বাঁধের ওপর সাইকেল নিয়ে উঠে একটু থমকাল নিশান। আরে, মণীশ আসছে না!
মণীশ ছেলেটা ভাল ফুটবল খেলে। বয়স কম। আঠারো-উনিশ মতো। কলকাতার একটা সেকেন্ড ডিভিশনে খেলছে এখন। তবে নিশান নিশ্চিত, বড় ক্লাবেও ও খেলবে। ছেলেটা একটু রগচটা ধরনের আছে। কিন্তু মনটা ভাল। বিজনদা বেশ কয়েকবার নিশানকে বলেছে, মণীশকে পার্টি অফিসে নিয়ে আসতে। নতুন রক্ত না আনলে তো আর দল বাঁচবে না!
সবাইকে ডেকে-ডেকে পার্টিতে ঢোকানোয় বিশ্বাস করে না নিশান। ভাল লাগে না ওর। ইচ্ছের বিরুদ্ধে, অবলিগেশনে ফেলে কাউকে কিছু করানোর মানে হয় না। কারণ, তাতে আসল কাজটা হয় না। যেখানে মন, হৃদয় অনুপস্থিত সেখানে সবটাই ফাঁকি।
তাও বিজনদার কথা মেনে চলে বলে, মণীশকে পার্টির কথা বলে নিশান। অফিসে আসতে বলে। কিন্তু ছেলেটা কেমন যেন পাশ কাটিয়ে যায়।
হ্যাঁ, ছেলেটা মণীশই তো! এই আলোছায়ার চেককাটা দৃশ্যের মধ্যেও ছেলেটার হেঁটে আসা দেখে ঠিক চিনতে পেরেছে নিশান!
সাইকেলে বসেই মাটিতে পা দিয়ে সাইকেলটাকে দাঁড় করাল ও। মণীশ কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলতে বলতে আসছে। বাঁ হাতে ফোনটা কানের সঙ্গে চেপে ধরে মাটির দিকে চোখ রেখে হাঁটছে ছেলেটা।
“এই মণীশ!” গলা তুলে এবার ডাকল নিশান। বাঁধ থেকে নেমে যাওয়ার রাস্তাটা সামনেই। মণীশ ওই দিকে বাঁক নিয়ে নিয়েছিল প্রায়।
আচমকা ডাকে থমকে দাঁড়াল মণীশ। কান থেকে বাঁ হাতটা সামান্য সরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর আবছায়ার ভেতরে নিশানকে দেখতে পেয়ে থমকাল একটু। হাসল। ডান হাত তুলে এগিয়ে এল।
নিশানের সামনে এসে দাঁড়াল মণীশ। ফোনে বলল, “আরে, খেপ খেলবে না কেন? বলছি না একটা ম্যাচের জন্য দেড় হাজার টাকা দেবে। ধান্যকুড়িয়ায় যেতে হবে খেলতে। আমি তোমার কথা বলেছি মাহিরদা। বেকার ভয় পেয়ো না তো। পতাদা জানবে কেমন করে? আগেও দুটো চান্স ছেড়েছ। আর বলব না বলে দিচ্ছি।”
ওদিক থেকে কী উত্তর এল, বুঝতে পারল না নিশান। শুনল, মণীশ বলছে, “দূর বাবা, বলছি কালকের মধ্যে জানাতে হবে! বেকার নকশা মারাচ্ছ কেন? তবে এটাই লাস্ট চান্স। পতাদাকে অতই ভয় পেলে যাও পতাদার পা ধরে বসে থাকো। রাখছি।”
ফোনটা কেটে চার অক্ষরের একটা গালি দিয়ে নিশানের দিকে তাকাল মণীশ। বলল, “এই জন্য শালা লোকের উপকার করতে নেই! বারবার বলি খেপ খ্যালো, টাকা পাবে। টাকার দরকার, কিন্তু পেছনে যত রাজ্যের ভয়! কী না পতাদা নাকি বকবে। বেকার ভুঁড়িওয়ালা একটা পিস! এর আগেও দু’বার কথা দিয়ে আসেনি। আমার শালা ভাল লাগে না। যেচে কিছু করতে গেলে লোকে বিশাল ভাও খায়।”
