বাদল আর নিশান একসঙ্গে পড়ত। কিন্তু হায়ার সেকেন্ডারির পরে বাদল আর পড়েনি। নিশান যখন কলেজে ভরতি হয়েছিল, তখন বাদল বালুরঘাটে তেলের ডিপোয় কাজ নিয়ে ঢুকে পড়ে!
মেঘলাকে ছোট থেকে চেনে নিশান। মেয়েটা চোখে দেখতে পায় না। মাথাটাও মাঝে মাঝে ভারসাম্য হারায়। তখন মেঘলা খুব চিৎকার করে। হাত-পা ছোড়ে। আঁচড়ে-কামড়ে দেয়। কিন্তু তারপর আবার যখন সুস্থ হয়ে ওঠে, তখন দেখলে বোঝাই যায় না মেঘলার কোনওদিন কোনও অসুখ ছিল।
নিশান আজ দুটো নারকেল নিয়ে এসেছে। ওদের বাড়িতে চারটে নারকেল গাছ এখনও অবশিষ্ট আছে। বাবা সেখান থেকে নারকেল পাড়িয়েছে আজ দুপুরবেলা। তখনই মা বলেছিল মেঘলাদের বাড়িতে যেন দুটো নারকেল নিয়ে যায়!
সাইকেলের ক্যারিয়ারে দড়ি দিয়ে বেঁধে এনেছে নিশান। কাকিমা অর্থাৎ মেঘলার মা খুশি হয়েছে খুব। বলেছে, নারকেলের যা দাম, কিনে খাওয়ার কথা আর ভাবে না।
সোনাঝুরির একপাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে গঙ্গা। মোহনার কাছাকাছি বলে নদী এখানে বেশ চওড়া, কিন্তু তার গতি বেশ মন্থর।
মেঘলাদের বাড়িটা নদীর একদম পাড়েই। খুব বৃষ্টি হলে, নদীর জল এসে ওদের উঠোন ডুবিয়ে দেয়।
এখানে আসতে খুব ভাল লাগে নিশানের। সবসময় সুন্দর একটা হাওয়া দেয়। ঘর থেকে বসে জাহাজ দেখা যায়। তার সঙ্গে চারপাশ কী নির্জন। কানে বাতাসের শব্দ এসে লাগে।
মেঘলা সারাদিন বাড়িতে বসে থাকে। নিশানের এনে দেওয়া ব্রেইলের কিছু বই পড়ে। নিশান চেষ্টা করছে ওকে কিছু একটা কাজ জোগাড় করে দিতে। মাঝেরহাটের কাছে একটা দৃষ্টিহীন বাচ্চাদের স্কুল আছে। সেখানে মেঘলার একটা চাকরি করে দেওয়ার চেষ্টা করছে নিশান। জানে না পারবে কি না!
আসলে নিশান সকলের জন্য চেষ্টা করে। বাবা বলে, “শুধু নিজের জন্য কিছু করলি না। অপোগণ্ড একটা!”
নিশান হাসে মনে মনে। নিজের জন্য বলতে কী বোঝায়? টাকা রোজগার? তা টাকা ওদের কম কিছু নেই। সোনাঝুরিতে ওদের বড় তেলকল আছে। জমি আছে। দশ ঘর ভাড়াটে আছে। টাকার অভাব তো হওয়ার নয়। তা হলে কেন বলে বাবা? তেলকলে বসে না বলে? মাস গেলে ঘুরে-ঘুরে ভাড়া তোলে না বলে? হবে হয়তো। এই পৃথিবীতে কেউ টাকা রোজগার না করতে পারলে তাকে সকলে অপোগণ্ড বলে দাগিয়ে দেয়!
নিশান ভাবে এমন অপোগণ্ডই ভাল। কবিতা লেখা, কবিতা-পত্রিকা করা, রাজনীতি করা আর দায়ে-দরকারে মানুষের পাশে দাঁড়ানো নিয়ে ও খারাপ তো নেই।
দরজায় শব্দ হল এবার। মুখ ঘুরিয়ে তাকাল নিশান। মেঘলা জানলা থেকে মুখ না সরিয়ে বলল, “মা, এসেছে।”
নিশান হাসল নিজের মনে। মেঘলা এমন হঠাৎ হঠাৎ কিছু না দেখেও সঠিক বলে দিতে পারে!
