মণীশ বলল, “পছন্দ করে মানে?”
“ওঃ, তোর খেলা পছন্দ করে। তোর অরগানাইজ়িং যে ক্যাপাসিটি, সেটা পছন্দ করে। গত ডিসেম্বরে রক্তদান শিবির করলি, সরস্বতী পুজোর সময় দুঃস্থ বাচ্চাদের বইখাতা দিলি। বিজনদা সব খেয়াল করেছে।”
“মহা কেলো তো!” মণীশ বলল, “আমি একা করেছি নাকি? আমাদের ক্লাব থেকে করেছে। আমিও ছিলাম। এই মাত্র।”
“যাই হোক, বয়স্ক মানুষ এত করে বলছেন। একদিন আয় না পার্টি অফিসে। কাছেই হুলোর চপের দোকান আছে। ব্যাপক ভেজিটেবল চপ বানায়। খেয়ে যাবি,” নিশান হাসল সামান্য।
মণীশ মোবাইলটা টিপে সময় দেখল, “ওরে বাবা, লেট হয়ে গিয়েছে। সামনে ইলেভেনের পরীক্ষা। দু’-দু’বার গাড্ডা মেরেছি। এবারও যদি মারি, বাপ লাথ মেরে গঙ্গায় ফেলে দেবে। আমি চলি নিশানদা।”
“আমি তোকে ছেড়ে দেব? কেরিয়ারে উঠে বোস।”
“দূর, ওই কেরিয়ারে কে বসবে!” মণীশ বিরক্ত হল, “শোনো, এখন সকলেই বাইক চালায়। পার্টি করে কী ছিঁড়লে? দ্যাখো না, পার্টিতে ঢুকেই গলায় সোনার চেন আর বাইক নিয়ে নেয় সবাই। সে শালা টিপছাপ থেকে এম এ পাশ সবার এক কেস। বাঙালির পাছা এখন সেনসিটিভ হয়ে গিয়েছে! তোমার সাইকেলের কেরিয়ার তার ভাল লাগবে না। আমরা বাইকের নরম গদিতে বসতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। বুঝেছ?”
নিশান বলল, “তা হলে তুইও আয়। বাইক হয়ে যাবে তোরও।”
মণীশ আচমকা চোয়াল শক্ত করল। তারপর বলল, “শোনো নিশানদা, কারা তেল দেয় জানো? যাদের ট্যালেন্ট নেই। যাদের নিজেদের ওইখানে জোর নেই। আমার আছে। আমি নিজের রোজগারে বাইক কিনব। গাড়ি কিনব। অপদার্থ তেলখোর, চোর-চোট্টাগুলোকে তেল দিতে যাব না। বাই।”
নিশান জানে মণীশের কথাটা ঠিক। এই তেল দেওয়ার ব্যাপারটা এখন এমন একটা পর্যায় পৌঁছে গিয়েছে যে, ওর মনে হয় অধিকাংশ লোকের বোধহয় তেলের খনি আছে!
মণীশ যেতে গিয়েও থমকে গেল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “আচ্ছা নিশানদা, জোনাক-বাড়ির কেসটা কী বলো তো!”
“জোনাক-বাড়ির আবার কী কেস?” নিশান অবাক হল।
“যা! তুমি জানো না? গতকাল বাবা জেঠুকে বলছিল। জোনাক-বাড়ি নাকি বিক্রি হয়ে যাবে! সত্যি?”
“দূর! অত পুরনো একটা ব্যারাক-বাড়ি, অত বড় জায়গা নিয়ে তৈরি! বিক্রি হয়ে যাবে বললেই হল? ওর ভেতরের বাগানে কত গাছ আছে দেখেছিস? প্লাস ওটা আমাদের সোনাঝুরির একটা আইডেন্টিটি!” নিশান পাত্তাই দিল না মণীশের কথার।
“তাই?” মণীশ কাঁধ ঝাঁকাল, “কে জানে! শুনলাম বলে বললাম। তোমরা পার্টির লোক। তোমরা তো জানবে। তবে ওই তারক চক্কোত্তি পারে না এমন কোনও কাজ নেই! পারলে গঙ্গাটাকে বিক্রি করে দেয়! শুনছি সোনাঝুরি জুট মিলটাকেও নাকি হুজ্জতি করে বন্ধ করে দিতে চাইছে। তারপর প্রোমোটারকে বিক্রি করে দেবে। সত্যি?”
