দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে চুলটা ঠিক করে নিল আইকা। ঘরে বাইরের লোকজন রয়েছে। অফিস থেকে তো বিধ্বস্ত হয়ে ফিরেছে! তাও হাত দিয়ে যেটুকু সামাল দেওয়া যায় আর কী।
ডোরবেলটা বাজিয়ে একটু সরে দাঁড়াল আইকা। হাতের প্যাকেটে খাবার আছে। এগুলোকে সাজিয়ে দেওয়াটা ওকেই মনে হয় করতে হবে। এত খাবারের কী দরকার, আইকা বোঝে না! পুটুমাসি এত বাড়াবাড়ি করে না!
সকালে শুনেছিল পুটুমাসি মাকে বলছে, “এমন পাত্র হাতছাড়া করলে হবে না বুঝলি। যেভাবেই হোক একে জামাই করতে হবে! মেয়েসন্তান। কখন যে কী হয়!”
কথাটার মধ্যে এমন একটা দৈন্য ছিল যে, আইকার কেমন যেন গা ঘিনঘিন করছিল! নোঈ খুব ভাল মেয়ে। লেখাপড়াতেও খুব ভাল। এম কম করেছে। চাকরি করছে একটা ফার্মে। ঠিক সময়ে নিজে যখন বুঝবে পছন্দ করে বিয়ে করবে। কিন্তু এই যে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া! এই যে মেয়ে বলে, তার শরীরে আর মনে একটা রেগুলেটর বসিয়ে দেওয়া, এটা ভাবলেই মাথায় আগুন জ্বলে আইকার! বাবা মারা যাওয়ার পর মাকে আর ওকে তো কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি! আর সেটা হয়েছে ওরা দু’জন মেয়ে বলেই।
দিনকে দিন পুটুমাসি কেমন যেন হয়ে উঠছে। এত ডেসপারেশন কীসের? বিয়ে করে কী মোক্ষ লাভ হবে? আর ‘মেয়েসন্তান! কখন কী হয়!’ এসবের মানে কী? যত্তসব রিগ্রেসিভ ধারণা!
আইকার মনে হচ্ছিল, একবার গিয়ে চেপে ধরে পুটুমাসিকে। কিন্তু শেষে মত বদলেছে। মা বলে, “পুটু ওরকম। পাগলি। ছোট থেকেই পাগলি। ওর কথা ধরবি না! ওর মনটা খুব ভাল!”
মনটা খুব ভাল হওয়া যেমন জরুরি, তেমন কথাবার্তাগুলো ঠিক হওয়াও জরুরি। আমাদের দেশে, ‘ওর মন ভাল’ এই দোহাই দিয়ে অনেক লোকের খারাপ ব্যবহারকে পাশ নম্বর দিয়ে চালিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা আছে!
মা এসে দরজাটা খুলে দিল। আইকা ঘরে ঢুকে একটু দাঁড়াল। মা আইকার হাত থেকে খাবারের প্যাকেটগুলো নিয়ে বলল, “তুই আজকে না এলেও পারতিস!”
আইকার ভুরু কুঁচকে গেল। মা এমনভাবেই কথা বলে রেগে গেলে।
মা বলল, “যা গিয়ে বোস ওখানে। তিনজন এসেছে। পাত্র আর সঙ্গে দু’জন। ওখানে রাঙাদা আছে। পুটুও আছে। তবে নোঈ এখনও ওদের সামনে যায়নি! তুই গিয়ে বোস। কেমন ছেলে ভগবান জানে! তিন বামুনে কখনও মেয়ে দেখতে আসে!”
আইকা ভাবল একবার বাথরুমে গিয়ে মুখটা ধুয়ে নেবে। কিন্তু তারপরেই মত বদলাল। কী হবে? ওর তো বিয়ে নয়!
ও জুতোটা খুলে বসার ঘরের দিকে এগোল।
ঘর থেকে পুটুমাসির গলা পাওয়া যাচ্ছে! ও দেখল সোফায় বসে রয়েছে তিনজন। দু’জনকে পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে আর একজনের মাথার পেছনটা দেখা যাচ্ছে।
আইকা গিয়ে দাঁড়াল ঘরের মধ্যে। পুটুমাসি কিছু বলছিল। কিন্তু এবার থমকাল। তাকাল ওর দিকে। সেই সঙ্গে বাকিরাও তাকাল। আইকা দেখল ওর দিকে পেছন করে বসে ছিল যে-মানুষটি, সেও মাথা ঘোরাল!
