কাজু হেসে ফেলল, “গত দু’সপ্তাহ আগেও তো তোর জন্মদিন ছিল! আজ আবার জন্মদিন! ভাল তো বেশ!”
নয়না ভুরু কুঁচকে বলল, “তাতে তোমার কী?” তারপর বিজনের দিকে কাচের বয়ামটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “কাকিমার হাতে দিয়ে আয় একছুটে। যা।”
বিজন বয়ামটা নিয়ে দৌড়ে গেল।
নয়না তাকাল কাজুর দিকে। কাজুর শিরদাঁড়া দিয়ে কেমন যেন এক ফোঁটা বিদ্যুৎ গড়িয়ে গেল। কাছে না এসেও একটা মেয়ে এমন করে শুধুমাত্র তাকিয়ে কাছে চলে আসতে পারে!
নয়না বলল, “তোমার জন্য আমার রোজ-রোজ জন্মদিন হতে পারে কাজুদা।”
“এসব কী বলছিস?” কাজু চোয়াল শক্ত করল। আজ মেয়েটা এমন খোলাখুলি বলছে কেন? এমন করে পুরো ব্যাপারটাকে আরও জটিল করে তুলছে কেন?
নয়না বলল, “কেন, কানে শুনতে পাচ্ছ না কী বলছি? এতদিন যা চুপচাপ বোঝাতে চেয়েছি, সেটা তো আর বোঝোনি! এবার তাই স্পষ্ট করে বলছি।”
“এমন বলিস না নয়না। তুই তো জানিস সবটা।”
“কী জানি আমি?” নয়না ফোঁস করে উঠল, “পেখম সুন্দরী, কিন্তু আমিও কি সুন্দরী নই! ও তোমার জন্য সব ছাড়তে পারবে ভেবেছ? ওর মাকে দেখেছ? লেডি হিটলার। তোমায় ঘেন্না করে। মায়ের বিরুদ্ধে যাবে ভেবেছ ও? কোনওদিন না। আর সেখানে আমি সব পারি তোমার জন্য। সব।”
কাজুর বুকের ভেতর কষ্ট হচ্ছে। এসব কেন বলছে নয়না? সুন্দর ব্যাপারটাকে কেন এমন নষ্ট করে দিচ্ছে? ও কি জানে না যে, পেখম ছাড়া আর কেউ কাজুর মনে থাকতে পারে না! পেখম ছাড়া ওর জীবন শূন্য! তা হলে এসব কেন বলছে?
কাজু অসহায়ভাবে তাকাল নয়নার দিকে। কী করে বোঝায় ও মেয়েটাকে!
নয়না বড়-বড় চোখগুলো স্থিরভাবে জ্বেলে রেখেছে কাজুর চোখের সামনে।
কাজু বলল, “প্লিজ় নয়না। এমন করিস না।”
“আমায় ‘তুমি’ করে বলো না কেন কাজুদা?” নয়না চোয়াল শক্ত করল, “আমি কি মেয়ে নই?”
“নয়না, নয়না… তোকে আমি কী করে বোঝাই…” কাজু মাথা নাড়ল।
নয়না বলল, “আমার দিদির সঙ্গে তো তোমার আলাপ আছে কাজুদা। আমার চেয়ে কত বছরের বড় জানো তো! পাঁচ বছরের। আমি যখন সাত বছরের ছিলাম, ওর একটা সুন্দর পুতুল ছিল। আমারও ওটা ভাল লাগত। কিন্তু ওটা আমায় ধরতে দিত না ও। জানো, আমি কী করেছিলাম? আমি…”
“শোন,” কাজু মাঝপথে থামিয়ে দিল নয়নাকে, বলল, “আমি কিন্তু পুতুল নই। মানুষ কিন্তু পুতুল নয়।”
হাসল নয়না। অবজ্ঞার হাসি। তারপর বলল, “এত পড়ে এই জানলে! কাজুদা, আমরা সবাই পুতুল। শুধু নিজেরা বুঝি না। একদিন তুমিও বুঝতে পারবে। একদিন ওই গল্পের শেষটা তোমায় শোনাব। কেমন?”
.
