“হাই!” পাশ থেকে নিশানের গলা পেল এবার। রাধিয়া ঘুরে তাকাল।
নিশান ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল নোঈকে। তারপর চোখের ইশারায় রাধিয়াকে সরে আসতে বলল।
রাধিয়া ওর সঙ্গে আরও কিছুটা এগিয়ে গেল। নিশান দেখল একবার। না, এখান থেকে আর নোঈকে দেখা যাচ্ছে না। রাধিয়া অবাক হল। ওর মাসতুতো না কী যেন বোন হয় না?
নিশান বোধহয় বুঝতে পারল রাধিয়ার মনের কথা। বলল, “নোঈর এক্স বয়ফ্রেন্ড ওই ছেলেটা। আজ দেখা করতে এসেছে। জয় নাম। ওদের সামনে তাই আর গেলাম না। আগে আমার দেখা হয়েছে ওর সঙ্গে। আমাদের ওর সামনে যাওয়া উচিত নয়।”
“উচিত নয়?” রাধিয়া তাকাল নিশানের দিকে।
নিশান পাশের একটা গাছের গায়ে হাত দিয়ে পা-টা ক্রস করে দাঁড়াল। নীল পাঞ্জাবির ওপর হাতকাটা সাদা রঙের জহরকোট পরে এসেছে আজ নিশান। গালের দাড়িটাও সুন্দর করে কাটা। অদ্ভুত ঠান্ডা আর মিষ্টি গন্ধের একটা পারফিউমও মেখেছে। পায়ের জুতোটাও নতুন। এমন সাজগোজ করতে নিশানকে ও দেখেনি কোনওদিন। কাটা-কাটা চোখমুখে একটা শান্ত ভাব। রাধিয়া দেখেছে আশপাশের কয়েকটা মেয়ে ঘুরে-ঘুরে দেখছে নিশানকে। বিরক্ত লাগছে রাধিয়ার। কী অসভ্য সব মেয়েগুলো! এভাবে দেখার কী আছে! বুকের ভেতর ওর পিঁপড়ে কামড়াচ্ছে যেন। কিন্তু নিশানের হাসি-হাসি মুখ দেখে তো বোঝা যাচ্ছে যে, ও ব্যাপারটায় মজা পাচ্ছে বেশ। ছেলেরা কি এমনই হয়? নির্লজ্জ? ফ্লার্ট করেই তাদের আনন্দ! মেয়েদের মতো ভাল কেন বাসতে পারে না ছেলেরা! শুধু নিজেদের দর যাচাই করাই কি ওদের কাজ! নিশান ওর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে কেন? রাধিয়ার মনে হল নিশানের পিঠে একটা কিল বসিয়ে দেয়। এই ছেলের নিশ্চয় অনেক মেয়েবন্ধু। ফলসা তো বলেছে নিশানের নাকি হেভি ডিমান্ড। ডিমান্ড! ছিঃ, কেমন চিপ লাগে শুনলে। কিন্তু নিশানের নিশ্চয় খুব আরাম হয় এসব শুনে। ডিমান্ড! পেট্রল নাকি? মানুষ কত সহজে নিজেকে কমোডিটি করে দিতে পারে! কেন এসেছে ও এখানে নিশানের সঙ্গে কথা বলতে! এমন ছেলে ওর খবর নেয় না বলে কেন হেদিয়ে মরছে ও! মায়ের কাছে মিথ্যে বলে, জয়তীকে অনুরোধ করে কীসের জন্য রাস্তায় বেরিয়েছে! কীসের জন্য দাঁড়িয়েছে এখানে! বাবা সাতটার মধ্যে ফিরবে। তার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হবে। না হলে আবার অশান্তি হবে। কেন এসব অশান্তি নেবে ও! কার জন্য! এই সামনের ছেলেটার জন্য! যে ও মরল কি বাঁচল তার খবর রাখে না!
আচমকা মনের ভেতরটা কেমন হয়ে গেল রাধিয়ার। ও বলল, “ওকে বাই। আমি আসছি!”
নিশান সোজা হয়ে দাঁড়াল, “আরে!”
