পাশ থেকে চশমা পরা শান্ত চোখের মানুষটা এবার প্রথম কথা বলেছিল। আলতো গলায় বলেছিল, “ওর ভাল নাম দীনবন্ধু।”
খুব হাসি পেয়ে গিয়েছিল নোঈর। তবে খুব জোর নিজেকে সামলে নিয়েছিল ও। নোঈর হাসি একবার শুরু হলে আর শেষ হতে চায় না।
বাবা বলেছিল, “কিন্তু এটা তো ভাল নাম। দীনবন্ধু মিত্রের লেখা ‘নীল দর্পণ’ পড়েছ?”
ডিনো আবার কায়দা করে বলেছিল, “ডাক্তারি করতে গেলে বাইরের বই খুব-একটা পড়া হয় না! প্লাস ঠাকুরদা নামটা রেখেছিল। খুব ওল্ড ফ্যাশন। আই ডোন্ট লাইক।”
বাবা সামান্য হেসে নরম গলায় বলেছিল, “বিদেশে থাকো। কিন্তু সেখানকার একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ? নাম নিয়ে ওদের অত নতুন-পুরনো বাতিক নেই। যেমন ধরো রিচার্ড নামটা। সেই পুরনো দিনের রাজার নাম। আবার এখনকার হলিউডের অভিনেতার নাম। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে, গৌরনাথ, ঢোলগোবিন্দ, কমলাকান্ত এমন ধারার নামগুলো সব উঠেই গিয়েছে প্রায়!”
ডিনো এর উত্তরে আবার কীসব হাবিজাবি বলছিল। আর নোঈ দেখছিল ওই চশমা পরা শান্ত চোখের মানুষটাকে। ভারী অদ্ভুত নাম মানুষটার। এই ডিনোর জেঠতুতো দাদা এমন, ভাবতেই কেমন যেন লাগছিল ওর।
মা তারপর খোঁচা দিয়েছিল নোঈকে। চাপা গলায় বলেছিল, “তুই কিছু জিজ্ঞেস করবি না?”
চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলেছিল নোঈ। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনার ডেভিড ফিঞ্চার ভাল লাগে? বা তোরনাতোরে?”
“সে কে?” ডিনো ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল নোঈর দিকে।
আবার পাশ থেকে উত্তর এসেছিল, “ভাই খুব-একটা ফিল্ম দেখে না।”
“আরে নোঈ, তুই এখানে?” আচমকা ডাকে চোখ খুলল নোঈ। সামান্য অবাক হল। সামনে নিশান দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফরসা রংটা যেন একটু পুড়ে গিয়েছে এই ক’দিনে। গালে দাড়িও রাখছে।
“তুই-ই বা এখানে কী করছিস নিশানদা?” নোঈ অবাক হল।
“আমাদের পত্রিকার তরফ থেকে জীবনানন্দ সভাঘরে একটা গল্পপাঠের আয়োজন করা হয়েছে আজ। সাড়ে ছ’টায় শুরু হবে। তাই এসেছি আমরা। ওই দেখতে পাচ্ছিস, প্ল্যাকার্ড আর হোর্ডিং পড়েছে,” নিশান বলল।
নোঈ বিরক্ত হয়ে বলল, “এই সবই কর। তোকে একদিন ফোন করেছিলাম। ধরলি না। তারপর একবার কল ব্যাকও করলি না! তুই কেমন যেন হয়ে গেছিস!”
“আরে, সরি সরি!” নিশান হেসে কান ধরল, “খুব ভুল হয়ে গিয়েছে রে! আসলে সেদিন কেয়াদির পাল্লায় পড়ে সব গুলিয়ে গিয়েছিল।”
কেয়াদি কে, সেটা জানে নোঈ। দেখেছে সোনাঝুরিতে। তবে খুব আলাপ নেই। ওই মুখ-চেনা টাইপ আর কী।
নোঈ আবার ঘড়ি দেখল। শ্বেতার মোবাইলটা কাল বাস থেকে চুরি হয়ে গিয়েছে। তাই ওকে যে ফোন করে তাড়া দেবে, তারও উপায় নেই। খুব বিরক্ত লাগছে নোঈর, কিন্তু কিছু করার নেই। আজ বাড়িতে গিয়ে মা যে কী বলবে, সেটাই দেখার। একে তো বিয়ে করবে না বলে গত পরশু ঘোষণা করার পর থেকে মা রেগে আগুন হয়ে আছে! তার ওপর আজ অফিসের ব্যাপারটা শুনলে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে, স্বয়ং ভগবানও জানেন না!
