গোপেন শাসমল এই অঞ্চলের এমএলএ। তা ছাড়া এই জুটমিলটার ব্যাপার-স্যাপারগুলো গোপেনদাই দেখে। যদিও কাজুদের বিরোধী পার্টির লোক গোপেন, কিন্তু কাজুকে বিশেষ স্নেহ করে। মতবিরোধ থাকলেও কাজুর কথার গুরুত্ব দেয়!
“সেই জন্যই তো তোকে বলছি কাজু!” যাদবকাকা দু’হাত দিয়ে ধরল কাজুর হাত। বলল, “তুই একবার বল দাদাকে। আমরা ওর দুশমন তো! আমাদের মিলের ইউনিয়ন ওরা এখনও দখল করতে পারেনি। তাই খুন্নস আছে লোকটার। তুই একবার ওকে বল। তোকে তো অন্যভাবে দেখে। জানিস তো মালিকদের সঙ্গে ওর দহরম-মহরম খুব। ওরা ইউনিয়নে ক্ষমতায় না থাকলেও মালিক ওর কথা ফেলবে না।”
কাজু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর হাতটা ছাড়িয়ে নিল। যাদবকাকার হাতটা খরখরে বালি-কাগজের মতো। মুখটা তেতো লাগছে। মাথাটাও ব্যথা করছে বেশ। নদীর দিক থেকে আসা হাওয়ায় শীতটা যেন শিরদাঁড়াতেও অনুভব করতে পারছে। শরীরখারাপের মধ্যে আর এইসব ভাল লাগছে না। কিন্তু ও জানে ভাল না লাগলেও এটা ওকে করতে হবে। যেভাবেই হোক করতে হবে। অনেক মানুষের ন্যায্য পাওনা জড়িয়ে আছে এতে! মরালিটির প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। আসলে টাকা এসে গেলেই ও দেখেছে মরালিটিগুলো কেমন যেন পেছনের দিকে চলে যায়, ভিড়ে হারিয়ে যায়। মানুষ মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলে এই রুপোর ঝনৎকারের সামনে! তাই ভাল না লাগলেও এই নিয়ে গোপেনের সঙ্গে কথা বলতে হবে ওকে। আজ না হলেও দু’-এক দিনের মধ্যেই বলতে হবে। কাজু জানে এতে হয়তো সোনাঝুরিতে ওদের পার্টির মাথা বিমলদা রাগ করবে, কিন্তু বিমলদা এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারবে না। মালিকপক্ষের সঙ্গে বিমলদার সম্পর্কটা আদায়-কাঁচকলায়। যাদবকাকা ঠিকই বলেছে, গোপেনদার দল এখনও ইউনিয়নের দখল নিতে না পারলেও গোপেনদার সঙ্গে মালিকের খাতির খুব! তাই ও জানে, কিছু করতে পারলে গোপেনই পারবে। কাজু বোঝে সব বিষয়ে মাথা গরম করলে হয় না। কিছু জিনিস বুদ্ধি করেও বের করতে হয়।
“আরে, তুই শুনছিস কি?” যাদবকাকা বলল, “জানি, তোর কষ্ট হচ্ছে শরীর খারাপ নিয়ে এসব শুনতে। কিন্তু আজই এই নিয়ে একদফা ঝামেলা হয়ে গিয়েছে। তু জরা দেখ কাজু। ঝামেলা হতে পারে বড়। যদি মাল ইন্সপেকশনে আটকে যায়, বা সেখানে বেরিয়ে গেলেও ডেলিভারির পরে যদি বেশির ভাগ মাল ফেঁসে যায়, তা হলে পার্টি শেষ টোয়েন্টি পারসেন্ট টাকা আটকে দেবে! মালিকরা তো লাভ বের করে নিয়েছে! কিন্তু ওই আটকে যাওয়া টাকার ছুতোয় আমাদের মাইনে আটকে যাবে। বিশাল অসুবিধে হয়ে যাবে। বাবু তু জরা দেখ।”
কাজু তাকাল সামনের দিকে। আলো নরম হয়ে এসেছে। হাওয়ার ভেতরের শীতটাও বাড়ল যেন। ও যাদবকাকার মুখের দিকে তাকাল। লোকটাকে কেমন ভাঙাচোরা লাগছে আজকে। সারাদিন কাজের পর এখন এইসব নিয়ে ভাবছে। না নিজের জন্য শুধু নয়, সকলের জন্য। মালিকের ছেলেটি গন্ডগোলের। সবাই জানে। মালিক নিজেও জানে, কিন্তু কেউ কিছু বলে না!
