রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে মেট্রোর সিঁড়িতে পা দিল নোঈ। কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারল না।
“নোঈ,” পেছন থেকে আসা ডাকটা থমকে দিল ওকে। ও পেছনে ঘুরল। দি!
নোঈ দাঁড়িয়ে পড়ে এক ধাপ নেমে এল সিঁড়ি থেকে। তারপর পথ না আটকে রাস্তার একপাশে সরে গিয়ে বলল, “দি তুই? এখানে?”
আইকা কপালে এসে পড়া চুলটা ঠিক করে নিয়ে বলল, “বাড়ি যাচ্ছিস?”
“হ্যাঁ,” নোঈ মাথা নাড়ল।
“চল আমার সঙ্গে,” আইকা নোঈর হাত ধরে টান মেরে ওকে রাস্তায় নামিয়ে আনল।
“আরে, আমি বাড়ি যাব। অফিস থেকে আসছি। নিড আ শাওয়ার দি। তুই কি গাড়ি এনেছিস?”
“না, গাড়ি আনিনি আজ। আর আমিও বাড়ি যাব। চল না!” আইকা হাত ধরে টানল, “এই ক্লাবে এসেছিলাম দু’মিনিটের জন্য। একজনকে একটা জিনিস দেওয়ার ছিল। ওই পারে গাড়িতে আমার বন্ধু বসে আছে। ও পৌঁছে দেবে। চল।”
নোঈ ভুরু কোঁচকাল। আইকার বন্ধু তো ও যাবে কেন তার গাড়িতে? চেনে না জানে না! কেন যাবে? বোকা বোকা ব্যাপার!
ও বলল, “না, আমি মেট্রোতেই যাব।”
“আচ্ছা ঢ্যাঁটা মেয়ে!” আইকা কপট রাগে চোখ পাকাল, “হাত ধরে টানছি, এবার না গেলে কান ধরে টানব তোকে। চল। পাকামো সব সময়!”
“তুই যে কী করিস না!” নোঈ হাসল, “ঠিক আছে চল। এইটুকু পথ তাও আবার গাড়িতে!”
আইকা কথার উত্তর না দিয়ে রাস্তার গাড়ির জটের মধ্যে দিয়ে লুকোচুরি খেলতে-খেলতে নোঈকে নিয়ে পথ পার হয়ে গেল।
রাস্তার এই পারটায় যেন আরও ভিড়। মেট্রো স্টেশনের আড়ালে খাবারের দোকান আছে এদিকে। মানুষ তার উপর যেভাবে ভেঙে পড়েছে, নোঈ ভাবল কলকাতায় কি এতদিন দুর্ভিক্ষ চলছিল?
এই পাশের ফুটপাথ আর রাস্তাটা মোড়ের কাছে বেশ অপরিষ্কার! খাবারের অবশিষ্ট, রোলের ছেঁড়া কাগজ, পচা ফল, পানের পিক! নোংরা দেখলে গা গুলিয়ে ওঠে নোঈর। ও দেখল আইকা অম্লানবদনে সেই সব টপকে মানুষের ভিড়ের ভিতর দিয়ে তরতর করে এগিয়ে গেল।
এই পারে এসেই নোঈর হাত ছেড়ে দিয়েছিল আইকা। তাই নোঈ পিছিয়ে পড়ল একটু। তারপর সময় নিয়ে নোংরা বাঁচিয়ে এগিয়ে গেল গাঢ় নীল রঙের একটা গাড়ির সামনে দাঁড়ানো আইকার দিকে।
“এত পুতুপুতু কেন তোর?” আইকা ভুরু কোঁচকাল, “এই শহরে বড় হয়েছিস না?”