০৭. রাধিয়া
কেরদানি দেখানোটা যে বড্ড ভুল হয়ে গিয়েছে, সেটা এখন খুব বুঝতে পারছে রাধিয়া। মধুদাকে গাড়ি দিয়ে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়াটা যে কী ভীষণ ভুল হয়ে গিয়েছে! এখন কী করবে? চারিদিকে এখন চৈত্র-সেলের ভিড়। মানুষের মাথা মানুষে খাচ্ছে! তার মধ্যে কী করে খুঁজে পাবে ও কাঁকুলিয়া রোডের বাড়িটা? বাসন্তী দেবী কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে চারিদিকে ফুল স্টপের মতো ছড়ানো মানুষের মাথাগুলোর দিকে টেন্সড হয়ে তাকিয়ে রইল রাধিয়া।
মোবাইলটার কি এখনই বন্ধ হওয়ার ছিল! আর কপাল এমন যে, পাওয়ার ব্যাঙ্কটাও আনেনি সঙ্গে করে। কী করবে এখন ও! পলি, জয়তী, বুদা আর রাখি তো বলেইছিল ওদের সঙ্গে যেতে, কিন্তু কী যে মাথায় ভুত চাপল রাধিয়ার? নিজেকে চড়াতে ইচ্ছে করছে ওর! শুনেছে ফার্ন রোড দিয়ে ঢুকে কোথা দিয়ে যেন কাঁকুলিয়া রোড যাওয়া যায়। কিন্তু কোথা দিয়ে যাওয়া যায় সেটা ঠিক জানে না।
সুম্পার জন্মদিন আজ। ইউনিভার্সিটির বন্ধু সুম্পা। খুব ঘনিষ্ঠ কিছু নয়। তবে বন্ধু। তাই নেমন্তন্ন করছে। আগে তো আসেনি। তাই কীভাবে যাবে জানতে চাইলে সুম্পা বলেছিল, “তোকে বলে লাভ আছে? গড়িয়াহাট ক্রস করে বিজন সেতুর দিকে এগোলে দেখবি ফার্ন রোডের সিগনাল পড়বে। ওখানে এসে ফোন করবি আমায়। আমি তোদের মধুদাকে বলে দেব! নানা রাস্তায় ওয়ান ওয়ে থাকে। মধুদা বুঝতে পারবে।”
সবই ঠিক ছিল। কিন্তু আজ দিনটাই এমন যে, কী আর বলবে!
ইউনিভার্সিটি বন্ধ আজ। তাই কোথাও যাওয়ার ছিল না সকালে। মা তো বলেছিল এখানেও আসতে হবে না। কিন্তু মায়ের কথা শোনেনি রাধিয়া। মায়ের তো সবকিছুতেই আপত্তি। ওর ইউনিভার্সিটিতে আপত্তি। বন্ধুদের নিয়ে আপত্তি। ওর নিজেকে সাধারণভাবে রাখা নিয়ে আপত্তি। আর কত কিছু শুনবে!
তা ছাড়া আলিপুর থেকে বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছের কাঁকুলিয়া রোড কী আর এমন দূর!
মা তবু জেদ করেছিল। বলেছিল, “বাবা জানলে কিন্তু রাগ করবে! এমন করিস না রাধি।”
“কেন রাগ করবে?” রাধিয়া তর্ক ছাড়েনি, “সেই যে আমি লোকাল ট্রেনে করে সোনাঝুরি গেলাম, তাতে বাবা রাগ করল? তুমিই তো রাগ করছিলে! বাবা মোটেও রাগ করে না। তুমিই শুধু বাবার নামে মিথ্যে মিথ্যে রাগ করার কথা বলো!”
“আমি মিথ্যে বলি?” মা খুব রেগে গিয়েছিল, “আসুক তোর বাবা। আমি বলব তার মেয়ের গুণপনা! ইউনিভার্সিটিতে পড়ে এই শিখছে! তখনই বলেছিলাম ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দিতে। এখানে জংলিদের সঙ্গে থেকে থেকে সব ম্যানার্স নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আমাদের স্টেটাসের একটা ফ্যামিলিকে দেখা, যে এভাবে তোর মতো থাকে! তোর বাবা কী নিয়ে এত ব্যস্ত কে জানে যে, এইদিকে নজর দেয় না! মেয়েটা কি আমার একার!”
