মাহির কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, “পলি আমি… এটা আমার। মানে আমার না…”
পলি তাকিয়েই আছে!
মাহির বলল, “রিতুদা রাখতে দিয়েছে। আসলে নানা ঝামেলা হয় তো! তাই… আমি ছেড়ে দিয়েছি রিতুদাকে। ওই পার্টি ছেড়ে দিয়েছি। প্লিজ়… পলি প্লিজ়…”
পলি পায়ে-পায়ে এগিয়ে এল ওর দিকে। তারপর পিস্তলটা তুলে এক চোখ টিপে তাক করার মতো করে বলল, “ঢিঁচক্যাঁওও!”
মাহির তাকিয়ে রইল। দেখল পলি হাসছে। যেন মজা পেয়েছে খুব! কেন হাসছে পলি! রেগে গিয়ে হাসছে কি? অবজ্ঞা করে হাসছে? ওকে কি নরকের কীট ভাবছে? ভাবছে, এ কেমন ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক করতে যাচ্ছে! কেন হাসছে পলি! কী বলতে চায় ও এই হাসি দিয়ে!
মাহির আবার অস্ফুটে বলল, “প্লিজ়…”
পলি পিস্তলটা ঘুরিয়ে দেখল ভাল করে। মুখে এখনও হাসি। তারপর জিনিসটা বিছানায় রেখে দিয়ে বলল, “এমন জিনিস ঘরে রেখে দরজা ভেজিয়ে বাইরে গেছিলে! জানো, আমি পিস্তল আগে কাছ থেকে দেখিনি। হাতে নিয়ে এই প্রথম দেখলাম! কী ভারী! চালাও কী করে?”
“আমি চালাই না,” মাহিরের মনে হল পলির সামনে কী করলে ও বুঝবে যে, মাহির সত্যি কথা বলছে! বুকের ভেতরে কেমন একটা করছে ওর। মনে হচ্ছে এত কাছে এসে সব এভাবে শেষ হয়ে যাবে! নিজেকে মনে মনে গালি দিল! ওর বোকামোর জন্য হল এটা! এমন করে কেউ কিটব্যাগটা রেখে যায় সামনে! সব যে নষ্ট হতে বসেছে! এখন কী করবে মাহির!
পলি হেসে বলল, “সে আমি বুঝতে পারছি। যাক বাবা…”
যাক বাবা? মানে? কে যাবে? কোথায় যাবে? বাবাই-বা আসে কোথা থেকে এর ভেতরে! পলি কী বলতে চাইছে! টেনশনে মাহিরের মনে হল, এক্ষুনি ও মাথা ঘুরে পড়ে যাবে!
পলি বলল, “তোমায় দিয়ে হবে…”
ওকে দিয়ে হবে? মাহিরের মাথায় ঢুকছে না কিছু। কী বলছে পলি? ও বলল, “পলি আমি অমন নই। ওটা আমার নয়। বিশ্বাস করো। আমি আসলে…”
পলি এগিয়ে এসে কাছে দাঁড়াল মাহিরের। তারপর আচমকা হাত দুটো নিজের হাতে শক্ত করে ধরল। বলল, “পারলে তুমিই পারবে। আমায় প্লিজ় হেল্প করো মাহির। আয়্যাম ইন ট্রাবল।”
ট্রাবল! মাহির তাকিয়ে রইল পলির দিকে। ঘরের আলো যেন বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। পলি ওর এত কাছে! সুন্দর গন্ধ আসছে পলির শরীর থেকে। কেমন একটা লাগছে মাহিরের। কেমন ঘোর এসে যাচ্ছে। ও যেন চোখ খুলে রাখতে পারছে না। পলির কোমরটা পেঁচিয়ে নিজের দিকে টেনে নিতে ইচ্ছে করছে ওর। ওর শরীর আর মন যেন ওর কথা শুনছে না!
