নোঈ ওর মাসতুতো বোন। ভবানীপুরে থাকে ওরা। পুটুমাসি আর রাঙামেসো খুব ভালমানুষ! নোঈও খুব ভাল মেয়ে। তবে আজকাল আর সেই ছোটবেলার মতো যোগাযোগটা নেই!
ফোনটা দেখলেও ধরল না নিশান। পরে কলব্যাক করে নেবে।
“আমায় মেয়েটি চিনবে কী করে?”
“আরে, আমি ওকে তোর ছবি মেসেজ করে দিয়েছি। তুই টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়াবি, ও চিনে নেবে,” কেয়াদি ঝরঝর করে একনিশ্বাসে বলে গেল কথাগুলো।
ওকে না জিজ্ঞেস করেই করে দিয়েছে! দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিশান। এই ভয়টাই করেছিল ও। কেয়াদি মানেই একটা না-একটা কাজের ফরমায়েশ!
ও বলল, “আচ্ছা, যাচ্ছি।”
“শোন, তোর ওই পার্টির লেকচার দিবি না মেয়েটাকে। ও ভাল মেয়ে। কত বড়লোক বুঝতে পারছিস?” কেয়াদি সাবধান করে দেওয়ার মতো গলায় বলল।
“ভাল মেয়ে মানে? আমরা কি খারাপ ছেলে?” নিশান ভুরু কোঁচকাল, “এমন মেয়ে, যার কাছে লোকাল ট্রেন চড়াটা অ্যাডভেঞ্চার, তাকে পার্টির কথা বলে আমি কেন বেকার আমার ব্যাটারি খরচ করব!”
“এইসব কথা বলবি না ওকে একদম। বুঝলি?” কেয়াদি সাবধান করে দিল, “ওর নাম রাধিয়া। রাধিয়া মালিক! মনে রাখবি নামটা। এখন যা।”
নিশান সাইকেলটা ঘুরিয়ে উঠে বসল তার ওপর।
কিন্তু প্যাডেল করার আগেই কেয়াদি সাইকেলের হ্যান্ডেলটা চেপে ধরে বলল, “‘লেলিন’ রোজ ওই তেলেভাজা-মুড়ি খায় নাকি? হুলোটা যা তেলে ভাজে, ওতে তো হাতিও মারা যাবে রোজ খেলে!”
নিশান থমকে গেল একটু। কেয়াদি তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। বড়-বড় চোখ স্থির।
নিশান বলল, “ম্যাক্সিমাম দিন। কেন?”
কেয়াদি আলতো করে ছেড়ে দিল সাইকেলের হ্যান্ডেলটা। তারপর বলল, “আত্মহত্যা করবে বলেছিল চল্লিশ বছর আগে। কিন্তু সেটা যে এভাবে রোজ চপ-মুড়ি খেয়ে করবে তা বুঝতে পারিনি তখন।”
০৫. নোঈ
খুব নিচু দিয়ে একটা এরোপ্লেন উড়ে গেল আর নোঈ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল তার কী বিশাল ছায়া পড়ল বাড়িটার গায়ে! ভাস্কর চক্রবর্তীর একটা কবিতার কথা মনে পড়ে গেল ওর!
নোঈ চশমাটা খুলে আলতো করে কপালের ঘাম মুছল। মার্চের শেষ এখন, কিন্তু মনে হচ্ছে ভরা বৈশাখ চলছে। কালবৈশাখী বলে একটা ব্যাপার ছিল ছোটবেলায়, কিন্তু আজকাল সেসব আর হয় না। কে জানে হয়তো অ্যানালগ সময়ের জিনিস বলে এই ডিজিটাল যুগে আর তার পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না!
ঘড়িটা দেখল একবার। সওয়া পাঁচটা বাজে। শ্বেতা বলেছিল পাঁচটায় চলে আসবে। কী যে করে না মেয়েটা! এমনিতেই আজ মেজাজটা গরম হয়ে আছে। তার ওপর যদি ও দেরি করে, তা হলে আর কত মাথা ঠিক রাখা যায়!
