সতু ডাকাবুকো ছেলে। ভয়ডর বলে কিছু নেই। ওই চা-বাগানের মতো জায়গায় মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে সংগঠন তৈরি করার কাজ রীতিমতো কঠিন আর ঝুঁকিপূর্ণ! তাও সতু নিজেই আগ বাড়িয়ে নিয়েছে কাজটা। কেন কে জানে সতুর মধ্যে একটা মারদাঙ্গা মনোভাব আছে। ও কথায়-কথায় বলে এভাবে ন্যাকা-ন্যাকা ভাবে কিছু হবে না। বাস্তিলের পতনও ন্যাকা ন্যাকা কথায় হয়নি, জারদের উৎখাত করাও ন্যাকা ন্যাকা কথায় হয়নি। সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া নাকি এই পচে যাওয়া, নর্দমার মতো পৃথিবীটার মুক্তির উপায় নেই। চারিদিকে পাঁক জমে সবটাই নাকি স্তব্ধ আর নিস্পন্দ হয়ে গিয়েছে। একে খুঁচিয়ে দূর না করতে পারলে হবে না!
হিংসার পথ ভাল লাগে না কাজুর। মানুষ মারতে হবে সমাজ বাঁচাতে গেলে! মানুষ ছাড়া সমাজ হয় নাকি? খারাপ লোকদের প্রান্তিক মানুষে পরিণত করতে হবে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে। মানুষের মনে সুচিন্তার বীজ বুনতে হবে শিক্ষার মাধ্যমে। তা হলে মানুষ নিজেই আবর্জনাদের সরিয়ে দেবে, গুরুত্বহীন করে দেবে। তার জন্য রক্তারক্তি করার কোনও দরকার পড়বে না।
সতু প্রাণের বন্ধু কাজুর। কিন্তু এই একটা ব্যাপারে দু’জনের মতের মিল হয় না। তবে সতু সেটা নিয়ে কখনও মাথাগরম করে না। বরং বলে, “তুই বুঝবি একদিন। আমার কথার গুরুত্ব বুঝবি। তুই যা বলছিস সেটা থিয়োরি! আসল ক্ষেত্রে কিন্তু এমন সহজ নয় ব্যাপারটা। মানুষকে নিয়ে কাজ। তাদের ইচ্ছে, লোভ, সেয়ানাগিরি, ধান্দাবাজি, ভয়, ইনসিকিয়রিটি, কপটতা, বোকামো এগুলোকে কনসিডার করতে হবে না? এই ফ্যাক্টরগুলোই থিয়রি আর প্র্যাকটিক্যাল পৃথিবীর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়! তবে এটা জানবি, মানুষ কিন্তু তৈরি হচ্ছে তলায়-তলায়। বিপ্লবের দিন ঘনিয়ে আসছে ভাই!”
“কাজুদা,” পিছন থেকে পরিচিত গলার ডাক পেয়ে থমকে গেল কাজু। গলাটা বিজনের। চোদ্দো-পনেরো বছরের ছেলে। কিন্তু এখনই পার্টির কাজে ঢুকে পড়েছে! এটা ভাল লাগে না কাজুর। আগে একটু লেখাপড়া করুক, তারপর না হয় ঢুকবে! কিন্তু বিমলদা সেটা মানে না। বলে, “আরে, নতুন অবস্থাতেই ধরতে হবে। ওদের বোঝাতে হবে আসল ব্যাপারটা কী! এই বয়সে ডেডিকেশান, মরালিটি, ফোর্সফুলনেস বেশি থাকে। করাপ্ট হওয়ার আগেই ওদের বোঝাতে হবে জীবনটা আসলে কী! দেশ ও দশের উন্নতি কীসে হবে!”