“তোর নাকি বিয়ে?” আচমকা প্রশ্নটা করল নিশান।
“কী?” সামান্য থতমত খেয়ে গেল নোঈ।
“আরে বিয়ে, বিয়ে। তোর। তাই?” নিশান হাসল, “ভাল ডাক্তার নাকি! বিয়ের পর আমেরিকায় চলে যাবি শুনলাম! সত্যি?”
নোঈর মুখটা নিমেষে লাল হয়ে গেল। শরীরের সমস্ত রক্ত যেন পাল্লা দিয়ে দৌড়ে মাথায় গিয়ে জমা হল। ও চোয়াল শক্ত করে তাকাল।
“যাঃ বাবা, খচে যাচ্ছিস কেন? মাসিমণি তো মাকে বলেছে। ছেলে নাকি বলেছে বছর পাঁচেকের মধ্যে প্লেন কিনবে? তাই?”
“সব তো জানিস, তাও আমার মাথা খাচ্ছিস কেন?” নোঈ এবার চিড়বিড় করে উঠল!
“বাপ রে! প্লেন কেন কিনবে বল তো? রাস্তায় গাড়ি চালাতে ভয় লাগে? আকাশ দিয়ে ফাঁকায় ফাঁকায় যাবে বলে?” নিশান খিকখিক করে হাসল।
“আমি বিয়েটা করছি না,” নোঈ কোনওমতে রাগটাকে গিলে বলল।
“সে কী? কেন?” নিশান চুপ করে গেল এবার।
নোঈ ঠোঁট টিপে মাথা নিচু করল।
“বাদ দে,” নিশান হেসে বলল, “এই বয়সে বিয়ে করবি কী! মাস্টার্স করেছিস। চাকরি করছিস। গ্রেট গোয়িং। আগে নিজের কেরিয়ার সেট কর।”
“কে কাকে বলে দ্যাখো!”
নোঈ দেখল নিশানের পেছনে কেয়াদি উঁকি দিচ্ছে!
কেয়াদি সামনে এসে বিরক্ত মুখে বললেন, “এই নিশান, তোকে তখন থেকে ফোন করছি, কী করছিস তুই?”
“আমায়? ফোন?” পকেট থেকে ফোনটা বের করে জিভ কাটল নিশান, “ওহো, সরি। সাইলেন্ট করা ছিল। কী হয়েছে?”
কেয়াদি বলল, “অনুষ্ঠান শুরু করার আগে কাজ থাকে না? এখানে গপালে হবে? চল।”
নিশান হাসল, “আসলে বোনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তো!”
কেয়াদি নোঈকে দেখল। হাসল সামান্য। কিন্তু নোঈ বুঝল সেটা নিছক ভদ্রতা।
কেয়াদি বলল, “চল নিশান। কোথা থেকে একটা গোঁয়ার-গোবিন্দকে ধরে এনেছিস! প্রতি পদে সবার সঙ্গে ঝগড়া করছে।”
“আরে মণীশ, একটু মাথাগরম ছেলে। ঠিক আছে চলো আসছি।”
“আয় তাড়াতাড়ি,” কেয়াদি দাঁড়াল না আর। আবার চলে গেল সভাঘরের দিকে।
নিশান হাসল নোঈর দিকে তাকিয়ে। তারপর বলল, “মাসিমণি ঝামেলা করছে? শোন, নিজের যা ভাল মনে হবে করবি! মাসিমণিরা অন্য জেনারেশন। আমাদের বুঝবে না। সিকিয়রিটির কনসেপ্টটা আমাদের কাছে যা, ওদের কাছে তা নয়। প্লাস ইগো তো আছেই!”
নোঈ কিছু বলল না। আসলে নোঈ চট করে নিজের কথা কাউকে বলতে পারে না। শ্বেতা ওর খুব ভাল বান্ধবী বলে তাও কিছুটা বলে। যদিও নিশান ওর মাসতুতো দাদা। ভাল ছেলে। কিন্তু সেই কানেকশনটা তো নেই। তাই ওকে আর কী বলবে! মা এমন করে যে, অপমান লাগে নোঈর। মেয়ের কষ্ট হতে পারে, খারাপ লাগতে পারে, সে নিয়ে মাথাব্যথা নেই! লোকে কী ভাববে! কে কী বলবে! কীসে আরও প্রেস্টিজ বাড়বে এই নিয়ে ভেবে সব সময় মাথা খারাপ করে!
