কেয়াদির বিয়ে হয়েছিল দু’বার। কিন্তু দু’বারই বিয়ে ভেঙে গিয়েছে। এক মেয়ে আছে। ফলসা। সে বেঙ্গালুরুতে চাকরি করে।
কেয়াদি বলে, “আমার বাষট্টি বছর বয়স হতে পারে, কিন্তু মনটা এখনও কুড়ি, বুঝলি?”
নিশানের হাসি পায়। মানুষের তো বয়স হবেই! সমস্ত পৃথিবীতে সব মানুষের বয়স বাড়েই। কিন্তু দেখেছে সেটা নিয়ে কত মানুষের মনে কতরকমের জটিলতা। বয়স নিয়ে কিছু মানুষ অযথা ডিফেনসিভ হয়ে পড়ে!
কেয়াদি যখন কথায়-কথায় কুড়ি বছর বয়সের কথা বলে, নিশানের মনে হয়, ও এমন কিছু কুড়ি বছরের ছেলেপুলেকে চেনে, যারা গাম্ভীর্যে দুশো কুড়ি বছর ছুঁয়ে ফেলেছে! বয়স দিয়ে কে কতটা মানসিকভাবে নবীন আর তাজা, সেটা বোঝানোর খুব কিছু দরকার আছে বলে মনে হয় না নিশানের।
কেয়াদি একটু নাচতে-নাচতে হাঁটে। এখনও একরাস্তা লোকের মধ্যে দিয়ে প্রায় নাচের ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বলল, “কী রে, তুই কোথায় যাচ্ছিস? ওই বুড়োটার কাছে?”
নিশান হাসি চাপল কোনওমতে। বিজনদাকে কেয়াদি কেন কে জানে, সহ্য করতে পারে না! কথা উঠলেই বলে, “শালা মেনিমুখো! পার্টি করে! লেনিনকে কী উচ্চারণ করত জানিস? লেলিন! আমার বাবার পায়ের কাছে বসে থাকত। আর কাজুদার চামচা হয়ে ঘুরত। সে কিনা এখন সং সেজে ঢং করছে! তুই যাস কেন দেড়েলটার কাছে? যাবি না একদম!”
কেয়াদিরা এই অঞ্চলের পুরনো বাসিন্দা। অনেক কিছু চেনে। আসলে নিশানরা আগে এখানে থাকত না। মুর্শিদাবাদে বাবার ব্যাবসা ছিল। পরে ওরা সোনাঝুরিতে চলে আসে জমিজায়গা কিনে। নিশানের তখন পাঁচ বছর বয়স। দেখতে-দেখতে তারপর চব্বিশ বছর কোথা দিয়ে যে কেটে গেল!
কেয়াদির কাছে সোনাঝুরির কথা শোনে নিশান। পুরনো সোনাঝুরির কথা। শোনে সেই সময়কার স্কুল, গঙ্গার পাড়, জোনাক-বাড়ির কথা। আর শোনে একটা ছেলের কথা। অল্পবয়সি, ফরসা, একমাথা কোঁকড়া চুল আর গালে হালকা দাড়িওয়ালা একটা ছেলের কথা। কেয়াদি তার কথা বলতে গেলেই কেমন আবছাভাবে তাকায় দূরের দিকে। তারপর অস্ফুটে বলে, “সত্যি, অদ্ভুত মানুষ ছিল কাজুদা!”
“কাজুদা? মানে?” প্রথমবার শুনে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল নিশান।
কেয়াদি বলেছিল, “সে ছিল একজন। পুরো নাম বেঞ্জামিন কূজন সরকার।”
“কথা কানে যায় না?” কেয়াদি ঝংকার দিয়ে উঠল, “আমায় কেয়াদি বলিস ঠিক আছে, কিন্তু জানবি আমি তোর মায়ের বয়সি। কথা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিবি।”
নিশান হাসল, “এই বলো বয়স কুড়ি। আবার এই বলছ মায়ের বয়সি! এত কনফিউজ়ড কেন তুমি?”
