সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে ওই ওপরে দরজার কাছে দাঁড়ানো জয়তীকে দেখে খুব ভাল লাগছিল ওর। কতদিন পরে কেউ ওকে সুন্দর করে বুঝিয়ে কথা বলল! ওর পাশে দাঁড়াল!
মনটা কেমন যেন নরম হয়ে আসছিল। মোবাইলে গাড়ি বুক করে নিয়েছিল জয়তীদের বাড়িতে থাকতেই। কিন্তু গাড়িতে উঠেও জয়তীদের বাড়িতে থেকে যেতে ইচ্ছে করছিল! কী আর হবে— ভেবে নিজেকে আবার কেমন যেন গুটিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু তারপরেই আবার সচেতন হয়ে নিজেকে ঠিক করেছিল রাধিয়া। ওর এই নরম হয়ে যাওয়াটাই লোকে ভুল ভাবে নেয়। ওকে দুর্বল ভাবে। নিশানকে আজ ছাড়বে না ও কিছুতেই। মানুষের ভরসা নিয়ে, ইমোশন খেলা করাটা আজকাল যেন একটা ফ্যাশন হয়ে গিয়েছে সবার। এটাকে ওর সঙ্গে হতে দেবে না আর।
ক্যাথিড্রাল রোড দিয়ে গাড়িটা এগোচ্ছে। ডান দিকে ভিক্টোরিয়ার ইস্ট গেট। বাঁ দিকে বড় ক্যাথিড্রাল। আজ বড়দিন। রাস্তায় লোক থিকথিক করছে। ক্যাথিড্রালের সামনে গেট করা হয়েছে। আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে সুন্দর করে। মানুষজনের সারি-সারি হাসি মুখ! এটা ভাল লাগে রাধিয়ার। পৃথিবীতে এত কিছু ভয়াবহ আর কষ্টের ব্যাপার ঘটে চলছে, তাও মানুষ কিন্তু সামান্য সুযোগ পেলেই সব ভুলে আনন্দ করতে চায়। এটাই বোধহয় মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রবণতা। তা হলে মানুষ এমন কাজ কেন করে, যাতে তার আর আশপাশের সবার কষ্ট বাড়তেই থাকে! নাকি মানুষ নিজের আনন্দটাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্যের কথা ভুলে যায়! তা হলে কি আনন্দ আর কষ্ট আলাদা কিছু নয়! দুটোর মধ্যের বিভাজন রেখা কি তবে অস্পষ্ট! একটা কি আর-একটার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত!
রাধিয়ার প্রশ্ন প্রচুর, কিন্তু উত্তরগুলো যেন সব স্পষ্ট নয়। ঠাকুরমার কাছে মাঝে মাঝে এইসব নিয়ে প্রশ্ন করে রাধিয়া। ঠাকুরমা সাধ্যমতো উত্তর দেয়। কিন্তু সোনাঝুরির ওই জুট মিল, জায়গা আর বাড়ি বিক্রি নিয়ে ঠাকুরমা কয়েকমাস যাবৎ খুব অন্যমনস্ক হয়ে আছে। চাপাগলায় দু’-একবার বাবার সঙ্গে ঠাকুরমার এই নিয়ে অশান্তি হতেও শুনেছে ও। তবে কী কথা হয়েছে, শোনেনি। রাধিয়ার সামনে বাবা, ঠাকুরমার সঙ্গে এই নিয়ে কিছু বলে না। ঠাকুরমাও, ও দেখেছে বাবার ব্যাপারে মাথা গলায় না। ছেলে বড় হয়ে গেছে বলে বাবার সংসারের কিছুতেই থাকে না।
শুধু সেদিন রেস্তরাঁ থেকে ফেরার পরে বাবা যখন খুব চিৎকার করছিল, ঠাকুরমা ওপর থেকে নেমে এসে বলেছিল, “রাধি, আমার কাছে চলে আয়!”
সেদিন রাতে ঠাকুরমার কাছেই ছিল রাধি। চিরকাল ঠাকুরমাকে গম্ভীর, কম-কথা-বলা মানুষ হিসেবে দেখেছে রাধিয়া। মাঝে মাঝে অফিস যাওয়া ছাড়া অধিকাংশ সময় বাড়িতে, নিজের মনেই থাকতে দেখেছে। শুধু সেদিন দেখেছিল অনেক রাত অবধি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল ঠাকুরমা। নরম গলায় বলেছিল, “যার জন্য এমন কষ্ট পাচ্ছিস, সে কি জানে?”
