“নোঈ-র জন্য!” মা বলেছিল, “এখনই বিয়ে দিয়ে দিবি?”
পুটুমাসি সামনের চেয়ারটায় বসে হেসেছিল। তারপর গদগদ মুখে বলেছিল, “হ্যাঁ। ছেলেদের অবস্থা ভাল। ডাক্তার। বাপ-ঠাকুরদাও ডাক্তার। ওদের আগ্রহ খুব। তা ছাড়া নোঈ তো আর কচি খুকি নয়!”
নোঈকে দেখতে ভাল। ফরসা। টিকালো নাক। বড়-বড় চোখ। চশমা পরে। থুতনিতে একটা হালকা টোল আছে। হাসিটাও সুন্দর। ঝকঝকে। পছন্দ হওয়ার মতোই মেয়ে।
মা বলেছিল, “তাও ওর বয়সটা দেখ!”
পুটুমাসি বলেছিল, “ওর মতো বয়সে আমার বড় মেয়ে টটি হয়ে গিয়েছে! ছাব্বিশটা খুব একটা কম বয়সও নয়। ছেলের তেত্রিশ। একদম ঠিক আছে।”
আইকা আর কথা না বলে থাকতে পারেনি। ও পাশে বসে মোবাইল নিয়ে খুটখুট করতে থাকা নোঈকে বলেছিল, “কী রে, তুই কিছু বলছিস না কেন?”
“আমি আর কী বলব!” নোঈ মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই বলেছিল, “বললে কি মা শুনবে? শুনবে না।”
কথাটা সত্যি। পুটুমাসি কারও কথাই শোনে না। আর রাঙামেসো যেহেতু নির্বাক চলচিত্রের পার্শ্বচরিত্র, তাই পুটুমাসিই সমস্ত ডায়ালগের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে।
আইকা ছাড়েনি। বলেছিল, “তুই কারও সঙ্গে প্রেম করিস না?”
নোঈ এবার তাকিয়েছিল আইকার দিকে। বলেছিল, “তোকে কতবার বলব দি? না, করি না।”
“আহা, সত্যিটা বল না।” আইকা চাপ দিয়েছিল।
“ও ওসব করে না। ছোট মেয়ে, কী প্রেম করবে? আর করলে ঠ্যাং ভেঙে দেব না?”
“ছোট মেয়ে?” আইকা চোখ গোল করেছিল, “তা হলে বিয়ে দিচ্ছ কেন?”
“ও তুই বুঝবি না। আমরা বয়সে তোদের চেয়ে বড়। আমরা জানি কোনটা ঠিক কোনটা ভুল।”
পুটুমাসির গলায় অধৈর্য লক্ষ করেছিল আইকা। মাথাটা হঠাৎ গরম হয়ে গিয়েছিল ওর।
এই ব্যাপারটা সহ্য করতে পারে না আইকা। বড় বলেই সব জানে? তাই যদি হত, তা হলে ইতিহাসে এত যুদ্ধবিগ্রহ কেন? এত কোটি-কোটি লোকের এত দুঃখ-দুর্দশা কেন? যা খুশি তাই বললেই হল?
আইকা চোয়াল শক্ত করে কিছু বলতে গিয়েছিল, কিন্তু মা পাশ থেকে চেপে ধরেছিল হাতটা। মা আইকাকে ভালই চেনে। তাই জানে কখন কোথায় ওকে আটকাতে হয়। না আটকালে আইকার মুখে কিছু আটকায় না।
আইকা শুধু তাকিয়েছিল নোঈর দিকে। নোঈ একমনে মোবাইলে কাউকে একটা মেসেজ করে যাচ্ছিল। যেন এই ঘরে ও নেই। এই ঘরের সঙ্গে ওর কোনও সম্পর্কই নেই।
আইকা টেবিল থেকে খাবারের একটা প্লেট তুলে ভেতরের ঘরের দিকে গিয়েছিল। রাঙামেসো ভেতরের ঘরে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছিল একা।
আইকা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মেসোকে দেখছিল। ঠিক নোঈর ফোটোকপি! বাপ আর মেয়ের এই চুপ করে, একা হয়ে থাকায় কী মিল! ওই ঘরে মেয়ে বসে মোবাইলের মধ্যে মাথা গুঁজে দিয়েছে। আর এই ঘরে বাবা ল্যাপটপে।
খাবারের প্লেটটা নিয়ে গিয়ে ঠকাস করে টেবিলে রেখেছিল আইকা। মেসো তাকিয়েছিল ওর দিকে। মুখে সামান্য হাসি।
রাগটা মনের মধ্যে পাক খাচ্ছিল আইকার, হাসিটা যেন সলতেয় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল একদম।
ও দাঁত চেপে বলেছিল, “হাসো যত পারো! মেয়েটা তোমার তো? ঠিক জানো?”
