“আমি গাড়ি বুক করে নেব মোবাইল থেকে। আমায় কী ভাবো মা? কী ভাবো আমায়?” রাগে ছটফট করে উঠেছিল রাধিয়া, “একটা দিন। আমি নিশানের সঙ্গে দেখা করব না, হয়েছে? এমন কোরো না সবাই মিলে! আমি মরে যাব এবার!”
মা আর কথা বাড়ায়নি। শুধু বলেছিল, “তোর বাবা এখন নেই। আজ সন্ধেবেলা ফিরবে। তারপর আমরা ক্লাবে যাব। তার আগে ঢুকে পড়বি কিন্তু!”
বাবা গতপরশু আবার বাইরে গিয়েছে। বাবা বাইরে গেলেই কেমন একটা লাগে রাধিয়ার। কেমন একটা মনখারাপ হয়। কষ্ট হয় বুকের মধ্যে। মায়ের জন্য খারাপও লাগে। মনে হয় মায়ের কাছে গোটা ব্যাপারটা লুকিয়ে ও খুব খারাপ কাজ করছে। কিন্তু আসল কথাটা যতক্ষণ না ও নিজে ঠিকঠাকমতো জানতে পারছে, ততক্ষণ তো কিছু বলতেও পারছে না। এখন এমনি বললে মা পাত্তাই দেবে না। মা অন্ধের মতো বিশ্বাস করে বাবাকে। কিন্তু তাও ওর অপরাধবোধ হয়। মনে হয়, বাবা যে ওদের মিথ্যে বলছে সেটা ওর লুকিয়ে রাখা উচিত হচ্ছে না।
জয়তীর বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছে রাধিয়া। মাকে বললেও, আসলে ও নিশানের সঙ্গেই দেখা করতে চায়। যে-ছেলেটাকে ওর এত ভাল লাগে, আর ছেলেটাও যা ইঙ্গিত দিয়েছে, তাতে বুঝেছে নিশানেরও ওর ওপর দুর্বলতা আছে। সে কী করে একবারও ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে না! ওর ফোন তো কেড়ে নেয়নি কেউ! নিশানের মনের ভাব পড়তে কি তা হলে ভুল হয়েছিল! সব এমন ছন্নছাড়া কেন ওর জীবনে! কিছুই কি রাধিয়া গুছিয়ে করতে পারে না! অনেকটা রাগ আর জেদ থেকে আজ সকালে নিশানকে মেসেজ করেছিল রাধিয়া। লিখেছিল, ‘আমি দেখা করতে চাই।’
সামান্য সময় পরে নিশান উত্তরে লিখেছিল, ‘একা? না বাবা সমেত!’
রাগে গা জ্বলে গিয়েছিল রাধিয়ার। কী সাহস! ওকে চিমটি কেটে কথা বলছে! ও লিখে পাঠিয়েছিল, ‘একা। একাই। পাঁচটা, নন্দন।’
নিশান একটা ছোট্ট ‘ওকে,’ লিখে পাঠিয়েছিল শুধু!
জয়তীদের বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় একবার মনে হয়েছিল নিশানকে ফোন করে কনফার্ম করবে কি না। কিন্তু শেষে করেনি। কথার দাম নিশ্চয় আছে ছেলেটার। আর যদি না থাকে তা হলে তো হয়েই গেল। কেন কে জানে সেদিনের পর থেকে নিশানের ওপর কেমন যেন একটা অভিমান জমেছে ওর মনে। সবার সামনে থেকে বাবা ওরকম করে ওকে নিয়ে গেল, সেখানে নিশান কিছু বললই না প্রায়! আর শেষে বলল কিনা, বাবা এরকম বলে ওকে ফোন করে না। বাবা-মা কেমন হবে তার ওপর কি সন্তানের হাত থাকে? তা হলে সেই কথা বলে ওকে অপমান করার কী মানে! আজ তাই তো ডেকেছে ওকে। আর কবে সময় পাবে জানে না। কিন্তু আজ নিশানকে জিজ্ঞেস করবেই ওর ওইসব কথার মানে। কেন নিশান এমন! সব জেনেও কেন এমন করেছে ওর সঙ্গে! ও কাউকে কিছু বলে না বলে সবাই ওকে ভিতু আর টেক্ন ফর গ্র্যান্টেড করে নিয়েছে! এটা আর যেন আজকাল সহ্য হয় না। সেদিন যেভাবে বাবা ওকে টানতে-টানতে নিয়ে এল, নিশান তো তারপর একবারও কিছু জিজ্ঞেস করল না যে, ও কেমন আছে! এমন একটা ছেলেকে দেখে ক্ষণিকের দুর্বলতায় রাধিয়া বাবার ব্যাপারটা বলে দিল? তবে কি ও ভুল করেছে! আজ নিশানের সঙ্গে দেখা করে এটাই নিজের কাছে পরিষ্কার করে নেবে ও। তাই মনে মনে তৈরি হওয়া অভিমান আর রাগটাকে রাধিয়া বাঁচিয়ে রাখছে। এটা কাজে লাগবে পরে।
বেরোনোর মুখে জয়তী বলেছিল, “নিশানের সঙ্গে দেখা করছিস, বাড়িতে জানলে কিন্তু বিশাল ঝামেলা হবে আবার!”
