নিশান মাথা নেড়ে এবার বলল, “আমি আসি। এলে পারতিস। ভাল লাগত তোর!”
নিশান চলে যাওয়ার পর ঘড়িটা আবার দেখল নোঈ। আধঘণ্টা হয়ে গেল। শ্বেতা কি আসবে না? তবে কি বাড়ি চলে যাবে? বাড়ি গিয়ে কী বলবে? কাল থেকে আর অফিস নেই! মা তো আরও চেপে ধরবে। বিয়ের জন্য পাগল করে দেবে। ও যে ডিনোকে বিয়ে করতে পারবে না, সেটা মা এখনও ছেলের বাড়িতে জানায়নি! মা আইকাদিদের বলেছে যে, সব মেয়েরাই নাকি ওরকম বলে। কিন্তু মা ঠিক নোঈকে কনভিন্স করে ছাড়বে!
কনভিন্স! কীসের কনভিন্স! এটা কি কেউ ধূপকাঠি বিক্রি করতে এসেছে নাকি? ছেলে জ্বলে অনেকক্ষণ বেশি! ছেলের গন্ধ ভাল! ধোঁয়া ডাইরেক্ট ভগবানের নাকে হিট করে! কনভিন্স! বোকার মতো কথা! নোঈর মাথাগরম কি সাধে হয়!
নোঈ কাজ করতে চায়। আজ কাজটা ছেড়ে এসেছে বটে, কিন্তু তার মানে তো আর ঘরে বসে থাকবে না। আবার কাজ খুঁজবে। সঙ্গে ব্যাঙ্কিং-এর পরীক্ষাও দেবে। কিছু একটা তো ঠিক হয়ে যাবে! কিন্তু কাজ ওকে করতেই হবে।
মনটা খারাপ হয়ে আছে। মাস চারেক হল চাকরিটা করছিল নোঈ। ভালই ছিল প্রথম মাস আড়াই। তারপর শেফালি বলে অ্যাকাউন্টসের হেড এমন পেছনে লাগতে শুরু করল! নোঈর তৈরি করা স্প্রেড শিটে নিজে ইচ্ছে করে ভুল ডেটা বসিয়ে বসের কাছে ঝাড় খাওয়াচ্ছিল। সেই সঙ্গে খারাপ ব্যবহার তো ছিলই! আর নিতে পারছিল না নোঈ। অফিস যাওয়ার নামে আতঙ্ক হয়ে যাচ্ছিল। রাতে ঘুমোতে পারছিল না। শুনছিল, শেফালিদির নিজের কোন এক ক্যান্ডিডেট রয়েছে, তাকে পুশ করার জন্য নোঈকে এমনভাবে হ্যারাস করছে মহিলাটি।
আর, আজ তো চরম জায়গায় পৌঁছেছিল ব্যাপারটা! সকলের সামনে এমন করে বলল শেফালিদি যে, আর নিতে পারেনি নোঈ। ও নাকি ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাচ্ছে! ওর নাকি অন্য মতলব আছে! কীভাবে কেউ এসব বলতে পারে! মানুষ এত নীচে নামতে পারে! কী মিন করেছে শেফালিদি?
“সরি, সরি নোঈ। অনেক লেট হয়ে গিয়েছে,” শ্বেতা হাঁপাতে-হাঁপাতে ওর পেছনের দিক থেকে এসে দাঁড়াল সামনে।
নোঈ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল শ্বেতার দিকে।
শ্বেতা বলল, “আরে, আমার দোষ নেই। মেট্রোয় আসছিলাম। রবীন্দ্র সরোবরে একজন সুইসাইড করেছে। তাই ট্রেন বন্ধ ছিল। এটা কি সত্যি রে যে, ওই স্টেশনে ভূত আছে?”
নোঈ বিরক্ত হয়ে বলল, “ববির সঙ্গে প্রেম করছিলি, না? তোকে কতবার বলেছি, ছেলেটা সুবিধের নয়! শুনবি না তো সেই কথা!”
