রাধিয়া এবার মায়ের দিকে তাকাল। দেখল, মা পাথরের মূর্তি যেন। কিছুই যেন বুঝতে পারছে না, কী ঘটছে সামনে। ঠাকুরমা বসে আছে চেয়ারে। মাথা নিচু।
রাধিয়া এগিয়ে গিয়ে বাবার হাত থেকে সহজেই বেল্টটা নিয়ে নিল। তারপর বলল, “বেল্ট হাতে নিলেই সব সত্যি হয়ে যায় না। নিশান খারাপ, কেননা তোমার স্বার্থে লাগছে বলে, তাই তো! কিন্তু সে তো অনেক মানুষের কথা ভাবছে। আর তুমি নিজে কী? নিজেকে মানুষ বলে মনে হয় তোমার? আমার সঙ্গে তুমি এমন করতে পারলে? আমায় ছোটবেলায় পরি বলতে না? তাই কি আমায় চূড়ায় তুলে মূর্তির মতো করে রেখেছিলে? অচল, অপদার্থ ধরনের মানুষ করে রেখেছিলে?”
রাধিয়া ফুঁসছে! আচমকা কোথা থেকে পরি ভেঙে সারা জীবন খুঁজে যাওয়া মানুষটা বেরিয়ে এসেছে যেন! ও যেন দেখতে পাচ্ছে ওর পায়ের তলায় টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে পরি। ছড়িয়ে আছে তার ডানা। রাধিয়া বুঝতে পারছে, আর ওকে একাকী দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না এই রোদ-জল-কাদার নোংরা পৃথিবীতে! মানুষ যতদূর যায়, পরিরা যেতে পারে না ততদূর!
রাধিয়া দেখল, বাবা হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে মাটিতে। মা মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে। ঠাকুরমা শুধু তাকিয়ে আছে ওর দিকে!
রাধিয়া বলল, “আমায় আজ মারলে বাবা! নোংরা গালি দিলে! কেন? কারণ, তোমার কথা শুনিনি বলে? তোমার স্বার্থে লেগেছে বলে! এতদিন তা হলে মা’র সঙ্গে, আমার সঙ্গে যা করলে, তার কী শাস্তি হবে বাবা? লিচটা কে? প্যারাসাইটটা কে? কে অন্যের ভালবাসা আর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে? তাদের শুষে বেঁচে থাকে?”
“প্লিজ়…” বাবা হাতজোড় করে তাকাল রাধিয়ার দিকে, “প্লিজ় রাধি… আমি… প্লিজ়…”
রাধিয়া তাকাল বাবার দিকে। তারপর বলল, “মাকে বলো। আমাকে নয়। মায়ের সঙ্গে যা করেছ, তার ক্ষমা হয় কি না, সেটা মা ঠিক করবে। আমায় এসব বোলো না। মানুষ হওয়ার ইচ্ছে থাকলে জীবনের যে-কোনও অবস্থা থেকে সেই চেষ্টা শুরু করা যায়। কিন্তু তুমি মানুষ হতে পারবে কি? হাতে বেল্ট আর মনে ঘৃণা নিয়ে সেটা হওয়া কিন্তু মুশকিল!”
বাবা মাটিতে মুখ গুঁজে দিয়েছে এবার। রাধিয়া মায়ের দিকে তাকাল। দেখল, মায়ের চোখ দিয়ে জল পড়ছে টপটপ করে।
রাধিয়া মাথা নাড়ল, হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল, “এই আমাদের বাড়ি! আমাদের সংসার! সত্যি!”
