কাকিমা এবার এসে বসল ওর পাশে, “বাবু, তুই বলেছিলি না, কিছু সেলাইয়ের কাজ জোগাড় করে দিবি? মনে আছে তোর?”
নিশানের মনে পড়ল। সত্যি কয়েকমাস আগে কাকিমাকে এটা বলেছিল বটে। বলেছিল, কাকিমাকে কিছু সেলাইয়ের কাজ জোগাড় করে দেবে।
সোনাঝুরির কাছেই হাকিমপাড়া। বহু পুরনো অঞ্চল ওই হাকিমপাড়া। ওস্তাগরদের পাড়া ওটা। সেখান থেকে সেলাইয়ের কাজ পাওয়া যায়।
নিশানের বন্ধু রহিমদের নিজেদেরই বড় দরজির ব্যাবসা আছে। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় জামাকাপড় সাপ্লাই করে ওরা। কাপড় আর ডিজ়াইন পাঠিয়ে দেওয়া হয় ওদের। রহিমরা সেলাই করে ফিনিশড গুডস পাঠিয়ে দেয়।
তাতে বাচ্চাদের জামা থেকে শুরু করে জিন্সের প্যান্ট সব থাকে।
রহিমরা নিজেরা জামাকাপড় সেলাই করলেও জামাকাপড়ের লেবেলগুলো আশপাশ থেকে পার পিস হিসেবে সেলাই করিয়ে নেয়।
ঠিকমতো করতে পারলে মাসে হাজারদুয়েক টাকা রোজগার করাই যায়। নিশান জানে কাকিমাদের কাছে সেটাই বড় ব্যাপার।
কাকিমা বলল, “বুঝিসই তো দিনকাল। তোর কাকুর আর ক’টা টাকা জমানো আছে বল! যদি পাওয়া যেত!”
নিশান হাসল সামান্য। জোয়ানটা চিবিয়ে সামান্য রস গিলে নিয়ে বলল, “তুমি মনে করিয়ে দেবে তো! রহিমকে বললেই হবে। আমি ঠিক ব্যবস্থা করে দেব। কিন্তু চোখের খুব স্ট্রেন হয়। ওটা দেখো। বুঝেশুনে কাজে নেমো!”
কাকিমা হাসল, “আর ওসব ভাবার সময় নেই বাবু। টাকার দরকার রে। বাদলটা যে কী করল! জানি না কী হবে! তুই একটু দেখিস।”
“কী দেখবে?” আচমকা জানলার দিক থেকে মুখ ঘোরাল মেঘলা, “খুব মাগুনে বুড়ি হয়েছ তো! অতই যদি তোমার টানাটানি থাকে রোজ মাছ করো কেন? কেন গন্ধসাবান কেনো? কেন পোস্ত খাও? আর নিজের অপদার্থ ভাইদের হাতে টাকা গোঁজো কেন তুমি? তারা তো সব জুটমিলে কাজ করে। তাও তোমার কাছে এসে নাকে কাঁদে কেন? আর তুমিই-বা তাদের হাতে টাকা দাও কেন? জানো না, তোমার দুই ভাই-ই লম্পট! মাতাল! যার নিজের পায়ের তলায় মাটি নেই, সে কী করে অন্যকে টেনে শক্ত মাটিতে দাঁড় করাতে চায়! নিশানদা এলেই তুমি বারবার বলো এটা চাই, ওটা চাই। আর নাকে কাঁদো। এসব অসহ্য লাগে আমার। বিরক্তিকর লাগে। একদম এসব করবে না।”
কাকিমা চুপ করে গেল আচমকা। নিশানও থমকে গেল। এই মেঘলার বিপদ! কখন যে কী বলে বসবে! কী করবে তার ঠিক নেই। একটু আগে কী বলছিল, আর এখন কী বলছে! ওর লজ্জা লাগল খুব। কাকিমার মুখটা অপমানে কালো হয়ে গিয়েছে। নিশানের মনে হল একছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এইসব অবস্থায় বসে থাকাও বিড়ম্বনার।
কাকিমা কোনওমতে বলল, “তুই চুপ করবি!”
