আইকা সামনে রাখা ডিজিটাল টেব্ল ক্লকটা দেখল। রাত সাড়ে দশটা বাজে। মা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। ঘুমের ওষুধ খায় একটা করে, তাই আইকাই বলে দেরি না করতে। কিন্তু আইকার ঘুম আসে না। এমনিতেই আজ বড়দিন। তারপর কাল রবিবার। তবে এখন থেকে তো ওর সবটাই রবিবার। কারণ, আর তো অফিস নেই ওর। গতকাল ই-মেলে রেজ়িগনেশন পাঠিয়ে দিয়েছে।
রুপিন নেই, গুজরাত গিয়েছেন নিজের বাড়িতে। আবার নিউ ইয়ারে ফিরবেন। কিন্তু ততদিন অবধি আর অপেক্ষা করেনি আইকা। গত পরশু রুপিন বেরিয়ে গেছিলেন আর গতকালই নিজের কাজ ছাড়ার কথা ও ই-মেলে জানিয়ে দিয়েছে রুপিনকে। রুপিন নিশ্চয় পেয়েছেন চিঠিটা। কিন্তু এখনও কোনও রিপ্লাই করেননি। ফোন করেননি। আইকাকে জিজ্ঞেস করেননি কিছু। রুপিন নিশ্চয় রেগে আছেন। সোমবার দিনই হয়তো রেজ়িগনেশন লেটার যে অ্যাকসেপ্ট করে নেওয়া হয়েছে, সেটা জানিয়ে দেওয়া হবে। রুপিনের সামনে হয়তো আর যেতে হবে না আইকাকে।
আইকা চোয়াল শক্ত করল। ছেলেরা সব একরকম হয়। নিজেদের ইচ্ছে ছাড়া, মতলব ছাড়া আর কিছু বোঝে না। ও আজও কেমন বোকা রয়ে গেল। আজও মানুষকে চিনতে পারল না। আজও সব কথাই ও ফেসভ্যালুতে নেয়। নিজের বোকামির জন্য নিজের গালেই থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করে আইকার। কী করে এমন ভুলটা করল ও!
মাকে সেই চোখের ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার কিছুদিন পরে রুপিন এক বিকেলে, ছুটির পরে আইকাকে ডেকেছিলেন নিজের ঘরে। আইকা তখন বেরিয়ে যাচ্ছিল অফিস থেকে। এমন সময় ডাক পেয়ে কিছুটা অবাকই হয়েছিল আইকা! আর সত্যি বলতে কী, মনে মনে একটু বিরক্তও হয়েছিল। তাও গিয়েছিল ঘরে।
রুপিন দাঁড়িয়ে ছিলেন জানলার কাছে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আইকা নক করে ঘরে ঢোকার পরে রুপিন বসতে বলেছিলেন ওকে। তারপর হেসে বলেছিলেন, “তোমার শো কজ়ের রিপ্লাই আমি পেয়েছি!”
“এই জন্য ডাকলেন!”
“না, না,” হেসেছিলেন রুপিন, “আমি কিছুদিন আগে বলেছিলাম না যে, আই নিড আ হেল্প! সেই জন্য ডেকেছি।”
হ্যাঁ, তাই তো! আইকার মনে পড়েছিল। সেই যেদিন ও অফিসে রাগারাগি করল, সেদিন রুপিন তো বলেছিলেন, কী একটা হেল্প লাগবে।
আইকা বলেছিল, “ও হ্যাঁ। আই রিমেমবার।”
রুপিন সময় নিয়েছিলেন একটু। তারপর বলেছিলেন, “আমরা তিন ভাই। আয়্যাম দ্য এল্ডেস্ট। আমার ছোট ভাইয়ের মেয়ে, রেণুকা, এই ডিসেম্বরের সাতাশ তারিখ এক বছরে পড়বে। আমি ওকে কিছু দিতে চাই, লাইক গোল্ড। বাট আই ডোন্ট নো এনিথিং আবাউট গোল্ড অর অরনামেন্টস। আমি জানি, আয়্যাম আস্কিং টু মাচ। বাট কুড ইউ হেল্প মি ওয়ান লাস্ট টাইম! প্লিজ়!”