কথা শেষ করে রাধিয়া হালকা পায়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। আসলে ঠিক ঘর নয়, এই জেলখানার মতো বাড়িটা থেকে আজ যেন বেরিয়ে এল ও। নিজেকে হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে কত বছরের পুরনো পাথর যেন সরে গিয়েছে। যেন খুলে গিয়েছে কত বন্ধমুখ নদী। আজ আকাশে ভেসে যেতে পারে ও। স্রোত হতে পারে নদীতে। জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বনটা খুঁজে পেয়েছে ও। রাধিয়া বুঝল আসলে মানুষও পরির মতো উড়তে পারে। যেখানে খুশি হারিয়ে যেতে পারে। ছুঁয়ে দিতে পারে আকাশের সর্বোচ্চ বিন্দু। তবে তার জন্য ডানার দরকার হয় না। যেটা দরকার হয়, সেটাই ও খুঁজে পেয়েছে আজ। আজ রাধিয়া খুঁজে পেয়েছে আত্মবিশ্বাস। সত্যি কথা বলার, সত্যিকে সামনে থেকে দেখার সাহস!
ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে একবার পেছনে ঘুরল রাধিয়া। দেখল, মায়ের সামনে নতজানু হয়ে বসে রয়েছে সুপ্রতীক মালিক! ওর বাবা!
.
৩৬. আইকা
I will be home for Christmas
You can plan on me
Please have snow and mistletoe
And presents on the tree
Christmas Eve will find me
Where the love light gleams
I’ll be home for Christmas
If only in my dreams…
গানটা বাজছে। নিচু স্বরে ভরাট গলায় গানটা বেজেই চলেছে। বড়দিনের রাত গভীর হচ্ছে ক্রমশ। ওদের পাড়াটা নিঝুম হয়ে আসছে। দূরে টিভি চলছে কোথাও। মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক ছিটকে আসছে এখান-ওখান থেকে। জানলার পাশে বসে সামনের শূন্য রাস্তা আর দু’পাশের নির্জন পাতাহীন গাছেদের দেখছে আইকা!
শীত এক অদ্ভুত সময়। সব কিছু ঝরিয়ে, হারিয়ে পৃথিবীকে শূন্য করে দেওয়ার সময়। শীত মানুষকে বোঝায় কোনও কিছুই স্থায়ী নয়। যা তোমার আছে, তা ক্ষণিকের জন্য আছে। হাতের মুঠো শক্ত করে রাখলেও তুমি তাকে কিছুতেই চিরদিন ধরে রাখতে পারবে না। সে ছেড়ে যাবেই। চলে যাবেই। শূন্য হবেই সব। এ খেলা ভাঙবেই একদিন। শীত খেলা ভাঙার সময়। মানুষকে একা করে দেওয়ার সময়!
আজ ঠান্ডা পড়েছে বেশ। ঠান্ডায় আইকার কষ্ট হয়। ছোট থেকেই শীতকাতুরে ও। সেই যাদবপুরের বাড়ির কথা আজ আবার মনে পড়ছে আইকার। সেই ছোট ড্যাম্প ঘর। চৌকি। ফাটল মেঝে দিয়ে বেরিয়ে আসা বিছে। শীত খুব ভয়ের সময় ছিল ওর কাছে। পাশেই পুকুর ছিল একটা। ভাঙা জানলার পাল্লা দিয়ে রাতে ঠান্ডা ভেজা হাওয়া আসত। মা খবরের কাগজ কেটে আটকে রাখত সেই ভাঙা জানলার গায়ে। মা নিজে শুত সেই জানলার দিকটায়। আর কম্বলের তলায় মায়ের গায়ের ওম নিয়ে শুয়ে থাকত আইকা। মনে হত পৃথিবীতে এর চেয়ে সুরক্ষিত জায়গা আর নেই।
এই ফ্ল্যাটটা বড়। মায়ের নিজের ঘর আছে এখানে। সে ঘরে বিছানার পাশে কাচের জানলা। সামনে ঝোলানো বড় ভারী পরদা। মোটা লেপ। মা ওখানে ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু আইকার আজ ইচ্ছে করছে মায়ের কাছে শুতে। আবার সেই ছোটবেলার মতো মায়ের কোল ঘেঁষে, মায়ের ওম নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে।