নোঈ কিছু না বলে হাসল। আসলে সব কিছুর তো উত্তর হয় না! তবে অবাক লাগল দেখে যে, আইকা এমন উচ্ছ্বসিত! সাধারণত আইকা একটু গম্ভীর ধরনের মেয়ে। সে এমন স্কুলের মেয়েদের মতো তড়বড় করছে দেখে, কেমন একটা লাগল নোঈর! কিন্তু কিছু বলল না। আইকাকে ভাল লাগে ওর। খুব ভাল লাগে এমনটা নয়, কিন্তু ভালই লাগে। আসলে আইকার জীবনটা খুব-একটা আনন্দের নয়। তাই ভাল লাগার চেয়ে একটা চাপা সহানুভুতি কাজ করে নোঈর। মনে হয়, মেয়েটা দুঃখী! আর দুঃখী মানুষদের জন্য কোথায় যেন একটা খারাপ-লাগা কাজ করে ওর।
“কী রে! কী ভাবছিস? আজকাল কী হয়েছে তোর? এখন তুই শিয়োর প্রেমে পড়েছিস কারও, না?” আইকা হাসল।
“ধুৎ!” খানিকটা জোর করেই পালটা হেসে উত্তর দিল নোঈ।
মানুষজনের এই ধরনের ইয়ারকিগুলো খুব বোকা বোকা লাগে নোঈর। সামান্য অন্যমনস্ক লাগলেই হয় বলে, কী রে কবিতা লিখবি! নয়তো এই, প্রেমে পড়েছিস! এত স্টিরিয়টাইপ! মানুষ যেন এমনি অন্যমনস্ক হতে পারে না! যেন তার আনমনা হতে এমনি এমনি ইচ্ছে করতে নেই!
“শোন না,” আইকা হাত ধরল ওর, “একটা সারপ্রাইজ় দেব তোকে।”
“আমায়!” নোঈ অবাক হল। তবে সত্যি বলতে কী একটুও আগ্রহ বোধ করল না। আজ চাকরি ছেড়ে এসেছে। অশান্তি হয়েছে অফিসে। ওদিকে বাড়িতেও মায়ের সঙ্গে ঝামেলা চলছে! এখন কি আর ওর এই সব সারপ্রাইজ় দেখে আনন্দে ডগমগ হওয়ার সময় আছে!
“আয়।”
আইকা হাত ধরে ওকে আবার টেনে এনে দাঁড় করাল ওই গাড়িটার পাশে। নোঈ দেখল নীল গাড়িটার কাচটা টিন্টেড। আইকা হাত ঘুরিয়ে গাড়িটার কাচটা নামানোর ইঙ্গিত করল।
সামান্য সময় নিল গাড়ির ভিতরে বসা মানুষটা। তারপর মসৃণভাবে নেমে এল গাড়ির কাচ। শহরের মাথা থেকে প্রায় বিদায় নেওয়া শেষবেলার আলো তার আবছা রং নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল গাড়ির গায়ে, তার ভিতরে। নোঈ দেখল মানুষটাকে। আর খুব সামান্য সময়ের জন্য হলেও মনে হল, ওর পায়ের তলার মাটি একটু কাঁপল!
আবার কি ভূমিকম্প হল? না মনের ভুল! নোঈ একবার তাকিয়েই কেন জানে না চোখটা সরিয়ে নিল মানুষটার দিক থেকে। বুকের ভিতর কেমন একটা অস্বস্তি হল ওর। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এই আইকার সারপ্রাইজ়? ও যত এইসব এড়াতে চাইছে, তত কেন জীবন এমন সব ঘটনা ও মানুষ এনে সামনে রাখছে ওর! মায়ের সঙ্গে যে জন্য বিবাদ হচ্ছে সেই কারণটাই ওর সামনে! কেন বারবার ঈশ্বর ওকে এমন বিপদে ফেলেন? এমন সংকটের সামনে এনে দাঁড় করান?
“কী রে, খুব চমকে গিয়েছিস, না?” আইকা হাসল, “তোর উড বি হাজ়ব্যান্ডের দাদা। চিনতে পারছিস?”
উড বি হাজ়ব্যান্ড! কথাটা কট করে কানে লাগল নোঈর। এসব কী বলছে আইকা! উড বি হাজ়ব্যান্ড মানে? ও তো সেই ডাক্তার ছেলেটিকে বিয়েই করবে না। তবে! এসব কী বলছে আইকা!
“আঃ দি! কী সব বলছিস তুই!” নোঈ দাঁত চেপে বলল কথাগুলো, “কার বিয়ে? কে উড বি হাজ়ব্যান্ড?”
“তোর রে। ন্যাকা খুকি আমার!” আইকা হইহই করে হেসে গাড়ির ভিতরে বসে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখলি, কেমন লজ্জা পাচ্ছে! এখনও বিয়ে হয়নি, তাতেই এত লজ্জা! গাছে না উঠতেই এক কাঁদি!”