“মাইরি বলছি,” শ্বেতা হাসল, “ওই জন্য লেট হয়নি। আমি সত্যি মেট্রোয় ছিলাম। তুই বিশ্বাস কর। আচ্ছা যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করিস সুইসাইড হয়েছে কি না। তবে হ্যাঁ, ববি সঙ্গে ছিল।”
নোঈ চোয়াল শক্ত করল। এই ছেলেটাকে ভাল লাগে না নোঈর। চোখ দুটো দেখলেই বোঝা যায়, সোজা পথের নয়। তা ছাড়া হোয়াটস অ্যাপে একদিন নোঈকে প্রোপোজ়ও করেছে। বলেছে, নোঈকে নাকি সারাক্ষণ চোখে হারায়! নোঈ সেদিন ভাল করে ঝেড়েছিল ওকে। শ্বেতা কত ভালবাসে ছেলেটাকে, আর সে কিনা ওকে প্রোপোজ় করছে!
পরে অবশ্য ববি বলেছিল, নেশা করেছিল বলে ভুলভাল বলেছে। আসলে ও কিছুই মিন করেনি। বেশি মদ খেয়ে ফেললে নাকি ও এমন ভুলভাল করে ফেলে।
তারপর থেকে দেখেছে, ওকে দেখলে ববি অদ্ভুতভাবে তাকায়। কিছু একটা বক্তব্য দৃষ্টি দিয়ে পাঠাতে চায়। গোটা ব্যাপারটায় মাথা খুব গরম হয়ে যায় নোঈর। মানুষ মানুষকে কী করে এমন ঠকাতে পারে! শ্বেতাকে যদি ববির পছন্দ না হয়, তবে কেন শুধু শুধু মেয়েটার সঙ্গে ঘোরে? এমনকী, ওদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক পর্যন্ত হয়ে গিয়েছে। শ্বেতা ববি ছাড়া আর কিছু বোঝে না। কিন্তু ববি শ্বেতা ছাড়া আর সব কিছু বুঝতে চায়।
ববির ওকে প্রোপোজ় করার ব্যাপারটা শ্বেতাকে বলেনি নোঈ। বললে শ্বেতার সঙ্গে ওর সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। কারণ, নোঈ নিশ্চিত ববি এর পরিবর্তে এমন কিছু শ্বেতাকে বলবে যে, পুরো ব্যাপারটাই পালটে যাবে। আর সত্যি বলতে কী, শ্বেতা ওর প্রিয়তম বন্ধু হলেও একটা সীমার পর ওর জীবনে আর ঢোকে না নোঈ। আসলে ছোট থেকেই নোঈ এটা বাবার কাছ থেকে শিখেছে। বাবার মতো এমন চুপচাপ মানুষ ও কোনওদিন দেখেনি! নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কখনও নোঈ দেখেনি মানুষটা অন্যের ব্যাপারে যেচে নাক গলিয়েছে বা কিছু বলেছে। বাবাকে দেখে নির্জন পাহাড়ি নদীর পাড়ের কাঠের বাড়ি মনে হয়! খুব ভাল লাগে ওর। মা তো সারা জীবন বুঝলই না বাবাকে। শুধু রাগ আর অভিমান করে গেল।
“কী রে, কী ভাবছিস?” শ্বেতা সামান্য ঠেলা দিল নোঈকে।
নোঈ বলল, “কিছু না।” তারপর ব্যাগ থেকে গীতবিতানটা বের করে দিয়ে বলল, “এই নে। এটা ধর।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, জানু!” শ্বেতা নোঈকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেল একটা।
নোঈ বলল, “থাক আর ন্যাকামো করতে হবে না। এতক্ষণ ওয়েট করালি বেকার! আমার এমনিতেই আজ মনটা ভাল নেই।”
“কী হয়েছে?” শ্বেতা এবার সিরিয়াস মুখ করে তাকাল।
নোঈ চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে মুখ মুছল একটু। তারপর সময় নিয়ে ধীরে-ধীরে বলল, “চাকরি ছেড়ে দিয়ে এসেছি।”
“সে কী রে? পাগল নাকি? এই তো কয়েক মাস হল জয়েন করলি!” শ্বেতা চোখ গোলগোল করে তাকাল ওর দিকে।
“পাগল কেন হব? আর সহ্য করা যাচ্ছিল না,” নোঈ চশমাটা পরে নিল আবার। বলল, “ওই অ্যাটমসফিয়ারে কাজ করা যায় না।”