আইকার হাসি পেয়েছিল রুপিনকে দেখে। অন্য বসেরা হুকুম করে নিজেদের কাজকর্ম করিয়ে নেয় অধস্তনদের দিয়ে। সেখানে রুপিন এমন করে বলেন যেন আইকা উলটে বকুনি দেবে!
আইকা হেসে বলেছিল, “হ্যাঁ, শিয়োর। এতে না করার কী আছে! কবে যাবেন?”
“নেক্সট সানডে! আর…” রুপিন আবার থমকেছিলেন। কিছু একটা যে বলতে চাইছিলেন সেটা বুঝতে পারছিল আইকা।
ও বলেছিল, “বলুন।”
রুপিন হেসে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বলেছিলেন, “নাঃ, সানডে বলব। সানডে। আবাউট ফোর ইন দ্য আফটারনুন! ঠিক হবে তো? কোথায় সেটা আমি জানাব তোমায়।”
রবিবার ঠিক চারটের সময় বালিগঞ্জ ফাঁড়ির আগে একটা বড় সোনার দোকানের সামনে পৌঁছে গেছিল আইকা। সেদিন সকালেই রুপিন জানিয়ে দিয়েছিলেন কোথায় দেখা করতে হবে।
দোকানটা বড়। সামনের দিকটা ঘষা কাচের। সেখানেই দরজা ঠেলে ঢুকেছিল ওরা।
আইকা কিছু বলার আগেই রুপিন বলেছিলেন, “আমার বাজেট ধরো এক লাখ। মানে, এর কমে তো আর ভাল কিছু হয় না। এতেও হয়তো হয় না। কিন্তু তাও…”
বেশি সময় নেয়নি আইকা। মিনিট পনেরোর মধ্যেই একটা হার পছন্দ করে দিয়েছিল। বলেছিল, “এক বছরের বাচ্চা তো, কিন্তু এটা সারা জীবন রাখতে পারবে। তাই না?”
হারটা খুব পছন্দ হয়েছিল রুপিনের। বলেছিলেন, “এই জন্য তোমায় বলি। ইউ আর ফ্যান্টাসটিক!”
দোকানের বাইরে এসে আইকা নিজের গাড়ির কাছে গিয়েছিল। রুপিন পেছন-পেছন গিয়েছিলেন ওর। বলেছিলেন, “আই নিড টু টক টু ইউ! একটা রেস্টুরেন্টে বসি? আমার গাড়িটা থাক এখানে। আমি কি তোমার গাড়িতে আসতে পারি!”
আইকা অবাক হয়েছিল। রুপিন এমন তো আগে বলেননি! কিছু কি সমস্যা হয়েছে! ও গাড়িতে উঠে পাশের দরজাটা খুলে দিয়েছিল। রুপিন যে রেস্তরাঁর কথা বলেছিলেন, সেটা কাছেই।
গাড়িটা রেস্তরাঁর পাশে রেখে ওরা ঢুকেছিল ভেতরে। সার দেওয়া চেয়ার-টেবল। অধিকাংশই ফাঁকা। একপাশে বার। দেখেই বোঝা যায় পুরনো কলকাতার ছাপ এখানে রয়ে গেছে। রুপিন সবার কাছ থেকে সরে একটা কোণের দিকে বসেছিলেন।
আইকার খাবার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু বাধ্য হয়ে সামান্য স্ন্যাক্স বলেছিল। রুপিনকে দেখে বেশ অবাক লাগছিল ওর। কান লাল হয়ে আছে মানুষটার। বারবার মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁচাপাকা চুলগুলো ঠিক করছিলেন! জর্জ ক্লুনি এত চিন্তিত কেন, সেটা বুঝতে পারছিল না আইকা!
আইকা একচুমুক জল খেয়ে সামনে রাখা টিসু দিয়ে চেপে-চেপে ঠোঁটটা মুছে বলেছিল, “বলুন স্যার!”
“রুপিন, ইউ মে কল মি রুপিন। আমরা অফিসে নেই। প্রোটোকল মেনটেন করতে হবে না।”
