নোঈ কোন কোল্ডড্রিঙ্কটা চায়, সেটা বলল।
দোকানে আরও দু’-তিনজন দাঁড়িয়ে ছিল। তারা ঘুরে তাকাল নোঈর দিকে। নোঈ পাত্তা দিল না। ও জানে রাস্তায় বেরোলে লোকজন দ্যাখে ওকে। কেন দ্যাখে সেটাও জানে। শ্বেতা বলে, “তোকে যা দেখতে ইজ়ি সিনেমায় চান্স পেতে পারিস। এমন মাখনের মতো গায়ের রং ভগবান যদি আমায় দিত! কী চাকরি-বাকরি করে জীবনটা নষ্ট করছিস! ববিকে বলব? ওর ফিল্ম লাইনে যোগাযোগ আছে।”
কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতলটা নিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল নোঈ! দুশো এমএল-এর ছোট্ট বোতল। তবে খুব ঠান্ডা। দু’হাত দিয়ে বোতলটা প্রাণপণে চেপে তার সমস্ত শীতলতা নিজের শরীর আর মনের মধ্যে শুষে নেওয়ার চেষ্টা করল নোঈ!
খালি বোতলটা নিয়ে এগিয়ে গেল নোঈ। নতুন মেয়েটা হাত বাড়িয়ে নিল বোতলটা। বলল, “দশ রুপায়া।”
নোঈ ব্যাগটা খুলে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট এগিয়ে দিল।
“ছুট্টা নেহি হ্যায়,” মেয়েটা বিরক্ত হল একটু।
“আমার কাছেও নেই,” নোঈ সহজ গলায় বলল।
“আরে, দশ টাকার জিনিস নিয়ে কেউ পঞ্চাশ টাকা দেয়!” মেয়েটার ভাঙা বাংলায় এবার আরও বেশি ঝাঁজ!
“আরে, নেই আমার কাছে!” নোঈও বিরক্ত হল সামান্য।
“ওই তো আমি দেখতে পাচ্ছি,” মেয়েটা গলা বাড়িয়ে হাত দিয়ে নোঈর ব্যাগটা দেখাল, “ওই তো দশটাকার একটা নোট! ঝুট কাহে বোল রহি হো?”
“মানে?” নোঈর মাথাটা আচমকা গরম হয়ে গেল, “লাগবে না ব্যালেন্স।”
নোঈ আর কথা না বলে হাঁটা দিল। আশপাশের লোকজন তাকাচ্ছে। সবাই অবাক। পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে বাকি টাকা ফেরত নিচ্ছে না!
নোঈর মাথা ঝাঁঝাঁ করছে! মেয়েটা বলে, ও মিথ্যেবাদী! এত লোকের সামনে!
“দিদিজি, দিদিজি, সুনিয়ে পিলিজ, দিদিজি…” বয়স্ক মানুষটি কোনওমতে এসে নোঈর পাশে দাঁড়ালেন। নোঈ তাকাল ওঁর দিকে।
“পিলিজ দিদিজি, গুসসা না হোইয়ে। ছোটি লড়কি। বুঝতে পারেনি! আমি দিচ্ছি আপনাকে চেঞ্জ। পিলিজ মাফ কর দিজিয়ে!” বয়স্ক মানুষটি আন্তরিকভাবে বললেন কথাগুলো।
নোঈ দাঁড়িয়ে পড়ল। মানুষটির মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়াল একটু। মাথা নাড়ল অল্প। তারপর বলল, “সরি।”
“নেহি দিদিজি। আপ সরি না বোলিয়ে,” বয়স্ক মানুষটি এবার হাফশার্টের বুকপকেট থেকে দুটো কুড়ি টাকার নোট বের করে এগিয়ে দিলেন নোঈর দিকে। তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেহাতি ভাষায় কিছু একটা বললেন।
নোঈ দেখল মেয়েটা চোয়াল শক্ত করে ওই ভাষাতেই কী একটা উত্তর দিল।