রাধিয়া চোয়াল শক্ত করে বলল, “হ্যাঁ, আমি বাড়ি যাব।”
নিশান এগিয়ে এল এক পা। তারপর আচমকা হাতটা ধরল ওর, “কী হয়েছে রাধি… ইয়ে রাধিয়া!”
রাধিয়া মুখ নামিয়ে নিল। কোনও কারণ ছাড়াই আচমকা চোখে জল এসে গেল ওর। নিশানের হাতটা গরম। ওর ঠান্ডা আঙুলগুলোর যেন ইচ্ছে হল সেই উত্তাপের সমস্তটাই শুষে নেয় শরীরের মধ্যে।
নিশান নরম গলায় বলল, “তোমার জ্বর হয়েছিল কয়েকদিন আগে। বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলটাও কেটে গিয়েছিল। এর মাঝে দুটো গল্পের বই তুমি পড়েছ। দু’রাত না খেয়ে থেকেছ। আর… আর… আর তোমার মায়ের জন্মদিন ছিল চারদিন আগে। ঠিক না?”
রাধিয়া চমকে উঠে তাকিয়ে রইল নিশানের দিকে। ভুলে গেল চোখের কোণে এখনও জল চিকচিক করছে। কী করে এসব জানল নিশান! এসব তো ওর জানার কথা নয়। সেদিনের পর থেকে তো আর যোগাযোগই নেই! তা হলে! কী বলবে বুঝে পেল না রাধিয়া।
নিশান পকেট থেকে রুমাল বের করল একটা। তারপর আরও কাছে সরে এসে আলতো হাতে চেপে-চেপে চোখটা মুছিয়ে দিল রাধিয়ার। রাধিয়া ভুলে গেল আশপাশে লোকজন আছে। ভুলে গেল, তারা ওকে দেখছে। ও নিশানের হাতটা চেপে ধরল ওর গালে। অস্ফুটে শুধু বলল, “কেন? কেন?”
নিশান হাসল। তারপর নরম গলায় ফিসফিস করে বলল, “ভালবাসি তো, তাই…”
“মিথ্যে কথা!” ভাল লাগায়, অভিমানে গলা ভারী হয়ে এল রাধিয়ার, “সব মিথ্যে। আমার খবর নাওনি তুমি। আমি মরে গেছি কি বেঁচে আছি, জানতে চাওনি। যা বলেছে বাবা বলেছে। আমি কি বলেছি? আমি তো তোমার কাছে থাকতে চেয়েছি। কিন্তু তুমি… তুমি চেয়েছ আমার ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করতে। আমি কি জানি না? আমি জানি। আমাদের বাড়ি গিয়েছিলে তুমি। ঠাকুমা তো যার-তার সঙ্গে দেখা করে না। সোনাঝুরির আন্দোলন নিয়ে তুমি দেখা করতে গিয়েছিলে। আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছ ওখানে পৌঁছতে। আমার জন্য মোটেও নয়। কোনওদিনও নয়… আমি জানি…”
“তাই? তা হলে জয়তীর কাছ থেকে আমি নিয়মিত কেন খবর রাখতাম তোমার? কেন জানতে চেয়েছি তুমি কী করছ? কেমন আছ?”
“জয়তী!” রাধিয়া অবাক হয়ে মুখ তুলল। দেখল, ঠান্ডা হাওয়ায় নিশানের মাথার চুলগুলো উড়ছে অদ্ভুতভাবে!
“না হলে এসব জানলাম কী করে! ওকে আমি বলতে বারণ করেছিলাম, আজ যে ওদের বাড়ি গিয়েছিলে তাও আমি জানি,” নিশান হাসল।
রাধিয়া তাও বলল, “মিথ্যে কথা… আমার ঠাকুরমার জন্য, ওঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য…”
“না রাধি,” নিশান রাধিয়ার হাতটা চেপে ধরল জোরে, “আমি তোমায় ভালবাসি। তাই তো যাইনি ওঁর কাছে। অফিসে পিটিশন জমা দিয়েছি। কিন্তু নিজে যাইনি। গেলে তো তুমি ভাবতে তোমায় ব্যবহার করছি। আমরা সোনাঝুরিকে বাঁচাব। বেলাগাম বাড়িঘর করে সব ধ্বংস করতে দেব না। কিন্তু তার মানে এই নয়, তার জন্য তোমায় ব্যবহার করব!”