রাধিয়া হেসেছিল সামান্য, “হলে হবে। কিন্তু জানার উপায় নেই।”
জয়তী হেসেছিল। তারপর ওর হাতটা ধরে বলেছিল, “প্রেমে পড়েছিস না, ছেলেটার?”
“ভাগ!” রাধিয়া নিজের অজান্তেই লাল হয়ে উঠেছিল।
“ইঃ! খালি ঢপ! মুখ সঙ্গে-সঙ্গে লাল হয়ে উঠল, আর বলে কিনা পড়েনি! কিন্তু যা করবি ভেবে করবি।”
রাধিয়া তাকিয়েছিল জয়তীর দিকে। মেয়েটা খুব ভাল। ওকে খুব ভালবাসে। এই যে মিথ্যে করে নেমন্তন্নের কথাটা বলল, তাতে জয়তী সত্যি ওকে বাড়িতে ডেকে দুপুরে খাইয়েছে। ওর বাবা, মা, বোন কত গল্প করেছে। গান করেছে। এত ভাল লেগেছে রাধিয়ার। ওর তো নিজের বাড়িতে যেতেই ইচ্ছে করছিল না। কী সুন্দর ওদের বাড়িটা। পুরনো দিনের উঁচু সিলিং। মোটা ভারিক্কি দেওয়াল। লাল মেঝে। বিশাল বড় সেগুন কাঠের দরজা। লম্বা পেতলের ছিটকিনি। কাচের স্কাইলাইট। চওড়া বারান্দা। নিচু ধাপের সিঁড়ি। কেমন একটা পুরনো সুন্দর কলকাতা যেন থমকে আছে জয়তীদের বাড়িতে। বাইরের, রাস্তার সব পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন চৌকো কলকাতা তৈরির চেষ্টাটা এখানে ঢুকতে পারেনি এখনও। এর তুলনায় ওদের বাড়িটা কেমন যেন গোমড়া আর মনখারাপ রঙের! ওদের বিত্তের তো অভাব নেই, কিন্তু চিত্তের অভাব বড় প্রকট।
রাধিয়া বলেছিল, “আমি কিছু করব না রে। আমি একটা-দুটো প্রশ্ন করব। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তো বিশ্বাসের আর ভরসার। সেটাই জিজ্ঞেস করব।”
জয়তী বলেছিল, “দেখ রাধি, তোদের অনেক টাকা। সেটা একটা যেমন সুবিধে তেমন অসুবিধেও। তুই অন্য বড়লোক বাড়ির মেয়ের মতো নোস। তুই খুব ডাউন টু আর্থ! খুব সাধারণভাবে থাকিস, জীবন কাটাস। কিন্তু তোকে যারা দেখছে, তারা সেভাবে সবাই দেখবে না ব্যাপারটা। তাই তাদের রিজ়ার্ভেশন থাকা স্বাভাবিক। একটা সামান্য কথা বলতে গেলে তাদের দশবার ভাবাটা স্বাভাবিক, তাই না? তাই বলছি নিশান চাইলেও নানা ফ্যাক্টর আছে কিন্তু এর মধ্যে! সবসময় মানুষ যা বলতে চায়, তা কিন্তু বলে উঠতে পারে না। এটা মাথায় রাখিস।”
