“শোনো,” রুপিন বললেন, “এবার আমরা ডিপার্টমেন্টাল কিছু রদবদল করব। ম্যানেজমেন্ট চাইছে যাতে লোকজন স্ট্যাগন্যান্ট না হয়ে পড়ে! সেই জন্য তোমায় আমরা স্টোর থেকে সরিয়ে নিয়ে ফিল্ডে প্লেস করব! আমাদের ডেভেলপমেন্টের জন্য যে জমি বা বাড়ি অ্যাকোয়্যার করতে হয়, সেটার চার্জে তোমায় রাখা হবে।”
“আমায়?” একটু অবাক হল আইকা।
“হ্যাঁ, ইটস আ প্রোমোশন আইকা। ইনক্রিমেন্ট, ফেসিলিটিস, সব পাবে। প্লাস লাস্ট দু’বছর আগে তুমি তো বলেইছিলে তোমায় ফিল্ডে দিতে। এবার সেটা হয়েছে। দিনকে দিন কমপিটিশন বাড়ছে। ফলে টাফ হচ্ছে ল্যান্ড পাওয়া। কোম্পানি তোমার পারফরম্যান্সে খুশি। তাই তুমি এটা দেখো। কেমন? আমি আনঅফিশিয়ালি জানালাম। দু’দিনে ইট উইল বি অফিশিয়াল। তুমি এই দু’দিনে তোমার নেক্সট ম্যান চঞ্চলকে চার্জ বুঝিয়ে দিয়ো।”
আইকা হাসল, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। আই উইল।”
“ইউ মে টেক ইয়োর লিভ। আজ এটুকুই।”
রুপিন বাড়তি কথা খুব একটা বলেন না। আজও বললেন না। পেনটা খুলে আবার ডুবে গেলেন ফাইলে। খুব মৃদু স্বরে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল এসি-র গুঞ্জন। স্তব্ধতা।
আইকা ঘরের বাইরে এসে থমকে দাঁড়াল। আজ ওর প্রোমোশন হল। খুব ভাল খবর। কিন্তু ওর তেমন একটা ভাল লাগছে না কেন? ওর মনটা কেমন যেন সেই নেতিয়েই আছে। মনে হচ্ছে কী হবে এসব নিয়ে? কাজে ডুবে থেকে সব কিছু ভুলে যাবে ভেবেছিল, কিন্তু সেটা তো হল না। কেন হল না? কাজ কি তা হলে কিছুই ভরাট করতে পারে না?
ফ্ল্যাটের নীচে পার্কিং লটে গাড়িটা রেখে আকাশটা দেখল আইকা। সন্ধে নেমে গিয়েছে। সাড়ে ছ’টা বাজে। বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে আজ। যা ট্র্যাফিক! শহরটা আস্তে-আস্তে মজে যাওয়া, শুকিয়ে যাওয়া নদীর মতো হয়ে যাচ্ছে। সব কিছু কেমন যেন থেমে আছে। সঙ্গে কেমন একটা বিজবিজে গরম পড়তে শুরু করেছে! শীতের শেষের এই সময়টা কেমন যেন শুকনো লাগে। আইকার ঠোঁটটা টানছে বেশ।
তবে ভরসা একটাই যে, নোঈকে দেখতে লোকজন এই সবে এসেছে। পুটুমাসি ফোন করেছিল আসার পথে।
গাড়িটার পেছনের সিট থেকে খাবারের বড় প্লাস্টিকগুলো নামিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল আইকা। তারপর রিমোট টিপে লক করে দিল গাড়ি।
“দিদি।”
আইকা ঘুরে দেখল, সুশান্ত। ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার। আইকা তাকাল।
“দিদি, একটু দরকার ছিল।”
“কী?”
“শ’তিনেক টাকা লাগবে। মানে, মেয়েটাকে একটু ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাব।”
“কী হয়েছে?” আইকা উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল।
সুশান্ত ছেলেটা এই ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার। গ্যারেজ-স্পেসের পাশের একটা ঘরে থাকে। সঙ্গে ওর বউ আর বাচ্চা মেয়েও থাকে। মেয়েটা সত্যি খুব ছোট। বছরদেড়েক বয়স। ফরসা। গোলগাল। একমাথা কোঁকড়া চুল। আইকাকে খুব চেনে। দেখলেই হাত বাড়ায়। আইকার কী যে ভাল লাগে! মেয়েটাকে ‘মাগো’ নামে ডাকে আইকা। ছুটির দিনে বেশির ভাগ সময় নিজের কাছেই রাখে মাগোকে।
“জ্বর হয়েছে দিদি।”
“সে কী?” আইকা চোয়াল শক্ত করল, “তুই এখন বলছিস? কখন হয়েছে এটা?”