আশপাশের লোকজন আরও একটু ঘিরে এসেছে যেন। যথেষ্ট হয়েছে। নোঈ ভাবল এবার ওর এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া উচিত। আর সত্যি বলতে কী মেয়েটা তো ভুল কিছু বলেনি! সত্যি তো ওর ব্যাগে একটা দশ টাকার নোট আছে। কিন্তু সেটা তো খরচ করা যায় না! হতে পারে নোটটা দশ টাকার। কিন্তু এর মূল্য তো আর দশ টাকা নয়! এই নোটটা অমূল্য। কারণ জয় ওকে দিয়েছিল এটা। জয় মানে জয়ব্রত ঘোষাল। সেই থার্ড ইয়ারে, হাজরা মোড়ে। সেই পান-কোল্ড ড্রিঙ্কের দোকানের সামনে। শীতের এক সন্ধেবেলা। নোঈ বলেছিল, কোল্ড ড্রিঙ্ক খাবে। শীতে কোল্ড ড্রিঙ্ক! জয় বিরক্ত হয়েছিল বেশ! তারপর পকেট থেকে এই দশ টাকার নোটটা বের করে দিয়ে বলেছিল, “এটা দিয়ে কিনে নে। আমার টাইম নেই। আমি আসি।”
জয়ের চলে যাওয়া চুপচাপ ছলছলে চোখে দেখেছিল নোঈ। ও কোল্ড ড্রিঙ্ক খায়নি সেদিন। শুধু নোটটা মুঠো করে ধরে ভিড় ফুটপাথে একা দাঁড়িয়ে ছিল! সেই থেকে এটা ওর কাছে থাকে সারাক্ষণ। আর আজ কী করে এই নোটটা দিয়ে দেবে নোঈ! জয়ের এটুকুই যে শুধু রয়ে গিয়েছে ওর কাছে!
নোঈ বলল, “দেখুন, আমায় যেতে হবে। থ্যাঙ্ক ইউ।”
বয়স্ক লোকটি বললেন, “ওকে ক্ষমা করে দেবেন, দিদিজি!”
নোঈ মাথা নেড়ে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। মেয়েটার জন্য এবার একটু খারাপ লাগছে ওর। আসলে এটাই হয় নোঈর। রাগের পর কেমন একটা খারাপ লাগা আসে। আসলে মেয়েটার তো দোষ নেই! ও তো ঠিকই দেখেছে নোটটা! কিন্তু এটা তো কোনওদিন দিতে পারবে না ও। কাউকেই দিতে পারবে না।
আচমকা জয়ের মুখটা ভেসে উঠল সামনে। রোগা, ফরসা, চাপদাড়ি আর চশমা। চশমার আড়ালে একজোড়া বাদামি রঙের চোখ। নোঈর দেখলে মনে হত, ওই চোখের ভেতরে কিছু একটা আছে, না হলে কেন এমন ওলট-পালট হয়ে যেত ওর মনটা! শুধুই ওলট-পালট হয়ে যেত! সবটাই কি অতীত এখন? ওই চোখটা মনে পড়লে কি এখনও কিছু হয় না? ভরা কলকাতাটা কি এখনও আচমকা শূন্য হয়ে যায় না?
নোঈ দীর্ঘশ্বাস চেপে ভাবল, না আর অতটা শূন্য হয়ে যায় না। জয়ের ওই শেষ কথাগুলো শোনার পর আর কিছু হয়ে যায় না। আসলে একটা-একটা করে ইট গেঁথে তুলে জয়ের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে এসেছে নোঈ। যে-কষ্ট আর মানসিক অত্যাচার জয় ওকে করেছে, সেটাতে আর ফিরে যেতে পারবে না ও। তার চেয়ে এমন হয়ে থাকাই ভাল।
রবীন্দ্রসদন মেট্রোয় ঢোকার মুখটায় খুব ভিড়। বিকেল শেষ হচ্ছে, কিন্তু নোঈ লক্ষ করেছে, বিকেল শেষ হওয়ার পর থেকেই কলকাতা যেন নতুন করে জেগে ওঠে। অফিস বা কলেজ ফেরতা মানুষের মধ্যে সুন্দর করে সাজগোজ করে ঘুরতে বেরোনো মানুষও মিশে থাকে। এই শহরে আবহাওয়া আজকাল আর বোঝা যায় না। শুধু যুবক-যুবতীদের পোশাকটাই বলে দেয়, কী ঋতু ফিসফিস করছে বাতাসে!
