নিশানের খুব অস্বস্তি হল। মনে হল উঠে চলে যায়। মেঘলাটা কীসব বলে না মাঝে মাঝে! হ্যাঁ, সবাই জানে যে, ওর মানসিক অবস্থা আর-পাঁচজনের মতো নয়। কিন্তু সারাক্ষণ তো আর সেসব মনে রাখা যায় না। অভাবের সংসার শুধু তো ভাতের হাঁড়িতে টান দেয় না, মনের ভেতরেও একটা ক্লান্তি আর অসহিষ্ণুতা তৈরি করে! কাকিমার রেগে যাওয়াটা তাই বুঝতে পারে নিশান।
কাকিমার বাপের বাড়ির অবস্থা ভাল নয়। জলাফটক এই সোনাঝুরি থেকে সাইকেলে মিনিট চল্লিশেক দূরে। কাকিমার ভাইরা সেখানেই থাকে। বাদলের সঙ্গে ওই বাড়িতে কয়েকবার গিয়েওছে নিশান। মাটির বাড়ি। তাও ভাঙাচোরা। কাকিমার দুই ভাই জুটমিলে কাজ করলেও তিন-চারটে করে ছেলেপুলে দু’জনের। তাই ওদের সংসার সারাক্ষণ ঘাটতিতে চলে। ফলে দায়ে-দফায় দিদির কাছে এসে হাত পাতে দু’জনে। কাকিমার মনটা নরম। ফেরাতে পারে না কাউকে।
নিশান বোঝে সমস্যাটা। কিন্তু এটাও ভাবে যে, সারা জীবন যদি কেউ সেভাবে পরিশ্রম না করে কেবল নাকে কেঁদে কিছু পেয়ে যায়, তা হলে একটা সময় পর সেটাই তার অভ্যেসে পরিণত হয়ে যায়।
নিশান ঘড়ি দেখল। সন্ধে হয়ে গিয়েছে। এবার উঠতে হবে। পার্টি-অফিসে একবার যেতে বলেছে বিজনদা। কীসব দরকার আছে! বিজনদার কথা খুব মানে নিশান।
বিজন সরখেল অকৃতদার মানুষ। ভাঙা রেললাইনের পাশে একাই থাকেই পার্টি-অফিসের পাশের একটা ছোট বাড়িতে। ইট বের করা, মাথার ওপর টালি দেওয়া বাড়িটায় গিয়েছে নিশান। বড় রাস্তা থেকে ভাঙা রেললাইন ধরে হেঁটে যেতে হয় কিছুটা!
চ্যাটার্জিপাড়ায় বিজনদাদের বড় বাড়ি থাকলেও লোকটা কেমন একা সন্ন্যাসীর জীবন কাটায়! খুব অবাক লাগে নিশানের! এমনও কেউ পারে! এই সময়ে দাঁড়িয়ে এমন কেউ আছে, যার কিছু দরকার নেই! বিজনদা নিজেই রান্না করে। সাতষট্টি বছর বয়সেও লোকটা এখনও মজবুত খুব। চোদ্দো বছর বয়স থেকে পার্টির হয়ে কাজ করছে এই অঞ্চলে। সকলে এক ডাকে বিজনদাকে চেনে।
নিশান জানে ওকে নিজের সন্তানের মতোই ভালবাসে বিজনদা। জুটমিলটায় প্রায়ই নানা ঝামেলা লেগে থাকে। এখনও চলছে। ইউনিয়নটা নিশানদের পার্টির দখলে। তাই দায়িত্ব ওদের বেশি। বিরোধীরা তো একটা করে নতুন ইসু তৈরি করতেই থাকে। নিশানদের নেতা তারক চক্রবর্তী। বাবার পরিচিত এই লোকটা। তবে সুবিধের লোক নয়। বিজনদার চেয়ে জুনিয়র হয়েও পার্টিকে ধরে এখানে মগডালে উঠেছে! তবে ও দেখেছে, এই নিয়ে বিজনদার কোনও ক্ষোভ নেই! আর এ-ও দেখেছে, তারকদাও বিজনদার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতে যায় না!