“আমি কনফিউজ়ড?” কেয়াদি চোখ বড়-বড় করল।
“বিজনদা ঠিকই বলে…” কথাটা অসমাপ্ত রেখে চুপ করে গেল নিশান। বিজনদার নাম শুনলে চিড়বিড় করে ওঠে কেয়াদি। এই চিড়বিড়ানিটা দেখতে খুব মজা পায় ও।
“কী বলে দেড়েলটা? আমায় নিয়ে কথা বলে ও? ওর দাড়ি যদি না ছিঁড়েছি আমি! আমার নাম পালটে দিস!” রাস্তার মধ্যে প্রায় লাফাতে লাগল কেয়াদি।
নিশানের আবার হাসি পেল খুব। অবশ্য তার সঙ্গে হঠাৎ ভালও লাগল। আসলে কুড়ি নয়, কেয়াদির বয়স বড়জোর তেরো। নেহাত কপাল খারাপ, তাই ওই মনটা একটা বাষট্টি বছরের শরীরে আটকে আছে!
“বলো ডাকলে কেন? আমি বিজনদার কাছে যাব। আলুর চপ নিয়ে যাব। বিজনদা রোজ সন্ধেবেলা মুড়ি দিয়ে খায়।”
“রোজ?” কেয়াদি চোখ বড়-বড় করে তাকাল, “বুড়োর রস কম নয়তো! রোজ ওই মোবিলে ভাজা চপগুলো গেলে? মরার ইচ্ছে হয়েছে? হলে বলিস আমি গিয়ে গলা টিপে দিয়ে আসব।”
“আহা, তুমি বলো না, কী কেস? ডাকলে কেন?” নিশান এবার সত্যি অধৈর্য হল। কেয়াদি এত কথা বলে যে, একবার ধরলে ছাড়া পাওয়া মুশকিল।
কেয়াদির যেন মনে পড়ে গেল কথাটা। চট করে একবার হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বলল, “আরে, তুই আমার সব গুলিয়ে দিস! শোন, এখনই একবার সোনাঝুরি স্টেশনে চলে যা।”
“কী? কেন?” অবাক হল নিশান।
“আরে, ফলসা এসেছে আজ। কাল ওর জন্মদিন না?” কেয়াদি এমন করে বলল, যেন ফলসার জন্মদিনটা পাবলিক হলিডে।
“তোমার মেয়ে এসেছে?” অবাক হল নিশান।
“আসবে না? সেই গতবছর পুজোর পর এই এল। তা, ওর কয়েকজন বান্ধবী এসেছে আমাদের বাড়িতে। থাকবে।”
“ভাল কথা,” নিশান বলল, “তাতে আমি স্টেশনে যাব কেন? ট্রেনের গার্ড আর ড্রাইভাররাও আসবে নাকি?”
“আরে, কথাটা শোন! খালি বাজে বকবক! দেড়েলটার সঙ্গে থাকতে থাকতে তুইও ক্যালানে হয়ে গেছিস।”
“কেয়াদি,” নিশান বলল, “কী সব ভাষা ব্যবহার করো!”
“ওরে আমার নাড়ু!” কেয়াদি চটাস করে একটা চাঁটি মারল নিশানের হাতে, “ছেলেরা বলতে পারে আর আমরা কি বানের জলে ভেসে এসেছি? শভিনিস্ট পিগ!”
নিশান হেসে বলল, “তা পিগ স্টেশনে গিয়ে কী করবে?”
“ওর একটা বান্ধবীকে নিয়ে আসবি। বেচারি আগে কোনওদিন ট্রেনে করে আসেনি। খুব বড়লোক বাড়ির মেয়ে। এই সোনাঝুরি জুট মিলটার মালিকের মেয়ে! ট্রেনে-ফেনে চড়ার অভ্যেস নেই। কিন্তু গাড়িতেও আসবে না। ওর ইচ্ছে লোকাল ট্রেনে একবার উঠবে। তুই স্টেশনে গিয়ে ওকে রিসিভ করে রিকশা করে আমাদের বাড়িতে এখনই নিয়ে আয়। ওর ট্রেন আর কুড়ি মিনিটের মধ্যে ঢুকবে।”
নিশান কিছু বলার আগে কুঁইকুঁই করে ওর মোবাইলটা বেজে উঠল। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ও দেখল নোঈ কল করেছে!