“কেন চুপ করব?” এবার ঘুরে বসল মেঘলা, “আমায় চুপ করাতে চাও কেন সবাই মিলে? কী হবে চুপ করিয়ে? আমি চুপ করে থাকলে সত্যিটা কি মিথ্যে হয়ে যাবে? বাবাও তোমায় এই নিয়ে বলত। এগুলো শোনো না কেন? আর নিশানদা কত করবে? তোমার অপদার্থ ছেলেকে সারাজীবন লাই দিয়ে গেলে। লেখাপড়া করল না। বাবা যখন বকত, তুমি বাবার সঙ্গে ঝগড়া করতে। বাবার কাছ থেকে দাদার অন্যায়গুলো লুকিয়ে রাখতে। যখন লেখাপড়া ছেড়ে দিল, তখন কিছু বললে না। তারপর যখন চুরির টাকা এনে তোমার হাতে দিত, তখন বাবাকে বলতে বাবার মুরোদ নেই এত টাকা আনার। আর এখন এসব নাকে কাঁদছ। বাবা মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছে।”
“তুই চুপ করবি!” এবার কাকিমাও তেড়ে উঠল, “খুব চোপা হয়েছে না তোর? দিনকে দিন বাড়িতে বসে গিলে-গিলে খুব চোপা হয়েছে? একপয়সা রোজগারের মুরোদ নেই আবার কথা!”
মেঘলা হাসল সামান্য। তারপর বলল, “সেই তো, অন্ধ মেয়ের রোজগারের দিকে তাকিয়ে আছ এখন! কিন্তু কী করব বলো তো? আমায় তো এভাবেই পয়দা করেছ।”
কাকিমা এবার চাপা গলায় চিৎকার করল, “চুপ করবি তুই! এসব কী বলছিস? জানোয়ার হয়ে গিয়েছিস পুরো! তুই চাস আমি মরে যাই?”
মেঘলা, নদীর পাথরের মতো চোখগুলো তুলে এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর বলল, “তুমি মরে গেলে তো তোমার ভাইদের অসুবিধে হবে। নিজের সোনার চুড়িও তো গতমাসে তোমার নবাবপুত্তুর ছোটভাইকে দিয়েছ। আমি জানি না? আমার চোখ নেই, কিন্তু কান তো আছে! নাকি সেটাও নেই ভাবো?”
“মুখপুড়ি, তোর এতবড় জিভ হয়েছে! আমার জিনিস যাকে খুশি দেব। তোর কী?”
“দাও, সব দিয়ে দাও! আর লোকের কাছে নাকে কাঁদো। ভিক্ষে করো। এরপর আর কাকে-কাকে বলবে আমি দেখব,” মেঘলা আচমকা গলা চড়াল এবার।
“আঃ, মেঘলা!” নিশান আর পারল না। চিৎকার করে উঠল, “চুপ করবি তুই? এসব বলছিস কেন? কাকিমা আমায় আগেই বলেছিলেন তো! আর আমাকেই তো বলছেন! তুই এমন করে অসভ্যতা করছিস কেন রে?”
মেঘলা আবার জানলার দিকে মুখ ফেরাল। নিশান জানে জানলার বাইরে শুধু অন্ধকার এখন। সন্ধে হয়ে গিয়েছে। গঙ্গায় শুধু দু’-চারটে নৌকো ভাসছে। আর আলো বলতে তাদের গলুইয়ের নীচে জ্বলা আগুন। মাঝিরা রান্না করছে। বাকিটা অন্ধকার। তবু ওই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কী দেখতে চায় একটা মেয়ে? কাকে দেখতে চায় নিজের অমন দৃষ্টি দিয়ে?
নিশানের বকুনি খেয়ে মেঘলা চুপ হয়ে যাওয়ায় ঘরের ভেতরটা আচমকা নিঝুম হয়ে গিয়েছে। নদী থেকে হাওয়ার শব্দ ভেসে আসছে শুধু। মাথার ওপর পুরনো দিনের ডিসি পাখা শব্দ করে ঘুরে চলেছে। দাঁত-নখ বের করা স্বরযুদ্ধের পরের নিস্তব্ধতা তুচ্ছ শব্দদেরও প্রকট করে দিচ্ছে এখন।
