খুব একটা ভিড় হয় না মজুমদার-ডাক্তারের কাছে। কাজু যাতায়াতের পথে দেখে, মানুষটা একমনে বই পড়ছেন। কবিতার বই!
নয়না এই মজুমদার-ডাক্তারের মেয়ে। বাবার মতো মোটেই শান্তশিষ্ট নয়। বরং খুব দস্যি। নয়নাকে ভয় লাগে কাজুর। পেখমের প্রাণের বন্ধু নয়না। তাই পেখমকে বলতে পারে না যে, নয়না ওর দিকে অন্যভাবে তাকায়। একা দেখা হলেই অদ্ভুত সব কথা বলে। কথা বলতে-বলতে হাত ছোঁয়! হাসে। কাছে এগিয়ে আসে। ভয় লাগে কাজুর। খুব ভয় লাগে। পেখম যদি জানতে পারে! যদি ভুল বোঝে! পেখম ওর কাছ থেকে সরে গেলে ওর যে কী হবে!
নদী থেকে আসা হাওয়ায় শিরশির করে উঠল কাজুর শরীর। আস্তে আস্তে জুটমিল থেকে লোকজন বেরোচ্ছে। সাইকেল বাড়ছে সোনাঝুরির রাস্তায়। এই বড় বাড়িটার সামনের গেট ছুঁয়ে চটকলে যাওয়ার রাস্তা।
কাজু মাঝে মাঝে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে। বিশাল পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়ি। চারটে বড়-বড় ব্লক। আসলে বাড়িটা বহু পুরনো। তখন মাত্র একটা ব্লক ছিল। সে সময় এখানে পর্তুগিজ সারেংরা থাকত। তাদের কাছ থেকেই পরে ব্রিটিশরা এই জায়গা কেনে। জুটমিল বানায়। বাড়িটার একটা ব্লক থেকে চারটে ব্লক করে। তারপর থাকতে শুরু করে। পরে বিশের দশকে ব্রিটিশদের কাছ থেকে এই মিল, এই বাড়ি আর আশপাশের জায়গা কিনে নেয় মালিক গ্রুপ। তারপর থেকে তারাই এর অধিকর্তা।
প্রায় দেড়শো বছর বয়স বাড়িটার। এখন গাদাগাদি করে অনেকে থাকে। জুটমিলের বহু হিন্দিভাষী মানুষ থাকে এই বাড়িতে। আরও নানা মানুষজন থাকে। কাজুরাও অনেকে থাকে দুটো ঘর নিয়ে। সবাই মিলে হাঁসফাঁস করে দুটো কামরায়! তাই ছাদের ওপর প্রায় ভেঙে যাওয়া একটা ঘরে কাজু বেশির ভাগ সময় কাটায়। এমনকী, গরমকালে তো সেখানে ঘুমিয়েও পড়ে রাতে।
চারটে বাড়িই তিনতলা। কিন্তু পুরনো দিনের বাড়ি বলে সেটাকে ছ’তলা মনে হয়। ছাদটাও গড়ের মাঠের মতো। তবে সন্ধের পর বিশেষ কেউ যায় না। আর ওই চিলেকোঠায় তো কেউ যায়ই না।
কিন্তু আজ শরীর ভাল নেই, তাই ছাদে আর ওঠেনি কাজু। বরং এই বড় উঠোনটায় এসে বসেছে। আর দেখছে বিকেল কেমন শামুকের মতো এগিয়ে চলেছে আরও গাঢ় বিকেল ছুঁয়ে সন্ধের গুহায়!
কাজু দেখল, ওদের ওই বড় গেট পেরিয়েই মানুষজন আসছে ভেতরে।
“কা বাবুয়া, বুখার আভি উতরা নহি?” যাদবকাকা সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দাঁড়াল।
সত্যনারায়ণ যাদব ছাপরার মানুষ। চটকলে ফোরম্যানের কাজ করে। ইউনিয়নের নেতাও। ওদের পার্টিরই লোক। প্রৌঢ় মানুষটি বড় ভালবাসে কাজুকে।
কাজু বলল, “না, কমেনি। যাব সন্ধেবেলা মজুমদার-ডাক্তারের কাছে!”
