মানুষটা এবার গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এল। নোঈ আজ যেন ভাল করে দেখল মানুষটাকে। গম-রঙা মানুষটার দোহারা চেহারা। পাঁচ ফুট দশ-এগারো ইঞ্চির মতো উচ্চতা। সামান্য ঢেউ খেলানো চুল, গোঁফ। চোখে সরু ফ্রেমের চশমা। মুখে হাসি থাকলেও কোথাও যেন একটা বিষণ্ণতাও আছে। ওই ডাক্তার পাত্রের সঙ্গে ওকে দেখতে এসেছিল এই মানুষটা। কিন্তু সেদিন ভাল করে তাকায়নি নোঈ। বিরক্তিতে সেদিন ভাল করে মুখই তোলেনি ও। সেদিন সবকিছু আর সকলকে অসহ্য লাগছিল। নিজেকে পথের উপর উপুড় করে বিক্রি করা সবজির মতো মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সকলে চোখ দিয়ে টিপে-টুপে ওজন করে দেখছে ও কতটা চলতে পারে। ওকে নিজেদের সংসারে নিলে লাভ হবে না ক্ষতি। কী ভীষণ অপমানজনক আর বর্বর এই প্রথা! আমাদের দেশে যৌনতা নিয়ে এত ছুঁতমার্গ, কিন্তু আসলে গভীরভাবে ভেবে দেখলে দেখা যাবে, আমাদের নানা রিচুয়াল আর সামাজিক আচার আসলে কোথায় যেন একটা জাতির অবদমিত যৌনতাকেই বড্ড বেশি করে ফুটিয়ে তোলে।
আজ কিন্তু মানুষটাকে দেখে নোঈর অস্বস্তি হলেও তার তলায় কোথায় একটা ভালও লাগছে। কেউ-কেউ থাকে যাদের দেখলে পাহাড়ের কথা মনে পড়ে। সূর্যাস্তের সময় পাহাড়ের নীল রঙের মধ্যে জেগে থাকা নির্জনতার কথা মনে পড়ে। এই মানুষটাকে দেখেও সেটাই মনে হচ্ছে নোঈর। মনে হচ্ছে, এই ভিড়ে হিজিবিজি হওয়া এক্সাইড মোড়েও মানুষটা কেমন যেন একলা, কেমন যেন নির্জন! নোঈর খারাপ লাগল এই ভেবে যে, এই মানুষটার সঙ্গে ওর এমন একটা পরিস্থিতিতে দেখা হল!
“এত লজ্জা পাওয়ার কী আছে?” আইকা হি হি করে হাসল এবার।
“কী করছিস! উনি হয়তো এমব্যারাসড হচ্ছেন!”
মানুষটার গলাটা হালকা, নরম। নোঈ মুখ তুলে তাকাল। আর আবার কয়েক লক্ষ মাইল দূরের কিছুর টানে পৃথিবী নড়ে উঠল যেন। কী হচ্ছে এসব! নোঈ ধমক দিল নিজেকে।
আইকা বলল, “কেন, তোর ভাইয়ের সঙ্গেই তো বিয়ে হবে ওর, বললে লজ্জা কী!”
মানুষটা হাসল সামান্য। তারপর আইকাকে বলল, “আচ্ছা, তুই থাম,” তারপর নোঈর দিকে তাকিয়ে আলতো গলায় বলল, “সেদিন ভাল করে আলাপ হয়নি। তাই হয়তো আপনি আমার নামটা মিস করে গিয়েছেন। আমার নাম…”
নোঈ মুখ তুলল। দূরের মহাজাগতিক বস্তুটি নড়ছে। তরঙ্গ ভেসে আসছে শূন্যতা ভেদ করে। এ হতে পারে না। এমন অবিবেচক হতে পারে না নোঈ। প্রত্যেকটা শুরুর আগে একটা শুরু থাকে। যেমন থাকে, প্রত্যেকটা শেষের পরে আর-একটা শেষ। তাই সেই শুরুর আগের শুরুটা হতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই। নোঈ এতটা বোকা, সেন্টিমেন্টাল হতে পারে না। হতে পারে না আর সেইসব কিছু, যেগুলোকে ও নিজেই সারা জীবন হেয় করে এসেছে, ছোট করে এসেছে! ওই কম্পনকে ও সামলে দেবে রূঢ়তা দিয়ে। ভরিয়ে দেবে নিষ্ক্রিয় কিছু শব্দ দিয়ে।
মানুষটার কথা শেষ হওয়ার আগেই নোঈ তাই ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি জানি। মনে আছে। আর আমি নোঈ, অ্যাজ় ইউ নো। আর শুনুন, দি জানে না। শি ইজ় মিসইন্টারপ্রেটিং মাই সাইলেন্স। অ্যাকচুয়ালি অল অফ দেম আর! কিন্তু আপনি ভুল কিছু ভেবে নেবেন না। আমি আপনার ভাইকে বিয়ে করছি না। বুঝলেন মিস্টার পুশকিন চক্রবর্তী?”
