“কী হয়েছে রে? একদম ছেড়েই দিলি? সত্যি?” শ্বেতা মাথা নাড়ল।
“আরে, আমার স্প্রেড শিটগুলো শেফালিদি ট্যাম্পার করে বসের কাছে সাবমিট করছিল। বারবার করছিল। আজ আমি আর শেফালিদিকে কিছু না বলে সোজা বসকে গিয়ে সাবমিট করেছি আমার কাজগুলো। ব্যস, শেফালিদি কী রেগে গেল! যা খুশি বলতে শুরু করল। ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাচ্ছি নাকি আমি! আমি নাকি অন্য কিছু চাই! আরও কীসব ইঙ্গিত করল। আই জাস্ট ফ্লিপড। ছেড়ে দিয়েছি। দু’মাসের নোটিশ দিতে হয়। দিয়ে এসেছি। বলেছি টাকাপয়সা যেন আমার অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেয়। আমি আর যাচ্ছি না ওই নরকে!”
শ্বেতা মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “ঠিক আছে, আর মাথাগরম করিস না। তুই এত ভাল লেখাপড়ায়। ঠিক অন্য চাকরি পেয়ে যাবি আবার।”
নোঈ মাথা নাড়ল, “অপমানটা ভুলতে পারছি না। অসভ্যতা আমি পছন্দ করি না জানিস তো! শেফালিদির নাকি নিজের কোন এক ক্যান্ডিডেট আছে। ঠিক আছে, এখন তাকে ঢোকাক আমার জায়গায়। আমার অত টাকার দরকার নেই। সব সহ্য করে পড়ে থাকা আমার দ্বারা হবে না।”
শ্বেতা ঘড়ি দেখল। মুখে-চোখে স্পষ্ট যে, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
নোঈ বলল, “তোর রিহার্সাল আছে না? তুই তা হলে আয়।”
“কিন্তু তুই এমন করে একা… মানে তোকে এভাবে আমি একা ছেড়ে যাই কী করে?”
“তো কী হয়েছে? আমি এখন বাড়ি যাব। নিড আ শাওয়ার,” নোঈ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
শ্বেতা চট করে ঘড়ি দেখল আবার। তারপর বলল, “ঠিক বলছিস তো? কোনও প্রবলেম নেই তো?”
নোঈ হাসল। অনেকক্ষণ পর হাসল। নিজেরই অবাক লাগল নোঈর। তারপর বলল, “কোনও প্রবলেম নেই। তুই আয়। আমিও যাব।”
শ্বেতা বলল, “কাল তোদের বাড়ি যাব। আর-একটা কথা তোকে বলা হয়নি। আমি কয়েকমাসের জন্য একটা স্কলারশিপ পেয়ে চণ্ডীগড় চলে যাচ্ছি!”
“তাই?” নোঈ অবাক হল।
“হ্যাঁ। আজ এসেছে চিঠিটা। তবে এখন আর এই নিয়ে কিছু বলছি না। পরে ফোনে বলব। আমার দিনটা ভাল আজ। মনটা কী ভাল ছিল! কিন্তু এখন আমার কী খারাপ লাগছে! তোর দিনটা আজ এমন গেল!”
নোঈ জানে শ্বেতার সত্যি খারাপ লাগছে। খুব ভাল মেয়েটা। সত্যি ওর জন্য চিন্তা করে। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে, ওর মেজাজ খারাপ আছে বলে এখন শ্বেতাকে ওর জন্য বেবি সিটিং করতে হবে।
শ্বেতার সঙ্গে নোঈ নিজেও বেরোল নন্দন চত্বর থেকে। শ্বেতা কবে চণ্ডীগড় যাবে, কোথায় থাকবে, এই নিয়ে টুকটাক কথা হল কিছু। কিন্তু নোঈ বুঝল, ও এসব কথা বললেও মনের ভিতরটা ওর এমন হয়ে আছে যে, কিছুই আসলে ভাল লাগছে না। কোনও কথা ঠিক গাঁথছে না মনে। এই যে শ্বেতা ওর এত বান্ধবী, সে চলে যাবে শুনেও তেমন হেলদোল হচ্ছে না। কেন কে জানে! আচ্ছা, নোঈ কি বড্ড স্বার্থপর!