নন্দনের সামনের রেলিং-এ হেলান দিয়ে মাথাটা নিচু করে দাঁড়াল নোঈ। ক্লান্ত লাগছে। কারও সঙ্গে রুড ব্যবহার করতে খারাপ লাগে ওর। কাউকে অসম্মান করলে মনে হয় সেটা ওর নিজের অসম্মান। কিন্তু ব্যাপারটা এমন একটা পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল যে, আর সহ্য করা যাচ্ছিল না।
প্লেনটা চলে গেলেও তার শব্দটা এখনও যেন চারিদিকে রয়ে গিয়েছে। এত নিচু দিয়ে প্লেন যেতে কোনওদিন দেখেনি নোঈ। ও মাঝে মাঝে ভাবে কোনওদিন যদি কোনও প্লেন ভেঙে পড়ে এই শহরটায়! কী সাংঘাতিক ব্যাপারটাই না হবে!
সাইড-ব্যাগটার ভেতর থেকে একটা জলের বোতল বের করল নোঈ। অর্ধেক জল আছে। কিছুটা খেয়ে আবার ব্যাগে ভরে রাখল বোতলটা। তারপর চারপাশে তাকাল। বিকেলের এই সময়টায় বেশ ভিড় থাকে। আজ আবার কী সব অনুষ্ঠান আছে জীবনানন্দ সভাঘরে। ওই দিকে যাওয়ার যে-গেটটা রয়েছে তার সামনে বড়-বড় পোস্টার পড়েছে! গল্পপাঠ না কী যেন হবে। অন্য দিন হলে হয়তো নোঈ যেত, কিন্তু আজ মেজাজটা ভাল নেই। ব্যাগটাও বড্ড ভারী লাগছে। গীতবিতানটা এত মোটা! এটা নিয়ে সারা দিন ঘুরছে ও। অফিসও করেছে। কী, না শ্বেতা ওটা নেবে। শ্বেতার বইটা কোন এক বান্ধবী নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। কাল শ্বেতার গানের প্রোগ্রাম আছে।
আসলে নোঈর আজ একটুও দাঁড়াতে ভাল লাগছে না। কারও সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছে না। শুধু মনে হচ্ছে বাড়ি গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে এসিটা চালিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে দিতে। পরপর যা ঘটছে জীবনে, আর নিতে পারছে না! প্রথমে মা, তারপর জয়, তারপর এই চাকরি। কী যে ঝামেলা! চোয়াল শক্ত করে চোখ বন্ধ করল নোঈ। মায়ের মুখটা ভেসে উঠল সামনে। মায়ের রাগী, গোমড়ামুখ! কী অদ্ভুত! মা কেন এমন করে কে জানে! সবাই বলে ছেলেমানুষি। কিন্তু নোঈ জানে আসলে এটা ইগো, জেদ। মায়ের কথা সবাইকে শুনতে হবে। কেন শুনতে হবে? ভুল বললেও শুনতে হবে! এমন আবদার করার মানে কী? রাগ হয়ে যায় নোঈর। আরে বাবা, তোমার যদি পাত্র অতই পছন্দ হয় তবে তুমি যাও না, বিয়ে করো না! ডাক্তার হলেই তাকে পছন্দ করতে হবে? বিলেতে থাকলেই তার ওপর হামলে পড়তে হবে? আশ্চর্য সাইকোলজি মানুষের! মনের ওপর কি জোর চলে! হয়নি সেই ছেলেটিকে পছন্দ নোঈর। কী করবে? আর ছেলে তো নয়, বড় বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন যেন! আর সারাক্ষণ কত রোজগার করে, কত দামি গাড়ি চড়ে, এসব বলে গেল। এত বাজে লাগছিল নোঈর! নিজের নামটা পর্যন্ত চিবিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল, “ডিনো।”
বাবা খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল নাম শুনে। অবাক হয়ে বলেছিল, “ডিনো মানে?”
“আসলে পুরো নামটা নাইনটিন্থ সেঞ্চুরির। ম্যারিকায় লোকের ডাকতে সমস্যা হয়! তাই ডিনো করে নিয়েছি আমি।”