আর সঙ্গে-সঙ্গে দূরে, বহুদূরে কোথায় যেন একটা বরফের পাহাড় ভেঙে পড়ল। আর তার শব্দে শরীরের ভেতরটা নড়ে উঠল আইকার!
ও দেখল মাথা ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে উনিশ বছর আগে ফেলে আসা একটা সময়! অতীতে ফেলে আসা এক জীবাশ্ম! ওর মনে হল, ওই বিকেলেই ওর কথা মনে হয়েছিল না!
.
০৪. নিশান
“তোমার মনখারাপের মধ্যে আমার জন্ম। তোমার শব্দের মধ্যে আমার মাতৃভাষা। তোমার বুকের নীচে বয়ে চলা জলধারা থেকে জল পান করে আমার মৃতপ্রায় সব হরিণেরা। তুমি ছিলে তাই আমিও আজ দাঁড়িয়ে রয়েছি এই বকুলবীথিতে। তুমি শ্বাস নাও তাই গাছ হাওয়া পায়। মেঘ বয়ে যায় নদী থেকে আকাশের দিকে। তুমি স্নেহের দৃষ্টিতে তাকাও তাই গাছেরা ফুল ফোটায়। মৌমাছি জমিয়ে তোলে বিন্দু বিন্দু মধু। তুমি চোখ মেলে আকাশ দেখো, তাই গ্রীষ্ম পেরিয়ে বর্ষায় পৌঁছতে পারে প্রকৃতি। তুমি গান গাও তাই পাখি ডাকে, মাঝি নৌকো বায়, শিশুরা মায়ের স্তন্য খুঁজে নেয় আলগোছে। তুমি হাসো, তাই হারানো বন্ধু ফিরে পায় মানুষ। পাথর হয়ে যাওয়া বুক ফাটিয়ে আলোর দিকে হাত বাড়ায় ফুলগাছ। নতুন ভাতের গন্ধে দৃষ্টি ফিরে পায় অন্ধ ভিক্ষুক। তুমি ছিলে তাই সুর পাঠালেন ঈশ্বর। তুমি ছিলে তাই স্তব গেঁথে রাখলেন বৈদিক ঋষি। তুমি ছিলে তাই অন্ধকার আকাশ ভেঙে প্রতিদিন তোমায় দেখবে বলে উঠে আসেন অর্কদেব। আজ তোমার মনখারাপের মধ্যে আমার জন্ম। আজ তোমার আনন্দের মধ্যে আমার জীবন্ত হয়ে ওঠা।”
ঘরটা ছোট। আবছায়া। একটুকরো জানলা দিয়ে শেষ বিকেলের আলো এসে পড়ছে অর্ধেক মুখে। গালের ওপর পড়ে রয়েছে দু’-চারটে অন্যমনস্ক চুলের রেশম। নরম আলোয় দেখা যাচ্ছে চোখ দুটো। বাইরের দিকে, আলোর দিকে তাকিয়ে থাকা পাথর রঙের চোখ দুটো।
মেঘলা প্রায়ই বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে এভাবে। গঙ্গার পাশেই ওদের এই ছোট বাড়ি। ইটের দেওয়াল। মাথার ওপর টালি দেওয়া। মেঘলার বাবা মানিক ভটচাজ পুজোআচ্চা করতেন। এখন আর নেই। মারা গিয়েছেন। মেঘলার এক বড় দাদা রয়েছে। নাম বাদল। কিন্তু বর্তমানে ও জেলে। ওয়াগন ভাঙতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। দু’বছরের জেল হয়েছে ওর। সারা দিন বাড়িতে মা আর মেয়ে থাকে। মাঝে মাঝে নিশান যায় ওদের বাড়িতে। এমনিই যায়। কারণ নেই।
ওদের ঘরে গিয়ে চৌকিতে একটু বসে। তেল-মুড়ি মাখা খায়। দু’-চারটে কথা বলে। তারপর উঠে আসে।