“বিকেলে দিদি,” সুশান্ত ঢোঁক গিলল।
“আর এখন বলছিস? মাকে বলিসনি কেন? আমায় ফোন করিসনি কেন? তোকে জুতোপেটা করতে হয় জানোয়ার!” আইকা চিৎকার করল। তারপর নিজেই দ্রুত হেঁটে গেল ওর ঘরের দিকে।
দরজাটা আলতো করে টানা ছিল। আইকা ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। মাগো শুয়ে রয়েছে বিছানায়। চোখ বন্ধ। চড়াই পাখির ডানা ঝাপটানো শব্দের মতো আলতো শ্বাস পড়ছে।
“মাগো!” হাতের প্যাকেট বিছানায় রেখে আইকা ঝুঁকে পড়ল।
মাগো ঘুমের মধ্যে চোখ খুলল আলতো। হাসল কি? তারপর নরম পালকের মতো হাতটা তুলে আইকার গালে রাখল।
আইকার জল এসে গেল চোখে। আচমকা, কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই জল এসে গেল। গলার কাছটা কেমন যেন দলা পাকিয়ে উঠল। ভীষণ টনসিলের ব্যথা গলা থেকে বুকের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ল।
মাগো চোখ বন্ধ করে ফেলল আবার। আইকা সামলাল নিজেকে। কোন বন্ধন এটা? ওর কে হয় এই একরত্তি মেয়ে? কেন এমন বুকের ভেতর গোটা সমুদ্র নড়ে ওঠে এমন আলতো হাতের ছোঁয়ায়? নিভৃতে বসে আসলে কে ছোঁয় আইকাকে?
আইকা ব্যাগটা খুলে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে তাকাল সুশান্তর দিকে। তারপর চাপা গলায় বলল, “যা এখুনি। আর ফিরে এসে জানাবি আমায় কী হল।”
লিফ্টে উঠে চোখ বন্ধ করল আইকা। গালটা এখনও শিরশির করছে! মাগোর হাতের ছোঁয়া লেগে রয়েছে। পালকের মতো হালকা, ঠান্ডা একটা স্পর্শ! গলার কাছটা ব্যথা করছে আইকার। কষ্ট হচ্ছে। খালি মনে হচ্ছে আর কতদিন এই পিঁপড়ের মতো জীবন? আর কতদিন এভাবে এক গর্ত থেকে আর-এক গর্তে দৌড়ে বেড়াবে ও? কোথায় এর শেষ! প্রতিটা দিনের শেষে কি ওর জন্য কোনওদিন এমন স্পর্শ অপেক্ষা করবে না!
শুভর মুখটা মনে পড়ল ওর। আর সঙ্গে সঙ্গে ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। শুভকে কি ও সত্যি কোনওদিন ভালবেসেছিল?
ছ’তলার করিডরে বেরিয়ে নিজেকে ঠিক করল আইকা। পুটুমাসি আর ওদের ফ্ল্যাট দুটো পাশাপাশি। কিন্তু আইকা জানে মা পুটুমাসিদের ফ্ল্যাটেই আছে।
পুটুমাসিদের ফ্ল্যাটের দরজাটা বেশ সুন্দর। কাঠের ওপর কাস্ট আয়রনের ছোট ছোট মূর্তি বসানো। দরজার ওপরে একটা ছোট্ট উইন্ড-চাইম ঝুলছে। পুটুমাসির ফেং-শুইয়ে খুব ভরসা। আসলে রাঙামেসোর ওপরে ছাড়া পুটুমাসির সব কিছুতেই ভরসা। জ্যোতিষ থেকে শুরু করে ঝাড়ফুঁক— শুনলেই হল, পুটুমাসি ছুটবে! মাকেও ট্যাঁকে করে নিয়ে যায়। রাগ হয় আইকার। মাকে বারণ করে, কিন্তু মা শোনে না। বলে, “পুটু জোর করে, কী করব!” কিন্তু আসল ব্যাপারটা অন্য বলে মনে হয়। আইকার মনে হয়, মা নিজেও ক্রমে-ক্রমে এসবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। শুধু ওর ভয়ে কিছু বলে না।
