রাধিয়া তাকাল এবার। দেখল, নিশানও তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
নিশান বলল, “আমি তোমাকে ভালবাসি, তাই কষ্ট দিতে চাই না। আমি যোগাযোগ করলে তোমার বাড়িতে অশান্তি হয়। প্লাস আমাদের স্টেটাসে অনেক অমিল। তোমার বাবা আমায় সহ্য করতে পারেন না। আমার জন্য তোমায় কষ্টই পেতে হবে। তাই আমি…”
“তোমায় কে ভাবতে বলেছে এত কথা! কেন ভাবছ? আমার তোমায় ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয়। সেটা ভাবলে না! যেটা আসল সেটা না ভেবে এসব কী বাজে কথা নিয়ে পড়ে আছ তুমি!”
“বাজে নয়,” নিশান সিরিয়াস মুখ করে তাকাল এবার। বলল, “আমি চাই না তোমায় কষ্ট দিতে। চাই না তোমার মনখারাপ হোক! প্লিজ় আন্ডারস্ট্যান্ড! তাই তো… তাই তো…” নিশান যেন নিজেকে অনেক কষ্টে আটকাল।
রাধিয়া তাকাল নিশানের দিকে, “তাই আমার বাবার সম্বন্ধে খবর পেয়েও আমায় দাওনি, তাই না!”
নিশান মাথা নামিয়ে নিল। রাধিয়া নিশানের থুতনিটা ধরে মুখটা তুলল। কাটা-কাটা স্বরে বলল, “আমায় বলো! আমার জানা দরকার। আমায় যদি সত্যি ভালবাসো, তা হলে আমায় বলো তুমি!”
পরির গায়ে হাজার দাগের ফাটল। ডানা খুলে পড়ে যাচ্ছে। পায়ের তলার মাটি আলগা খুব। বাবার সেই ছোট্টবেলার পরি আজ টলমল করছে।
কোনওমতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল রাধিয়া। নন্দন থেকে গাড়িতে করে বাড়ির সামনে অবধি নিশান এসেছিল। তাই হয়তো আসতে পেরেছে ও। না হলে আসতে পারত না! এটা কী শুনল ও! এও সম্ভব! বাবা এমন! কিন্তু ওরা আগে কেউ জানতে পারেনি! মা-ও জানতে পারেনি! কিন্তু মায়ের তো জানা উচিত! ও আর ভাবতে পারছে না! নিজের বাবা-মাকে নিয়ে কেউ এসব ভাবতে পারে!
নিশান ওকে বাড়ির গেট অবধি এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, “জোর করে এসব না শুনলেই পারতে। কী হবে শুনে! আমাদের বাবা-মায়েরাও তো মানুষ। তাদেরও নিজের জীবন আর ইচ্ছে থাকে। সন্তান হওয়া মানেই তো দাসখত লিখে দেয়নি কেউ। তাই না!”
নিশান হয়তো ঠিকই বলছিল, কিন্তু রাধিয়ার মাথায় কিছু ঢুকছিল না। এখনও ঢুকছে না। এই বাড়ি-ঘর সব কেমন যেন লাগছে ওর! ও নিজের ঘরে যাবে বলে কোনওমতে বসার ঘরের পাশ দিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে গেল। এখন কারও সঙ্গে কথা বলবে না ও, কথা বলতে পারবে না। আলো নিভিয়ে শুয়ে থাকবে শুধু।
“রাধি!” আচমকা চিৎকার করে বাবা বেরিয়ে এল বসার ঘরের দরজা দিয়ে। তারপর কোনও কথা না বলে রাধিয়ার হাত ধরে এক টানে ওকে নিয়ে এল ঘরের মধ্যে। রাধিয়া থতমত খেয়ে গেল। শরীর এমনিতেই দুর্বল লাগছে। তাই টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল একটা সোফার ওপর।
“হাউ ডেয়ার ইউ! তুই ওই শুয়োরটার সঙ্গে এসেছিস বাড়ি অবধি! আমি কলকাতায় ছিলাম না ভেবে যা খুশি তাই করবি? জানোয়ার! আজ তোর একদিন কি আমার একদিন! আমি তোকে বলেছিলাম না, যাবি না। মিশবি না। জানিস না, ও একটা লিচ! একটা প্যারাসাইট! আমাদের কাজকে সাবোটাজ করছে! তা হলে! কেন গেছিলি! ইউ ডার্টি হোর! খুব রস হয়েছে! এই বয়সেই ছেলে চাই! আজ তোকে…” বাবা আচমকা কোমর থেকে বেল্ট খুলে নিল। চিৎকার করে বলল, “আজ তোকে দেখাব আমার কথা না শোনার ফল! আজ…”
বাবা পায়ে-পায়ে এগিয়ে এল সামনে!