.
০৬.কাজু
গাছ থেকে পাতাটা ঘুরে-ঘুরে পড়ছে! নদীর দিক থেকে আসা হাওয়া পাতাটাকে আলতো করে ধরে নামিয়ে আনছে মাটির দিকে। বিকেলের রোদ নরম হয়ে আসছে এবার। শীতের ছোট বেলা গুটিয়ে নিচ্ছে পৃথিবী। মনখারাপ রঙের একটা আলো ধীরে-ধীরে নেমে আসছে সোনাঝুরির বুকে! আর কিছু পরেই চটকলে ভোঁ পড়বে। গঙ্গার পাড়ে নৌকোর আনাগোনা বেড়ে যাবে। জলে মেটে সিঁদুর গুলে দিয়ে সূর্য ধীরে-ধীরে তলিয়ে যাবে পাতালে!
এমন সময়টা বুকের ভেতর কেমন যেন করে কাজুর। মনে হয়, কত কিছু যে করার ছিল, কিন্তু কিছুই করা হল না। মনে হয়, হাজার বছর কেটে গিয়েছে, ও এখানেই এমন পাথরের মতো বসে রয়েছে। কত কবিতা লেখা বাকি রইল। কত দেশ দেখা বাকি রইল। কত মানুষের পাশে দাঁড়ানো বাকি রইল। কত কী বাকি রয়ে গেল। ওর বয়স ছাব্বিশ। বন্ধুরা বলে সারা জীবনটা পড়ে রয়েছে সামনে। কিন্তু কাজু জানে পড়ে নেই, সময় নেই ওর হাতে। কেন কে জানে ছোট থেকেই ওর কেবলই মনে হয় ওর সময় কম! যা করতে হবে, তাড়াতাড়ি করতে হবে। যা লিখতে হবে, তাড়াতাড়ি লিখতে হবে। যেখানে-যেখানে যেতে হবে, তাড়াতাড়ি যেতে হবে। মনে হয় ওর জীবনও ওই শীতের ঝরে পড়া পাতার মতো। হাওয়ায় ভেসে ধীরে-ধীরে মাটির বুকে নেমে আসছে। একবার ভূমি স্পর্শ করলেই সব স্তব্ধ হয়ে যাবে। তাই এই ভেসে থাকার সময়টুকুই হাতে রয়েছে ওর। যা কিছু করার করে নিতে হবে এই সময়টার মধ্যেই।
ভাল করে গায়ের চাদরটা জড়িয়ে নিয়ে বসল কাজু। গত রাত থেকে জ্বর এসেছে। ভেবেছিল ওষুধ না খেলেও কমে যাবে। কিন্তু কমছে না। বাবা বলেছে স্বপনডাক্তারকে যেন সন্ধেবেলা গিয়ে দেখিয়ে নেয়।
ডাক্তার দেখাতে বিরক্ত লাগে কাজুর। ওই স্বপন ডাক্তারকে দেখালেই একটা কাচের কর্ক আঁটা বোতলে লাল মিক্সচার দেয়। বোতলের গায়ে আবার কাগজের খাঁজকাঁটা দাগ দেওয়া। এক চামচ পেটে পড়লে মনে হয় ঊর্ধ্বতন দশ পুরুষের মুখ তেতো হয়ে গেল! কাজুর বিরক্ত লাগে।
তার চেয়ে মজুমদার-ডাক্তার ভাল। রোগা-পাতলা। প্রায় বুকের কাছে প্যান্ট পরে। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। একটা নড়বড়ে টেবিলে রাখা হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স, নরম আলোর হারিকেন আর মান্ধাতার আমলের চেয়ারে নিজে বসেন মানুষটা। পাশেই একটা লম্বা বেঞ্চ। রোগী এসে বসে সেখানে।
