তারপর ফোনটা রেখে তাকাল পলির দিকে। পলি তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। কাঁধের ওপর কেটে বসা ব্রেসিয়ারের কালো স্ট্র্যাপটা দেখা যাচ্ছে! সেইদিকে ভাল করে তাকাল মাহির। গুন্ডা তো ও! গুন্ডারা এমন করতেই পারে! ও হাত দিয়ে স্ট্র্যাপটা ধরে জামার তলায় গুঁজে দিল। তারপর বলল, “দু’লাখ লাগবে। কাজ হয়ে যাবে। একপয়সা কম নয়। রাজি হলে বলো। না হলে ফোটো!”
সন্ধে গাঢ় হয়ে এল কলকাতায়। সামনে ধোঁয়াশা। মনে মনে ভাইয়ের দিকে তাকাল মাহির। তারপর সেই আবছা, ধোঁয়া ঢাকা পথের দিকে এগিয়ে গেল, একা!
৩৫. রাধিয়া
পরিটা ঘোরে না। কতদিন ঘোরে না এই পরি? জানে না রাধিয়া। শুধু এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখে, মেঘের দিকে তাকিয়ে একই ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে পরি! ভিক্টোরিয়ার চূড়ায় রোদ এসে লেগেছে এখন। কমলালেবু রঙের সূর্য শীতের কলকাতার গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যাওয়ার আগে নিজের শেষ আলোটুকু ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেলোফেনের মতো আলো লেগে রয়েছে মেমোরিয়ালের চূড়ায়, ক্যাথিড্রালের গথিক থামে, ক্রমশ মাথা তুলে দাঁড়ানো উঁচু বাড়িটির গালে। পরির ডানাও ভিজে আছে সেই রোদে। পরিটার জন্য কষ্ট হয় রাধিয়ার। ও জানে পরি হয়ে থাকার যন্ত্রণা।
ছোটবেলায় বাবা পরি বলে ডাকত ওকে! সাদা ফ্রিল দেওয়া ফ্রক, মাথায় সাদা হেয়ার ব্যান্ড পরা ছবি যে ওর কত আছে। বাবার কোলে রাধিয়া। বাবার কাঁধে রাধিয়া। বাবা খুব খুশি হয়ে হাসছে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে।
এইসব ছবি এখন ডিজিটাল ফ্রেমে ট্রান্সফার করানো হয়েছে। রাতে, একা-একা সেই ছবি দেখে ও। বাবার সঙ্গে লেপটে থাকার সেই বয়সটার কথা ভাবে। ভাবে সেই মেয়েটা কোথায় গেল! ঠিক কোন দিন থেকে মেয়েটার হাত ছেড়ে দিল বাবা। রাধিয়ার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কষ্ট হয়। ওদের বিশাল বড় বাড়িটা কেমন দৈত্যের কেল্লা মনে হয়। মনে হয় এই গোলকধাঁধায় আটকে গেছে, হারিয়ে গেছে ও। ওই পরির মতো নিরুপায় হয়ে থেমে আছে। মানুষ হয়ে বেঁচে ওঠা যেন আর হল না রাধিয়ার।
রাধিয়া জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনে দেখল। ভাড়া করা গাড়িতে বসে আছে ও। চৌরঙ্গি আর ক্যাথিড্রাল রোডের ক্রসিংটায় আছে ওর গাড়ি। নন্দন চত্বরে যাবে ও। নিশান আসবে। নিশানের সঙ্গে দেখা করাটা খুব দরকার। সেদিনের পর থেকে আর নিশানের সঙ্গে দেখা হয়নি। পরপর দু’দিন যা অসভ্যতা করল বাবা! কীভাবে যে নিশানের কাছ থেকে ক্ষমা চাইবে বুঝতে পারছে না।
আজ বড়দিন! ইউনিভার্সিটি ছুটি। তাও বেরিয়েছিল রাধিয়া। জয়তীর বাড়িতে নেমন্তন্ন ছিল ওর। আসলে ঠিক নেমন্তন্ন নয়। জয়তীকে ও বলেছিল, মাকে যেন ফোন করে জয়তী। বলে, নেমন্তন্ন আছে। সেদিনের পরে ওকে সারাক্ষণ চোখে-চোখে রাখা হয়েছে! ইউনিভার্সিটি যাওয়া আর আসা। তাও গাড়িতে মধুদার সঙ্গে বুজুকেও পাঠানো হয়। মাঝে মাঝে এত দম বন্ধ লাগে! বাবা এমন বাড়াবাড়ি করছে কেন, কে জানে!