পলি বলল, “আমার স্যারের স্ত্রী আমায় খুব ভয় দেখাচ্ছে। আমার জীবন শেষ করে দেবে বলছে। লোক পাঠিয়েছিল আমার বাড়িতে। ও চায় স্যারকে আমি ছেড়ে দিই। বলে আমার বয়সি মেয়ে আছে স্যারের। কিন্তু আমি স্যারকে ছাড়া থাকব কী করে? তুমি বলো মাহির, প্রেম কি বয়স, অবস্থা, ন্যায়-অন্যায় বোঝে! বোঝে না। আমিই-বা কী করে বুঝব! স্যারকে ছাড়া আমি মরে যাব। তুমি স্যারের বউকে বা ওর গুন্ডাদের কিছু বলো। রিতুদাকে বলো যেন আমায় হেল্প করেন। তুমি পারবে। এই… এই পিস্তলটা নিয়ে ওদের সামনে একটু নাচাবে। ওরা ঠিক তোমার কথা শুনবে। আমায় প্লিজ় হেল্প করো। যা টাকা লাগবে আমি দেব। প্লিজ় মাহির… গুন্ডাদের গুন্ডারাই শায়েস্তা করতে পারে… আর কেউ পারে না। প্লিজ়…”
পলি এগিয়ে আসছে আরও। আরও কীসব বলছে। জড়িয়ে যাচ্ছে পলির কথা। পলি গালে হাত দিচ্ছে মাহিরের। কীসব বলছে। কিন্তু মাহিরের কিছু মাথায় ঢুকছে না। পলি ওর স্যারকে ভালবাসে! পলি অন্যকে ভালবাসে! আর গুন্ডা! গুন্ডা শায়েস্তা করতে পারবে গুন্ডাকে! কে গুন্ডা? মাহির? মাহিরকে পলি গুন্ডা ভাবে! তাই এসেছে নিজের নোংরামো ঢাকার জন্য! পিঠ বাঁচানোর জন্য!
পলিকে দেখল মাহির। কিন্তু মনে হল রোগা সেই ফুটবলারটা এগিয়ে আসছে। বলের ওপর ঘুরছে ওর পা। কাটিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যাবে ওকে জীবন। জীবন! এটা জীবন! পলি টাকা দিতে চাইছে ওকে! ও কি গুন্ডা! ওকে দেখে লোকে ভয় পায়! তাই কি সতুয়া সবাইকে দাঁড় করিয়ে রেখে ওকে আগে মুড়ি দিয়ে দিল! এটা কী হচ্ছে! সবাই কীভাবে দেখছে! ওকে টাকা দিলে ও শায়েস্তা করে দেবে লোকজনকে!
পকেটে ফোনটা নড়ছে। কে ফোন করছে! কেন ফোন করছে একটা গুন্ডাকে! পলির সুন্দর মুখটা ভেদ করে বেরিয়ে আসছে বীভৎস একটা মুখ! পলি টাকা দিতে চাইছে। বলছে, ওরা তো নিয়ে থাকে। নিয়ে থাকে? মাহির নেবে?
যন্ত্রের মতো পকেট থেকে ফোনটা বের করল মাহির। রিসিভ করে কানে লাগাল। রিতুদা। রিতুদা কীসব বলছে। রাগ করছে। কেন মাহির জানাচ্ছে না সেই নিয়ে রাগ করছে। সামনে পলি কীসব বলছে। ছেলেটা বল নিয়ে চলে এল প্রায়। ওকে কাটিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করছে। বিকেলের রোদ অনেকটা সরে গেছে দেবদারুর মাথা থেকে। পতাদাকে আর দেখতে পাচ্ছে না। শুধু চিৎকার ভেসে আসছে। কারা যেন হল্লা করছে খুব। আর ভাই শুয়ে আছে। ওর চিররুগ্ণ, অসহায় ভাই আজ দাঁড়িয়েছে গোলে, সুমিতের জায়গায়। ছেলেটা মাহিরকে টপকে গেলেই ভাইকে একা পাবে। ভাইকে কি একা ছেড়ে দেবে মাহির! ঘুমের মধ্যে যে ভাই ওকে খোঁজে, ওর নাম ধরে ডাকে, তাকে একা ছেড়ে দেবে! কী করে দেবে! নিজের ভাইকে কী করে একা ছাড়বে মাহির!
ও হাত তুলে থামাল পলিকে। তারপর ফোনে রিতুদাকে বলল, “আমি রাজি রিতুদা। টাকাটা একটু বাড়িয়ো। ভাইটার অপারেশন সামনে। কেমন?”