“ও দ্যাট ওল্ড হ্যাগ!” পাশের ইজ়িচেয়ার থেকে সিগারেটে বড় টান দিয়ে কথাগুলো বলল আন্টি বাডু।
যাদবকাকা ঠোঁট টিপে হেসে কাজুর দিকে চোখের ইশারা করল। কাজুও হাসল মুখ টিপে।
কাজুরা ক্যাথলিক খ্রিস্টান। তবে বাবার দিকে থেকে ওরা বাঙালি হলেও ওর মা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। মায়ের দিকে আর কেউ বেঁচে নেই শুধু এই আন্টি ছাড়া। কাজুর মাকে ছোট থেকে এই আন্টিই মানুষ করেছিল নিজের কাছে রেখে। তাই এখন এই বৃদ্ধ বয়সে আন্টি থাকে ওদের কাছে। আসলে কোথাও যাওয়ার নেই মহিলার!
আন্টির মনটা ভাল হলেও মুখ খুব খড়খড়ে। কাজু এই নিয়ে কিছু বললেই বলে, “হবই তো রাফ! কোন সময় পার করে এসেছি জানিস? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোরা পল্টনদের ক্লাবে ওয়েট্রেস ছিলাম। যদি না মুখ চালাতাম তবে আমায় এখানে দেখতে পেতিস না! কোনও অন্ধকার গলিতে পচে-গলে মরতে হত! মুখের জোর ছিল বলে ওই ছ’বছর বয়সের বনি, মানে তোর মাকে নিয়ে বাঁচতে পেরেছি! অন্ধকার আর তোরা কী দেখলি!”
আন্টির বয়স এখন প্রায় পঁয়ষট্টি। সারাদিন খুটখুট করে সংসারের কাজে মাকে সাহায্য করে আর মাঝে মাঝে বিকেলে এই ইজ়ি চেয়ারটায় বসে সিগারেট খায়! ওদের মফস্সলে মেয়েরা সিগারেট খায় না। তাই নতুন মানুষজন এখনও আন্টিকে ওইভাবে আধশোয়া হয়ে সিগারেট খেতে দেখলে দাঁড়িয়ে পড়ে। ফিসফাস করে। হাওয়ায় ওড়া কথা কানে আসে কাজুর। শোনে, আন্টি নাকি অন্য ধরনের মহিলা!
গোটা ব্যাপারটায় হাসি পেলেও সমাজের মানুষজনের মানসিক অন্ধকারটা বোঝে কাজু! ওদের এই বাড়িতেই কয়েকটা ঘরে রাতের বেলায় অশান্তি হয়। রেল লাইনের পাশের ঝুপড়ি থেকে বাংলা মদ খেয়ে এসে হল্লা করে কেউ! কেউ আবার নিজের স্ত্রীকে পেটায়, অকথ্য গালিগালাজ করে! সেসব নিয়ে কিন্তু কারও মাথাব্যথা নেই! সবাই যে যার ঘরের খিল আটকে থাকে। কাজু কয়েকবার বলতে গিয়েছে বটে এই নিয়ে, কিন্তু বাবা-মা এখন কাজুকে যেতেও দেয় না! বাবা বলে, “তোর ওপর জগতের ভার নেই। সব সমস্যা মেটাতে তুই আসিসনি। তুই মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ার নোস যে, ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ বলে বেরিয়ে পড়বি। চেপে বসে থাক।”
নিজের ঘরে বসে কাজুর একটা অসহায় রাগ হয়। মনে হয় কিছুই কি করার নেই ওর? কিছুই কি করতে পারে না?
আন্টি হাতের সিগারেটটা মাটিতে নিবিয়ে টোকা মেরে পাশের একটা জঞ্জাল রাখার জায়গায় ছুড়ে দিয়ে বলল, “তুই কেন যাবি ওই জোচ্চোরটার কাছে! ও ডাক্তার?”
কাজু হাসল, “আন্টি, তুমি এমন বলো কেন? কত ভাল লোক জানো? কবিতা পড়ে!”