“কাকিমা, আমি হাকিমপাড়ার ওদের সঙ্গে কথা বলব। তুমি ভেবো না,” নিশান উঠে দাঁড়াল।
কাকিমা মুখ তুলে তাকাল নিশানের দিকে। চোখে জল টলটল করছে। খারাপ লাগল নিশানের। মেঘলা কী যে করে না!
কাকিমা বলল, “আমি আর কী বলি তোকে? দেখলি তো সব! শুনলি তো! নিজের মেয়ের কাছ থেকে এসব শুনতে হয়। মায়ের পেটের ভাই আমার। এসে এমন করে কথা বলে! ওদের বাচ্চাগুলো খেতে পায় না। সব শুনে কী করে চুপ করে থাকি বল?”
নিশান জোর করে হাসার চেষ্টা করল। পরিস্থিতিটা দমচাপা হয়ে আছে। ও বলল, “আরে, ছাড়ো না। আমি জানি তো। প্লাস মেঘলাকেও তো চিনি। তুমি এসব ভেবো না।”
নিশান এবার মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই, আমি আসি। মাথা ঠান্ডা রাখ। বুঝলি?”
মেঘলা ওর দিকে তাকাল না। কিন্তু তাও ওকেই জিজ্ঞেস করল, “‘তোমার মনখারাপের মধ্যে আমার জন্ম’— এমন লেখা আর লেখো না কেন নিশানদা? কবে পড়ে শুনিয়েছিলে, আমার আজও মনে আছে। তেমন কিছু লেখো না কেন?”
নিশান থমকে গেল। সেই তেইশ-চবিবশ বছর বয়সের লেখা। তখন এসে মাঝে মাঝে মেঘলাকে পড়ে শোনাত ও। এই অংশটা বারবার শুনতে চাইত মেয়েটা। সেটা এখনও মনে আছে দেখে আজ অবাকই হয়েছিল ও।
নিশান হাসল। বলল, “বয়সের সঙ্গে তো চিন্তাও পালটায়, তাই না?”
মেঘলা বলল, “তাও ওরকম লিখো আবার। ওরকমটাই শুনতে ভাল লাগে।”
নিশান “আসি,” বলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
জীবনে অনেক কিছু সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে কী করে যেন আবছা হয়ে মিলিয়ে যায়। হারিয়ে যায় অজানা বাঁকে। আজকাল নিশানের যেন মনেও পড়ে না ও এমন লিখত। সেই নিশানটা যেন এই নিশান নয়!
সাইকেলটা রাখা ছিল উঠোনের পাশে। অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। তবে রাস্তায় আলো আছে। তার সামান্য ভাঙাচোরা টুকরো এসে পড়েছে এই জায়গাটায়।
সোনাঝুরির মূল টাউনশিপটায় এখন আলোর বন্যা। কিন্তু এমন গলিঘুঁজি বা ব্যাক পকেটের মতো জায়গাগুলোয় এখনও চল্লিশ পাওয়ারের স্ট্রিট বাল্ব ঠিলঠিল করে জ্বলছে!
গেট পেরিয়ে সাইকেলে উঠল নিশান। রাস্তাটা কংক্রিট করা। কিন্তু জায়গায় জায়গায় ভেঙে গিয়েছে। আবছা আলোয় সবটা স্পষ্ট নয়। রাস্তার দু’পাশে ঝোপ। ঝিঁঝি ডেকে চলেছে টানা। মাঝে মাঝে দু’-একটা ছোট বাড়ি আর তার জানলা দিয়ে ঠিকরে আসা আলোয় পুরো জায়গাটাকেই ভুতুড়ে লাগছে নিশানের। ও সাবধানে প্যাডেল করতে লাগল।
রাস্তাটা সোজা গিয়ে বাঁধের ওপর উঠেছে। তারপর বাঁধটা টপকে এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে মূল শহরের ভেতর।
বাঁধ টপকালেই ঘন জনবসতি। বহুব্রীহি ক্লাব। পুরনো গলি। মরচে পড়া বাড়িঘর। আধা ঝিম-ধরা দোকানপাট। আর তারপরেই সোনাঝুরির বড় রাস্তা। ওদের পার্টি অফিস ওই রাস্তা দিয়ে সোজা অনেকটা গিয়ে ভাঙা রেললাইনের পাশে।
