। একটা ও ব্যবহার করে। এই এসইউভিটা মা নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে আর একটা ছোট হ্যাচব্যাক আছে সেটা বাড়ির জন্য!
রাধিয়া মায়ের ভ্যাবাচ্যাকা মুখ দেখে বলেছিল, “যাও দ্যাখো, কী হল।”
মা নিজেকে সামলে নিয়েছিল দ্রুত। বাদামি চুলগুলো সামলাতে-সামলাতে বলেছিল, “কথা ঘোরাচ্ছিস! আজকাল কী হচ্ছে তোর! যত্তসব আজেবাজে জায়গায় যাওয়া! আমাদের সঙ্গে ক্লাবে যাওয়ার বেলায় তো আগ্রহ দেখি না! কার মতো হয়েছিস তুই?”
রাধিয়া প্রায় বলে ফেলছিল কার মতো। কিন্তু তারপর সামলে নিয়েছিল নিজেকে। বলেছিল, “বাবা, ঠাকুমা আমায় কিছু বলে না। কিন্তু তুমি এমন করো কেন?”
মা তাকিয়েছিল রাধিয়ার দিকে। তারপর বলেছিল, “কারণ, আমি তোর মা বলে। তোর জন্য চিন্তা হয় না আমার!”
“কীসের চিন্তা মা!” রাধিয়া অবাক হয়েছিল।
“কীসের চিন্তা বুঝিস না! আগে মা হ, তারপর বুঝবি!” মায়ের চোখে জল এসে গিয়েছিল আচমকা।
“মা,” রাধিয়া এসে মায়ের হাতটা ধরেছিল, “কী যে করো না তুমি! এই রাগছ! এই কাঁদছ! কীভাবে এত মুড শিফট হয় তোমার? কোনও মানে আছে এর?”
“ছাড়!” মা হাতের উলটো পিঠ দিয়ে সাবধানে চোখের জলটা চেপে-চেপে মুছেছিল। রাধিয়া দেখেছিল মায়ের বড়, সুন্দর চোখদুটো ছলছল করছে। তবে যত্ন করে করা মেকআপ একটুও নষ্ট হয়নি।
মায়ের বয়স পঁয়তাল্লিশ পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনও দশ বছর কম মনে হয়। রাধিয়ার বান্ধবীরা বলে, “তোর মা বলে কিন্তু বিশ্বাসই হয় না!”
কথাটা ঠিক। কিন্তু বাবাকে সেই তুলনায় বুড়ো লাগে বেশ। যদিও বাবা-মায়ের বয়সের তেমন খুব একটা তফাত নেই।
মা বলে, “প্রথম থেকেই তোর বাবা অমন বুড়োটে। সারাক্ষণ খালি ব্যাবসা আর ব্যাবসা! বাড়ির বাইরে থাকতে পারলেই যেন বেঁচে যায়!”
রাধিয়ার হাসি পায়। মা এমন করে বলে যেন কত অনিচ্ছের সঙ্গে মা বিয়ে করেছিল বাবাকে!
“মা, কী কথা হচ্ছিল আর তুমি কোনদিকে নিয়ে গেলে কথাটা! এর কোনও মানে আছে? আমি যাবই সুম্পার জন্মদিনে… যাবই, ব্যস!” রাধিয়া রাগের গলায় বলেছিল এবার।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়েছিল রাধিয়ার দিকে। তারপর বলেছিল, “ঠিক আছে মধুদাকে নিয়ে যাবি। আর বেশি দেরি করবি না। আটটার মধ্যে বাড়ি ফিরবি। কেমন?”
মধুদা বাড়ির সবচেয়ে পুরনো ড্রাইভার। বাবার কথায় সবচেয়ে বিশ্বস্ত। তাই বাবা মধুদার ওপর ভার দিয়েছে রাধিয়াকে সব জায়গায় নিয়ে আসা, নিয়ে যাওয়া করার জন্য।
এই বাড়িতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর হয়ে গেল মধুদার। একরকম এই বাড়ির লোকের মতোই হয়ে গিয়েছে। গাড়ি চালানো ছাড়াও নানারকম কাজকর্ম করে দেয়। বিশেষ করে ঠাকুরমার সমস্ত কেনাকাটা মধুদাই করে।
বুজু এসে পড়েছিল এরপর। মা বলেছিল, “মধুদাকে ডেকে দে তো। আমি যাওয়ার আগে বলে যাব, রাধিয়াকে যেন ঠিক সময়ে ফিরিয়ে আনে। ওর কোনও কথা যেন না শোনে।”
“মধুদা?” বুজু সামান্য থমকেছিল। ঠোঁট চেটে কী যেন একটা বলবে বলে ইতস্তত করছিল।
“হ্যাঁ। নামটা প্রথম শুনলি?” মা বিরক্ত হয়েছিল এবার।
মায়ের মাথা একটু গরম। চট করে রেগে ওঠে। বুজু খুব ভাল করে জানে সেটা। তাই মায়ের রেগে ওঠায় বুজু আর-একটু থমকে গিয়েছিল।
“কী হল, বল।”
বুজু বলেছিল, “আসলে শুনলাম মধুদার বউয়ের শরীরটা ভাল নেই। আজ বিকেলে ডাক্তার দেখানোর কথা। আজ রাধির কলেজ নেই তো, তাই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছে। তাই… মানে…”
“তোকে আমায় মানে বোঝাতে বলেছি!” মা আচমকা চেঁচিয়ে উঠেছিল, “সবাই এখানে কাজ করতে এসেছে না অজুহাত দিতে এসেছে! ডাক মধুদাকে। আমি কথা বলছি।”
বুজু মাথা নিচু করে চলে গিয়েছিল।
“মা, আরে আমি বাচ্চা নাকি! ওলা ধরে চলে যাব। নো প্রবলেম। কেন মধুদাকে ডাকছ!”
মা তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর বলেছিল, “ডোন্ট ট্রাই টু টিচ মি। বাড়িটা আমায় চালাতে হয়। এদের আমায় সামলাতে হয়। মধুদা পুরনো লোক হতে পারে। কিন্তু চাকরি করে। একটা মাইনে পায়। তার এই সময়টা আমরা কিনেছি। বউকে নিয়ে ডাক্তার কবে দেখাবে সেটা ওর বলা উচিত ছিল। নিজের খুশিমতো এমনটা ও করতে পারে না। সেটা ওকে বলে দেওয়া দরকার।”