গায়ের চাদরটা ভাল করে আবার জড়িয়ে নিল কাজু। তারপর ধীর গলায় বলল, “আমি দেখব যাদবকাকা। তুমি চিন্তা কোরো না। লক আউট করব বললেই তো করা যায় না। আমি কথা বলব গোপেনকাকার সঙ্গে। আজ সন্ধেবেলা যাব মজুমদার-ডাক্তারের কাছে। ফেরার পথে গোপেনকাকার বাড়ি হয়ে আসব। দেখি, কী বলেন কাকা। কেমন?”
যাদবকাকা উঠল। পকেট থেকে খয়েরি রঙের একটা রুমাল বের করে মুখটা মুছল। তারপর হাসল, “আরে, সুস্থ হয়ে যা আগে। পহলে বুখার তো উতর যায়ে! তারপর দেখিস। আজ যেতে হবে না।”
কাজু নিজেও উঠল। ঘরে যাবে। আর বসবে না। সন্ধে হয়ে যাবে একটু পরে। মশা আসতে শুরু করেছে। এখনই কয়েকটা কানের কাছে পিনপিন করছে। যাদবকাকার মাথার উপর মুকুটের মতো ঘন হয়ে এসেছে কয়েকটা। ও দেখল যাদবকাকা বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছে।
বাড়ির চারটে ব্লকের সাউথ ব্লকে থাকে যাদবকাকা। তিন তলায়। আর নর্থ ব্লকের দোতলায় থাকে কাজুরা। তবে এটাকে যদি থাকা বলে!
আগেকার দিনের বাড়ি। কড়িবরগা দেওয়া সিলিং উঁচু হলেও ঘরগুলো খুব একটা বড় নয়। ইয়া মোটা মোটা দেওয়াল। তবে ড্যাম্প ধরা। ঘরে ঢোকার দরজাগুলো বেশ ছোট। ঘরে কুলুঙ্গি আছে দুটো। ইলেকট্রিকের কানেকশান আছে। তবে মরা মানুষের চোখের মতো টিমটিম করে বাল্ব। একটা ডিসি পাখা ওই সিলিং থেকে লম্বা রড দিয়ে ঝুলে থাকে। চৌকো বাক্সের মতো রেগুলেটরের খটখটে সুইচ দিয়ে তাকে যতই তাড়া লাগাও না কেন, সে কিছুতেই তার গদাইলশকরি চাল ছেড়ে এগোয় না। এখন শীত তাই রক্ষে। গরমকালে, রাতে এত জনের সঙ্গে এই ঘরটায় শোওয়া খুব কঠিন হয়ে যায়। কাচের ভাঙা স্কাইলাইটটাও সব গরম হাওয়া বের করতে পারে না। বইয়ে পড়া গ্যাস চেম্বারের কথা মনে পড়ে কাজুর। তাই সেই গরমের রাতগুলোর বেশির ভাগ সময়টা ও চিলেকোঠার ওই আধাখেঁচড়া ঘরটায় ঘুমোয়।
জ্বরটা আছে। গায়ে-হাত-পায়ে বেশ ব্যথাও রয়েছে। বিশেষ করে ঘাড়টা বেশ ব্যথা। সাড়ে ছ’টার আগে মজুমদার-ডাক্তার বসে না। কাজু ভাবল, সতু থাকলে সাইকেল করে নিয়ে যেত। কিন্তু ব্যাটা সেই যে নর্থ বেঙ্গল গিয়েছে তো গিয়েছেই! পার্টির কাজেই গিয়েছে। কবে আসবে কে জানে!
দু’বার চিঠি লিখেছিল কাজু। উত্তর পায়নি। বিমলদা বলেছে, ওখানে লোকজনকে একত্রিত করতে উদয়াস্ত খাটতে হচ্ছে সতুকে। তাই সময় পাচ্ছে না।