বড়রাস্তায় গিয়েই বাস পেয়ে গেল শ্বেতা। বাসে উঠে পিছনে ফিরে একবার হাত নাড়ল মেয়েটা। নোঈ হাসল একটু। তারপর বাসটা বেরিয়ে গেলে ও রাস্তা পার হয়ে নিল।
গলাটা আবার শুকিয়ে গিয়েছে। সঙ্গে জলের বোতল আছে নোঈর, কিন্তু কোল্ড ড্রিঙ্ক খেতে ইচ্ছে করছে ওর। মোড়ের কাছে ডান দিকে একটা দোকান আছে। শ্বেতার সঙ্গে মাঝে মাঝে ওখান থেকে কোল্ড ড্রিঙ্ক খায় নোঈ।
সামনে সামান্য ভিড়। তাদের কাটিয়ে বড় ক্লাবটার সামনে দিয়ে এগোল মোড়ের দিকে। কোল্ড ড্রিঙ্কটা খেয়ে রবীন্দ্রসদন থেকে মেট্রো ধরে নেবে। মার্চের শেষ এখন। গরম পড়েছে বেশ। কুর্তির ভেতর দিয়ে সরু ঘামের রেখা শিরদাঁড়া দিয়ে নামছে। এক-এক ফোঁটা জল। নিঃসঙ্গ, বন্ধুহীন। ওর মতো!
দীর্ঘশ্বাস পড়ল নোঈর। আজ হঠাৎ নিজেকে খুব একা লাগছে ওর। মনে হচ্ছে আসলে ওর কেউ নেই। কেউ কোনওদিন ছিল না। এখন বাড়িতে ঢুকতেও ইচ্ছে করছে না। আবার রাস্তাতেও থাকতে ভাল লাগছে না। কী যে করে নোঈ! ও আকাশের দিকে তাকাল। সূর্য ডুবে গেলেও তার মনখারাপ করা একটা আলো লেগে রয়েছে মেঘে। যেন আলতা মোছা তুলো ছড়িয়ে আছে আকাশময়! কলকাতার আকাশটা এমন ধূসর কেন কে জানে! নীল রঙের আকাশ শেষ কবে কলকাতায় দেখেছে মনে করতে পারে না নোঈ!
মোড়ের কাছটায় ভিড় হয়ে আছে। লোকজন রাস্তা পার হবে বলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুটো উসকোখুসকো পাগল বসে রয়েছে দেওয়ালে পা ঝুলিয়ে। তার পাশে ভাজাভুজির দোকান আর একটা পান-কোল্ড ড্রিঙ্কসের দোকান। ফুটপাথটার যেন দমবন্ধ অবস্থা।
নোঈ মাঝে মাঝে ভাবে এই শহরে যে ওদের নানারকম ট্যাক্স দিতে হয় সেটার কতটা লাভ পায় ওরা! অর্ধেকের বেশি ফুটপাথে হয় হকার বসে রয়েছে নয়তো মানুষজন বসবাস করছে! গত পাঁচ-ছ’বছরে ফুটপাথে বসবাস করা মানুষের সংখ্যা যেন তিনগুণ বেড়ে গিয়েছে! স্টোভে, উনুনে বা ইট দিয়ে তৈরি উনুনে রান্না, রেলিং-এ মেলে রাখা জামাকাপড়, চাটাই পেতে শুয়ে পড়া, প্লাস্টিকের পুঁটলিতে জড়ো করে রাখা জামাকাপড়, ছড়িয়ে রাখা তরকারির খোসা, ভাতের ফ্যান, টলমল করে হাঁটা ছোট ছোট বাচ্চা, মদ খেয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকা মানুষ! এরা কারা? কোথা থেকে আসে? আগেই-বা ছিল কোথায়? এই নিয়ে আর বেশি ভাবতে চায় না নোঈ। মাথার ভিতরটা কেমন করে!
নোঈ সাইড-ব্যাগটাকে সামনে করে নিয়ে এসে দাঁড়াল দোকানটার সামনে। একজন বয়স্ক বিহারি মানুষ দোকানটা চালান। নোঈর মুখ চেনা। তার পাশে আজ একটা অল্পবয়সি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স্ক মানুষটাকে হাতে-হাতে সাহায্য করছে।