ফোর্সফুলনেস জিনিসটা কী, কাজু জানে না। বিমলদার কথার পিঠে কী বলবে বুঝতেও পারে না। বিমলদা কারও কথা শোনার মানুষই নয়! তবে ব্যক্তিগতভাবে বিজনকে সময় পেলেই বোঝায় কাজু। বলে লেখাপড়াটা মন দিয়ে করতে। এসবের জন্য তো সারা জীবন পড়ে রয়েছে! কাজু বোঝে বিজন খুব ভালবাসে ওকে। লোকজন আড়ালে বিজনকে ওর চামচা বলেও ডাকে। কিন্তু সেসব ও পাত্তা দেয় না! বড় বাড়ির ছেলে বিজন। টাকাপয়সার অভাব নেই। কিন্তু এই উঠতি বয়সেও কত সাধারণভাবে থাকে। এসব ছেলে নিজের জন্য আসেনি পৃথিবীতে, কাজু বোঝে। তাই ও চায় আরও পড়ুক ছেলেটা। আরও জানুক। বাকিদের শক্ত মাটিতে তুলতে হলে আগে নিজেকে শক্ত মাটিতে দাঁড় করাক।
কাজু পেছন ফিরল। আর সঙ্গে-সঙ্গে থমকে গেল একটু। বিজনের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে নয়না। চোয়াল শক্ত করল কাজু। মেয়েটা আজও এসেছে! আজকাল ওর আসা যেন বেড়ে গিয়েছে খুব! কথাটা ঘুরিয়ে ও একবার বলেছিল পেখমকে। পেখম পাত্তা দেয়নি। বলেছিল, “ও পাগলি। তা ছাড়া আমায় তো মা যেতে দেয় না তোমার কাছে। লুকিয়ে দেখা করি কী কষ্ট করে জানোই তো! ওই তো তোমার খবর এনে দেয় আমায়। ও আমার সবচেয়ে ভাল বান্ধবী। আসলে বোনই বলতে পারো।”
পেখমের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কাজু! এত বিশ্বাস আর ভালবাসা অন্যের জন্য যার থাকে সে মানুষটা যে কতটা ভাল, কতটা এই পৃথিবীর জন্য প্রয়োজনীয়, সেটা পেখম নিজেই জানে না। নয়না যে সহজ মন নিয়ে আসে না কাজুর কাছে সেটা কিছুতেই স্পষ্টভাবে পেখমকে বলতে পারে না কাজু। ও জানে কিছুতেই কাজুর এই কথাটা বিশ্বাস করবে না পেখম।
কাজু থমকাল একটু। তারপর পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল ওদের দিকে। শাড়ির ওপর একটা পঞ্চো পরে রয়েছে নয়না। টানটান করে বাঁধা চুল। কপালের একপাশে চাঁদের আকারের ছোট্ট একটা কাটা দাগ। ধারালো ছুরির মতো মুখ নয়নার। চিনেমাটির প্লেটের মতো চকচকে মুখের চামড়া। খাঁজ কাটা ওপরের ঠোঁটে চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাস!
কাজু সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, নয়নার হাতে একটা কাচের বয়াম।
“তোমার জ্বর কি বাড়ল কাজুদা?” বিজন ছটফটে গলায় জিজ্ঞেস করল।
কাজু বলল, “ওই আর কী। তা তোরা?”
বিজন কিছু বলার আগেই নয়না বলল, “তোমার জ্বর হয়েছে আমায় বিজন বলল। আমায় তো খবর পাঠাতে পারতে একটা!”
কাজু বলল, “এটা কোনও বলার মতো খবর! সোনাঝুরিতে কত লোকের জ্বর হয়, তোকে সবটা সবাই জানাবে?”
নয়নার চোখের দৃষ্টি কড়া হল। ও রাগের গলায় বলল, “সবাই আর তুমি এক? এই বোঝো? আর বাবার কাছে যাওনি কেন?”
কাজু ঢোঁক গিলল সামান্য। নয়নাকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। ও বলল, “তোর হাতে কী?”
নয়নার মুখটা সামান্য নরম হল যেন। ও গম্ভীর গলায় বলল, “আমার আজ জন্মদিন। তাই এতে বাড়িতে তৈরি পিঠে আছে। তোমার জন্য মা পাঠাল।”