চোয়াল শক্ত করল নিশান। কথাটা ও নিজেও শুনেছে। পার্টির ভেতর এটা ওদের বলা হয়েছে যে, জুট মিল তুলে সেখানে নাকি আবাসন হবে। গঙ্গার ধারে বড়-বড় ফ্ল্যাট আর বাংলো হবে। কে জানে! তবে জুট মিল তোলা অত সহজ নয়। ব্রিটিশ আমলের মিল। মালিক গ্রুপ বহু দশক ধরে চালাচ্ছে। এখনও সাড়ে ছ’হাজার শ্রমিক আছে। এ তো আর ফুটে প্লাস্টিক পেতে বসা দোকান নয় যে, হল্লাগাড়ি এসে ইচ্ছেমতো তুলে দেবে!
নিশান বলল, “ওসব কিছু নয়। বেকার কথা। হলে আমরা জানব না? জোনাক-বাড়িতে অত অত বড় বাগান। প্লাস বাড়িটার একটা হেরিটেজ ভ্যালু আছে। বিক্রি করব বললেই হল?”
মণীশ হাসল, “বাগান কই আর! এখন তো জঙ্গল! তবে বিক্রি হয়ে গেলে বেকার হবে কিন্তু। জায়গাটা সুন্দর। যাকগে, কাটি গো। পরে কথা হবে।”
নিশান বাঁধের ধার বেয়ে নামতে থাকা মণীশের উদ্দেশে সামান্য চেঁচিয়ে বলল, “অফিসে কাল-পরশু করে আসিস একবার। ভুলিস না কিন্তু।”
বড়রাস্তায় উঠে ডান দিকে বাঁক নিল নিশান। সন্ধের সময় জায়গাটা বেশ জমজমাট থাকে। দোকানপাটে ভিড় থাকে বেশ। তাই লোকজনের মধ্যে দিয়ে জোরে সাইকেল চালানো মুশকিল।
ওর সামনেই এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে হা-হা হি-হি করতে করতে হাঁটছে। নিশান বুঝল টিউশন থেকে ফিরছে সব। কিন্তু এরা এমন করে হাঁটছে যে, সাইকেল নিয়ে গলে যাওয়ার জায়গা নেই!
টিংটিং করে বেল বাজাল নিশান। কিন্তু কেউ সরার নাম করল না। বিরক্ত লাগল ওর। আচ্ছা মুশকিল! ও ভাবল একবার জায়গা পেলেই সুট করে সাইকেলটা গলিয়ে দেবে।
তার আগেই “নিশান,” বলে একটা মেয়েলি গলার ডাক শুনতে পেল ও। সাইকেলটাকে ব্রেক করে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে পড়ল নিশান। কেয়াদির গলা! চোয়াল শক্ত করল ও। যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধে হয়।
কেয়াদি মানে কেয়া বটব্যাল। সোনাঝুরির সবচেয়ে বড় নাচের স্কুলটা কেয়াদিই চালায়। সঙ্গে একটা প্রাইমারি স্কুলও আছে। আর এই অঞ্চল থেকে বেরোনো লিটল ম্যাগ ‘সন্দর্ভ’-ও কেয়াদিই সম্পাদনা করে।
ওই ম্যাগে প্রতি সংখ্যায় লিখতে হয় নিশানকে। তবে এখন মূলত রাজনৈতিক লেখা লেখে ও। কেয়াদি নিশানকে খুব স্নেহ করে। আর তাতেই সমস্যাটা হয়েছে। কারণ, নিশানকে দেখলেই কেয়াদির নানা কাজ করার কথা মনে পড়ে যায়।
চোয়ালটা শক্ত করে নিশান ভাবল, এখন আবার কী করে দিতে হবে ভগবান জানে!
কেয়াদি হন্তদন্ত হয়ে কাছে এল। হাঁটা দেখে হাসি পেল নিশানের। কেয়াদি কেমন একটা আলখাল্লা ধরনের জামার সঙ্গে বড় ঢোলা প্যান্ট পরে। কাঁধে সারাক্ষণ একটা রংবেরঙের ঝোলা থাকে। মাথার কাঁচা-পাকা চুলগুলো একদম কদম ফুলের মতো করে ছাঁটা। কানে ঢাউস দুল। কপালে কালো রম্বস আকৃতির টিপ! ওদের মফস্সলে কেয়াদিকে কেমন মঙ্গল গ্রহ থেকে আসা প্রাণীর মতো লাগে নিশানের।