মাকে এই নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল রাধিয়া। বলেছিল, “এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না? এমন কতদিন চলবে মা? আমি তো মানুষ না কি!”
মা রাগ দেখিয়ে বলেছিল, “যতদিন না সোনাঝুরির কাজটার কিছু ব্যবস্থা হয় ততদিন! আর কোন মুখে কথা বলিস তুই? লজ্জা করে না! অমন একটা ছেলের সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে বসেছিলি! ছিঃ ছিঃ! এভাবেই থাকতে হবে তোকে। তোর বাবাকে এইজন্য আমি বলেছিলাম, মেয়েকে এখানে রেখো না। বিদেশে পাঠিয়ে দাও। কিন্তু আমার কথা আর তোর বাবা শুনেছে কবে! মেয়ে যা বলবে, সেটাই যেন সব! নাও এখন ভোগো! তোকে বলে দিলাম, এভাবে অসভ্যতা আমরা সহ্য করব না। এটা মাথায় থাকে যেন।”
রাধিয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল অবাক হয়ে। মা এভাবে বলতে পারে কী করে? বাবা যে কী করে বেড়াচ্ছে, সেটা যদি একবার জানতে পারে, তখন ও দেখবে মায়ের এই সব কথা কোথায় যায়! কিন্তু রাধিয়া এখনও স্পষ্ট করে জানে না বাবা ঠিক কী করছে। ওদের ব্যাবসার কাজে বাইরে যাচ্ছে বলে আসলে কোথায় যাচ্ছে। নিশানের সঙ্গে এই নিয়ে আর কথাই হয়নি সেভাবে। আসলে সেদিন ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলেছিল ওই সব কথা। কিন্তু তারপর থেকে নিশান এই নিয়ে ওকে কিছু বলেনি। আর রাধিয়াও স্বভাবগত লজ্জা আর দ্বিধায় ওকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারেনি।
জয়তী ওর শেখানো কথামতো মাকে ফোন করেছিল গতকাল। মা প্রথমে গাঁইগুঁই করেছিল বটে, কিন্তু মুখের ওপর না করতে পারেনি। মায়ের এই ব্যাপারটা জানে রাধিয়া। মায়ের রাগ-টাগগুলো সব ঘরের ভেতরে, ওর সামনে। বাইরের লোকের সামনে জোর দিয়ে কিছু বলতে পারে না। তাই জয়তীকে দু’-একবার না করেও শেষে হ্যাঁ করে দিয়েছিল।
মা আজ রাধিয়াকে বলেছিল, “আমাদের সঙ্গে রাতে ক্লাবে যাবি না বলেই কি বান্ধবীকে দিয়ে এমন একটা ফোন করালি?”
রাধিয়া গম্ভীর হয়ে বলেছিল, “এসব আমায় না জিজ্ঞেস করে জয়তীকে জিজ্ঞেস করলেই তো পারতে! ঠিক আছে জয়তীর মায়ের সঙ্গে না হয় আবার ফোন করে কথা বলো।”
মা আর কথা বাড়ায়নি। শুধু বলেছিল, “কিন্তু আজ তো মধুদা ছুটি নিয়েছে। আর বুজু আমায় নিয়ে পার্লারে যাবে। ঠিক আছে, ছোট হ্যাচব্যাকটা নিয়ে তপনকে না হয় বলব তোকে পৌঁছে দিতে।”