নিশান হাসল। মণীশের মাথাটা গরম। মুখটাও খুব কিছু ভাল নয়। ছোট-বড় জ্ঞান নেই ওর। গালি দিতে পারলেই যেন বাঁচে। কিন্তু এই এবড়োখেবড়ো ছেলেটার ভেতরে অন্যের জন্য ভাল কিছু করার তাগিদ আছে। বিজনদার চোখ আছে। রগচটা ছেলেটার ভেতরে ভাল মানুষটাকে ঠিক চিনতে পেরেছে।
আসলে চারিদিকে তো কেবল মুখোশ পরা মানুষের ভিড় দ্যাখে নিশান। পাউডার-মাখা হাসি। টিপ-কাজল সাজানো ভালবাসা। ভুরু প্লাক করা বন্ধুত্ব। সকলেই সকলের প্রশংসা করছে। বাঁ হাতে ছোরা লুকিয়ে ডান হাতে পিঠ চাপড়াচ্ছে! কেউ আসলে আর সত্যিকারের ভালবাসছে না কাউকে। শুধু শপিং মলের মতো হাসিখুশি আর আলোময় মুখ নিয়ে একে-অপরের সামনে দাঁড়াচ্ছে। এর ভেতরে এই ধরনের মণীশরা ক্রমশ গুলিয়ে যাচ্ছে, ঢেকে যাচ্ছে।
নিশান বলল, “এত ভাবিস কেন! কে কী করল, না করল, সেই নিয়ে উত্তেজিত হোস কেন তুই?”
“হব না?” মণীশ চোখ বড় করল, “জানো, মাহিরদা আমাদের টিমে খেলে। ডিফেন্স। বিশাল চেহারা। টেকনিক ভাল নয়, কিন্তু ডিফেন্ডার তো, তাই চেহারা দিয়ে পুষিয়ে দেয়। হয় বল যায়, নয়তো ম্যান যায়। দুটো একসঙ্গে যেতে দেয় না। স্টেশন মোড়ের বেণুবীণা ক্লাব আছে না, ওরা ধান্যকুড়িয়ায় খেলতে যাবে। জিতলে এক লাখ টাকা দেবে। বড় রুপোর কাপ দেবে। আরও নানা পুরস্কার আছে। ওরা আমায় কলকাতা থেকে তিনজন এনে দিতে বলেছে। একটা ডিফেন্ডার, একটা হাফ আর একটা স্ট্রাইকার। দেড় হাজার টাকা করে দেবে ম্যাচ পিছু। তাও কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে খেলতে হবে। কিন্তু শালা ঢ্যামনামো করছে!”
নিশান হাসল, “তোর কী দরকার পড়েছে? আর প্লেয়ার নেই?”
“আরে বাবা, মাহিরদার বাড়ির অবস্থা ভাল নয়। একটা অসুস্থ ভাই আছে। মা আয়ার কাজ করে। মাহিরদা বেকার। বাবা তো নেই। নিজেই বলেছিল এসব। শুনলে কষ্ট লাগে না, বলো? পার ম্যাচ দেড় হাজার। যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ফ্রি। আর ফাইনালে জিতলে বোনাস হিসেবে পাঁচ হাজার! লোকের শালা ভাল করতে নেই! এখন বলেছি, বলে পতাদা, মানে আমাদের কোচ, সে নাকি বকবে! ন্যাংটো খোকা আমার!”
“অত রাগ করতে নেই,” নিশান হাসল শব্দ করে, “সবাই একরকম হয় না। কিন্তু এভাবে একজন একজন করে আর কতজনকে হেল্প করবি! নিজে তো আর বাড়ি-বাড়ি এসব করতে পারবি না। মানুষের জন্য কাজ করতে হলে চাই ওয়ার্কফোর্স। চাই সংগঠন। সেটা পেলে তোর মতো ছেলেরা দেশে সোনা ফলাবে!”
মণীশ ভুরু কুঁচকে তাকাল। তারপর বলল, “বিজনবুড়ো তোমায় ছেলেধরা বানিয়েছে, না?”
নিশান হাসল, “শোন, বিজনদা তো ফুটবল-পাগল, তোর খেলা পছন্দ করে। তোকেও খুব পছন্দ করে।”