“বুম্বা!” পেছন থেকে আসা ঠাকুরমার গলার স্বরে বাবা থমকে গেল, “কী করছিস কী তুই! এত বড় মেয়েকে এভাবে কেউ মারতে যায়! কী করছিস কী? আর বউমা, তুমি দাঁড়িয়ে দেখছ! মেয়েটাকে মেরে ফেলবে, চাও!”
ঠাকুরমা এসে দাঁড়াল রাধিয়া আর বাবার মাঝখানে, “অমানুষ হয়ে গেছিস!”
বাবা রাগে লাল হয়ে গিয়েছে। হাতের বেল্টটা পাশে রাখা একটা চেয়ারে আছড়ে বলল, “শি ইজ় আ বিচ! আ ডার্টি হোর! ওর নোংরা ছেলে পছন্দ! আমাদের শত্রুর সঙ্গে পিরিত করছে! বাইরে বেরোতে তোকে বারণ করেছিলাম না! আজ তোকে শেষ করে ফেলব আমি… আজ তোর একদিন কি আমার একদিন! আজ…”
বাবা ঠাকুরমাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে এল এবার! ভয়ের চোটে কুঁকড়ে গেল রাধিয়া। বাবা বেল্টটা চালাল! সপাং করে রাধিয়ার কোমরের কাছে এসে লাগল ওটা। চড়াৎ করে শব্দ হল একটা। শাড়ির ওপর দিয়ে লাগলেও রাধিয়ার মনে হল শরীরের চামড়া ফেটে গেল একদম। একটা তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা ওর এতক্ষণের নিস্তব্ধতাকে এক ধাক্কায় টুকরো-টুকরো করে দিল। শরীরের আগেও মনের যন্ত্রণাটা এবার বোমার মতো ফেটে পড়ল যেন।
রাধিয়া চিৎকার করে উঠল, “বাবা!”
বাবা এই চিৎকারে থমকে গেল এবার!
রাধিয়া শরীরের সব জড়তা কাটিয়ে উঠে দাঁড়াল এবার। আচমকা একটা রাগ দলা পাকাচ্ছে ওর শরীরে। মনে হচ্ছে এবার ফেটে পড়বে বোমার মতো। ও বুঝতে পারছে পরির খোলস ভেঙে পড়ছে। ডানা খসে গেছে। বুঝতে পারছে পায়ের তলার বাঁধন আরও আলগা এখন।
রাধিয়া সোজা তাকাল বাবার দিকে। তারপর তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “তুমি কেন আমাদের মিথ্যে বলো যে, অফিসের ট্যুরে যাচ্ছ? আসলে তো বাচ্চা ছেলেদের সঙ্গে রাত কাটাতে যাও! একজন মহিলা আছে। শানায়া দত্তা। সে তোমায় আঠারো-উনিশ বছরের ছেলে সাপ্লাই করে! তাদের নিয়ে তো তুমি… তুমি… ছিঃ বাবা, ছিঃ!”
বাবা কী বলবে বুঝতে পারল না হাতের বেল্টটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল!
রাধিয়া এগিয়ে গেল বাবার দিকে এবার। চোয়াল শক্ত করে বলল, “এবারও গিয়েছিলে। শঙ্করপুরে ছিলে দু’রাত। সঙ্গে দুটো ছেলে ছিল। একজনের নাম প্রাণেশ আর-একজনের নাম মোহিত। দু’জনেই ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। কোথায় থাকে সেটাও কি বলব!”
