“মাই ফুট, কবিতা পড়ে! তা হলে তোদের কফি হাউসে গিয়ে বনের মোষ তাড়াক! এখানে ওরকম ম্যাদামারা চেম্বার খোলার কী আছে!” আন্টি তার বড় শরীরটা নিয়ে কোনওক্রমে সোজা হল। ইজ়ি চেয়ারটাও প্রাণপণে ক্যাঁচকোচ শব্দ করে প্রতিবাদ জানাতে চাইল। কিন্তু আন্টি পাত্তা দিল না একটুও। বরং বলল, “দ্যাট ম্যান ইজ় নাথিং। বলে আমায় সিগারেট ছেড়ে দিতে। না হলে শ্বাসের কষ্ট কমবে না। তবে তোর ওষুধ খাব কেন রে মর্কট! সিগারেট ছাড়লে তো এমনিই ভাল থাকব। তোর ওষুধে জোর নেই তাই ছাড়তে বলিস। ওটার কাছে যাবি না কাজু!”
কাজু বলল, “কিন্তু আমার তো কমে!”
“মোটেই কমে না!” আন্টি এবার কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল, “ওটা প্লাসিবো এফেক্ট। মিছরির দানায় অ্যালকোহল ঢেলে রোগ কমাচ্ছে! তুই স্বপনডাক্তারের কাছে যা।’
আন্টি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে টলমল পায়ে কিছুটা বেসামাল হল। কাজু উঠে গিয়ে ধরল চট করে। আন্টি নিজেকে সামলাল। তারপর কাজুর হাতটা ধরে তাপ মাপল। কপালেও হাত চেপে দেখল কতটা গরম। তারপর বলল, “এ কী রে! জ্বর তো আছে! এই ঠান্ডা হাওয়ায় বসে কী করছিস? যা ঘরে যা।”
“আমি ঠিক আছি,” কাজু হাসল, “তুমি আস্তে আস্তে যাও। দোতলায় উঠতে পারবে, না আমি ধরব?”
আন্টি পাত্তা না দিয়ে তাকাল যাদবকাকার দিকে। তারপর বলল, “আর তুমি আবার পার্টি-পলিটিক্স খুলে বোসো না। ওকে রেস্ট নিতে দাও।”
যাদবকাকা হাসল। আন্টি বিরক্ত হয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল মূল বাড়ির দিকে।
কাজু আবার বসল বাঁধানো রকটায়। আজ কিচ্ছু ভাল লাগছে না। পেখমকে পড়াতে যাওয়াও নেই। ওরা থাকবে না। কলকাতায় যাবে সবাই মিলে। প্রথম-প্রথম ও গুটিয়ে থাকত, কিন্তু এখন পেখমকে না দেখলে মনখারাপ করে ওর। কেমন সব আবছা লাগে! বুকের ভেতরে যে কষ্টের একটা ছোট্ট চোরাকুঠুরি থাকে, প্রেমে না পড়লে বোধহয় মানুষ জানতে পারে না! কাজু ভাবে কুঠুরিটা থাকলেও কষ্ট, আবার না থাকলেও শূন্যতা। ভাবে, মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী। যা মনে করলে কষ্ট হয়, তাই সে বারবার মনে করে। গলায় কাঁটা ফুটলে যেমন বারবার ঢোঁক গিলতে চায়, ঠিক তেমন। কষ্টের তলায় কি সত্যি পূর্ণতার ফল্গুনদী বয়? কষ্ট পাওয়াটাকে কি আমরা সত্যি মহান কিছু হিসেবে দেখি? আমরা কি কষ্টের আগুনে পুড়ে নিজের ভিতরের খাদগুলো গলিয়ে ফেলতে চাই? বিশুদ্ধ মানুষ হওয়ার প্রচেষ্টা কি সকলের মনের অবচেতনে কাজ করে?