কাকিমা ঘরে ঢুকে ব্যস্ত হয়ে বলল, “তোকে বাবু একটু মুড়ি মেখে দিই? টকঝাল চানাচুর আছে আজ। দেব?”
নিশান বলল, “না কাকিমা, আজ খাব না। দেরি করে খেয়েছি দুপুরে। তারপর কেমন যেন অম্বল হয়ে গিয়েছে।”
“জোয়ান দেব একটু?” কাকিমা উদ্বিগ্ন হল।
নিশান জানে এই উদ্বেগটা লোক দেখানো নয়। কাকিমা সকলের জন্য ভাবে। করেও। পাড়ায় যার যা দরকার তাতেই ছুটে যায়। সাধারণত কোনও বাড়ির ছেলে জেলে গেলে তাদের একঘরে করে রাখা হয় এলাকায়। কিন্তু কাকিমার এই পরোপকার করার স্বভাবের জন্য কেউ ওদের খারাপ চোখে দেখে না। বরং প্রতিবেশীরাও নানাভাবে কাকিমাদের পাশে দাঁড়ায়।
মেঘলা যখন মাঝে মাঝে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ে, পাড়ার লোকজনই তো আসে সামলাতে। না হলে কাকিমার একার সাধ্য কী মেঘলাকে সামলায়!
“কী রে বাবু, দেব একটু জোয়ান?”
নিশান বলল, “দাও। আর-একটা কথা, তুমি কি গিয়েছিলে বাদলের কাছে?”
কাকিমা সামনের একটা ছোট্ট তাক থেকে জোয়ানের শিশিটা পাড়ল। তারপর সেটা এনে এগিয়ে দিল নিশানের দিকে। বলল, “হ্যাঁ, গিয়েছিলাম গতকাল।”
নিশান শিশির মুখটা খুলে অল্প একটু জোয়ান ঢেলে নিল হাতে।
“দাও,” নিশান দেখল, বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকেই ওর দিকে বাঁ হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছে মেঘলা।
“আবার বাঁ হাত?” কাকিমা সামান্য বকুনি দেওয়ার গলায় বলল, “কতবার বলেছি এমন করে বাঁ হাত বাড়িয়ে দিবি না! বাঁ হাতে কেউ কিছু নেয়! ডান হাতে নিবি।”
মেঘলা শুনল না। বরং বাঁ হাতটা অধৈর্যের সঙ্গে নাড়িয়ে বলল, “দাও, দাও, দাও।”
নিশান আলতো করে হাত ধরল মেঘলার। তারপর জোয়ান ঢেলে দিল হাতের পাতায়।
মেঘলা হাতটা টেনে নিল এবার। তারপর বলল, “খাবারের নাম জোয়ান! আচ্ছা বৃদ্ধ বলেও কি কোনও খাবার হয়?”
কাকিমা এর উত্তর দিল না। বরং আগের কথার খেই ধরে বলল, “আর বলিস না বাবু, ছেলেটা রোগা হয়ে গিয়েছে!”
নিশান কী আর বলবে! ও চুপ করেই থাকল। ও নিজেও কয়েকবার গিয়েছে বাদলকে দেখতে। আলিপুর জেলে আছে। খুবই খারাপ অবস্থা! প্রথমত, দেখা করাটাই ঝক্কির। তারপর ভেতরে ঢুকলেও হাজারটা ঝামেলা। ছোট জালের ওপার থেকে সকলের মধ্যে দাঁড়িয়ে কথা বলাও দুষ্কর।
কাকিমা বলল, “জানিসই তো টাকাপয়সা দিতে হয়। আমাদের তো এই অবস্থা! কোথা থেকে মাসে মাসে ওকে এত টাকা দিই বল তো!”
নিশান দীর্ঘশ্বাস গোপন করে মাথা নামাল। ও নিজে যে ক’বার গিয়েছে বাদলের সঙ্গে দেখা করতে, বেরিয়ে আসার পর ওর নিজেরই কেমন যেন অসুস্থ লেগেছে। আর ভেবেছে ওসব জায়গায় মানুষ থাকে কী করে! আমাদের দেশের এই জেলগুলোকে সংশোধনাগার বলা হয়। কিন্তু সত্যি বলতে কী, মানুষের কতটা সংশোধন হয় এখানে কে জানে।