ঠাকুরমার ছোটবেলার কথা কিছু জানে না রাধিয়া। ঠাকুরমাই বলে না। জিজ্ঞেস করলে বলে, “আমি আর অতীত নিয়ে ভাবি না।”
তবে মাঝে মাঝে নিজের বাবার কথা বলে। ঠাকুরমার বাবা পুলিশ ছিল। সেটা জানে ও। খুব শান্ত আর নরম মনের মানুষ ছিল। ঠাকুরমার ঘরে ছবি দেখেছে রাধিয়া। আর কারও কোনও ছবি ও দেখেনি। বাবা ছাড়া আর কারও কথা ঠাকুরমা বলে না। শুধু শুনেছে, কানাডায় ঠাকুরমার এক ভাই থাকে। ঠাকুরমা বলে, “খুব ভাল ছেলে ছিল টেটু!”
কেউ জানে না কারও কথা! এই পৃথিবী এক ‘সলিটারি প্রিজ়ন’! ও শুধু বলেছিল, “তুমি বুঝবে না ঠাকুমা! ইটস কমপ্লিকেটেড! যদি কাউকে ভালবাসতে, তা হলে বুঝতে!”
ঠাকুরমা তাকিয়েছিল ওর দিকে। নরম হলুদ টেব্ল ল্যাম্প জ্বলছিল ঘরে। তার ওপরে ঢাকা দেওয়া ঝালরকাটা নকশার আলোছায়া ছড়িয়ে ছিল দেওয়ালে। রাধিয়া দেখেছিল, ওর কথা শুনে ঠাকুরমা যেন কিছু বলতে গিয়েছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত আর বলেনি। রাধিয়া মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি কী বলতে চাইছিলে?”
ঠাকুরমা বলেছিল, “কিছু না রে। আমার আর কিছু বলার নেই!”
আজও পরিটাকে যতক্ষণ পারা যায় দেখল রাধিয়া। রোদে ভিজে আছে বলেই কি ওই ডানা নিয়ে উড়ে যেতে পারে না! ওর মনে হল, আচ্ছা পরিটা কি ওকে দেখতে পেল?
নন্দনের সামনে গাড়িটাকে ভাড়া মিটিয়ে ছেড়ে দিল রাধিয়া। বেশ ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। এখানেও ভিড় খুব। ও ধীর পায়ে সামনের দিকে এগোল। লোকজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে রয়েছে! এখানে এলে কতরকমের যে মানুষ দেখা যায়! তার ওপর আজ উৎসবের দিন বলে লোকজন আরও বেশি। সিনেমা হলের সামনে বেশ ভিড়। গাছের গোড়ার বাঁধানো বসার জায়গায় বসে আছে ছেলেমেয়েরা। এই ভিড়ে কীভাবে খুঁজবে নিশানকে! রাগের মাথায় টেক্সট তো করে দিয়েছে, কিন্তু এটা বলেনি কোথায় দাঁড়াবে।
হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে একটা চেনা মুখ দেখতে পেল রাধিয়া। আরে, সেই মেয়েটা না! সেই সুন্দর দেখতে, চশমা পরা মেয়েটা! কপালে অনুস্বরের মতো করে টিপ পরে। ঝকঝকে হাসি। সেই পাগল-পাগল স্মরণ বলে ছেলেটা থাকে সঙ্গে। কলেজ স্ট্রিটে দেখা হয়েছিল। মেয়েটাকে দেখে এক মুহূর্ত কেমন যেন থমকে গেল রাধিয়া। কী হয়েছে মেয়েটার? এমন গোমড়ামুখ কেন? সামনে দাঁড়ানো একটা ছেলে। চাপ দাড়ি। ছেলেটা কিছু বলছে। আর মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। দেখেই রাধিয়া বুঝল যে, কিছু একটা হয়েছে। রাধিয়া তাই আর সামনে এগোল না। কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে ঢোকা ঠিক নয়। তাও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল রাধিয়া। মেয়েটার নাম যেন কী… ও, নোঈ! মেয়েটার মুখটা এমন গম্ভীর কেন? ছেলেটাকে আবার ভাল করে দেখল রাধিয়া। প্রাণপণে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে ছেলেটা। মাঝে মাঝে হাতজোড় করে কিছু বলার চেষ্টাও করছে। কিন্তু নোঈ মাথা নামিয়ে গম্ভীর হয়ে আছে। কী যে ব্যাপার বুঝল না রাধিয়া।