পেখমকে না দেখলে আজকাল কেমন একটা ভয়ও যেন গ্রাস করে ওকে। কাকিমা, মানে পেখমের মা ওকে পছন্দ করে না। প্রথম দিন থেকেই সেটা ও বোঝে। যদিও কাকু খুব ভাল মানুষ। পুলিশে চাকরি করেন বলে বাড়িতে বিশেষ থাকেন না। আর পেখমের ঠাকুরদা তো খুবই ভাল! এই মানুষটার জন্যই যে ও পেখমের কাছে যেতে পারছে, সেটা পেখমের থেকেই জেনেছে কাজু! কিন্তু ওই বাড়িতে ঢুকলেই ও বোঝে কোথায় যেন দুটো চোখ ওকে সারাক্ষণ লক্ষ রাখছে! খুব অস্বস্তি লাগে! তাই যতক্ষণ থাকে মাথা নিচু করে থাকে। নিজের মতো পড়িয়ে চলে আসে।
তবে পেখমের সঙ্গে ওর দেখা হয় সোনাঝুরির কোনও না-কোনও লুকোনো ভাঁজে। তাও সামান্য সময়ের জন্য। আর প্রতিদিন দেখা করে ফেরার পরে মনের ভিতর তৈরি হওয়া কুয়োটা যেন আরও গভীর হয়ে পড়ে! যেন কুয়োর ভিতর থেকে অতৃপ্ত আত্মারা সব দু’হাত তুলে জল প্রার্থনা করে! প্রতিদিন পেখমের কাছ থেকে সরে আসার সময় শরীরের আর মনের ভিতর কী যেন ছিঁড়ে পড়ে যায়! যন্ত্রণায় ছটফট করে কাজু! ভাবে, কবে পেখমকে সারা জীবনের মতো করে পাবে ও!
“সচমে বুখার ইতনা হ্যায়?” যাদবকাকা সামনে এসে কপালে হাত দিল এবার। তারপর বসে পড়ল পাশে, “আসলে তোর সঙ্গে কিছু কথা ছিল কাজু।”
কাজু সরে বসল একটু। যাদবকাকা সোজা মিল থেকে আসছে। শরীর থেকে ঝাঁজালো ঘামের নোনতা গন্ধের সঙ্গে খইনির গন্ধও আসছে। খারাপ গন্ধ সহ্য করতে পারে না কাজু। আর এখন তো শরীর খারাপ, তাই আরও গা গুলোচ্ছে!
যাদবকাকা এসব ভ্রূক্ষেপ করল না। বরং আরও ঝুঁকে পড়ে বলল, “তুই খবর জানিস?”
“কী?” কাজু যতটা সম্ভব কম শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল।
যাদবকাকা বলল, “রাশিয়া থেকে বিরাট অর্ডার পেয়েছি আমরা। প্রায় চল্লিশ লক্ষ টাকার অর্ডার। বুঝলি? কিন্তু সেখানে ইন্সপেকশন ক্লজ় আছে। লেট সাপ্লাইয়ের জন্য পেনাল্টি ক্লজ় আছে। অর্ডার পাওয়ার পর ম্যানেজমেন্ট আমাদের সঙ্গে কথা বলেছিল। বলেছিল ঠিক সময়ের মধ্যে আমরা যদি মাল ডেলিভারি করে দিতে পারি ফাইভ পারসেন্ট করে ইনটেনসিভ দেবে।”
কাজু বলল, “ইনসেনটিভ!”
“ও একহি বাত হ্যায়,” কথাটাকে মাছির মতো হাত নেড়ে সরাল যাদবকাকা, “কিন্তু প্রোডাকশন ঝাড় খেয়েছে। মালিকের ছেলে দু’নম্বরি পাট দিয়ে বেশ কিছু মাল তৈরি করতে বলেছিল। সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ফেঁসে! এখন মালিক বলছে আমাদের নাকি দোষ! বলছে পার্টি যদি টাকা কাটে, তবে আমাদের থেকে মালিকও কেটে নেবে। তার যুক্তি হল, লাভ হলে যদি ফাইভ পারসেন্ট বেশি টাকা আমরা নেব বলে মেনে নিই, তবে লোকসান হলেও তার দায়ের একটা অংশ আমাদের বইতে হবে। ব্যাটা মানছেই না যে, যা হয়েছে ওর লালচি ছেলের জন্য হয়েছে!”
কাজু শুনল চুপ করে। তারপর বলল, “গোপেনদা জানে?”