রাঙামেসোর সঙ্গে এভাবেই কথা বলে আইকা। একদম যা মনে হয় বলে। মেসো কিছু মনে করে না। বরং কেন কে জানে প্রশ্রয় দেয়।
মেসো ওর হাত ধরে পাশে বসিয়ে দিয়েছিল। তারপর বলেছিল, “কী হয়েছে তোর? এত খেপে আছিস কেন?”
আইকা বলেছিল, “নোঈর এই বয়সে বিয়ে দিয়ে দেবে পুটুমাসি! আর তুমি এখানে ল্যাপটপে বিদেশি মিনি সিরিজ় দেখছ!”
“আজ কি বিয়ে হচ্ছে?” মেসো হাসিমুখে তাকিয়েছিল আইকার দিকে।
“মানে?”
“মানে, আজই কি বিয়েটা হয়ে যাচ্ছে?”
আইকা থমকে গিয়েছিল।
মেসো বলেছিল, “শোন, সারাক্ষণ এত উত্তেজিত থাকিস কেন? এত অস্থির হলে হয়! একটা বাড়ি থেকে নোঈকে পছন্দ করেছে। করুক। দেখতে আসবে। আসুক। বিয়ে তো হচ্ছে না।”
আইকা বলেছিল, “তোমায় দেখে অবাক হয়ে যাই! এত ঠান্ডা থাকো কী করে? পুটুমাসি যেভাবে ছেলের গুণগান করছে, সময় থাকলে নিজেই হয়তো বিয়ে করে নিত!”
মেসো হেসেছিল খুব। তারপর বলেছিল, “শোন, নোঈ যাকে পছন্দ করবে তাকেই বিয়ে করবে। সে পুটু যাই বলুক।”
আইকা মুখ বেঁকিয়েছিল ইচ্ছে করে। তারপর বলেছিল, “তুমি কিচ্ছু করতে পারবে না। আমি জানি তোমায়। তুমি ভিতু।”
মেসো ল্যাপটপের স্ক্রিনটা নামিয়ে দিয়ে রিভলভিং চেয়ারটা ঘুরিয়ে তাকিয়েছিল আইকার দিকে। তারপর বলেছিল, “জানিস, পুটুকে ওদের বাড়ির লোকজন আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়নি। হাইলি পলিটিক্যালি কানেক্টেড ছিল ওদের বাড়ি। সব রকম চেষ্টা করেছিল আমাকে আটকাতে। মারতেও চেষ্টা করেছিল।”
“তারপর?” অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আইকা।
মেসো হেসেছিল শান্তভাবে। তারপর বলেছিল, “নোঈ না চাইলে ওর বিয়ে কেউ দিতে পারবে না।”
“আর ইউ ইন আ হারি?” রুপিন ফাইল থেকে চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন।
আইকা বাঁ হাতের ঘড়িটা ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে বলল, “একটু স্যার। বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান আছে।”
“ও, ইজ় দ্যাট সো!” রুপিন ফাইলটা বন্ধ করে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর হাত দিয়ে চুলটা ঠিক করে নিয়ে বললেন, “আমি তা হলে ব্যাপারটা ছোট করে বলি। কাল ডিটেলে ডিসকাস করব। কেমন?”
আইকা মাথা নাড়ল। আসলে ক্লান্ত লাগছে ওর। রুপিনের কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। আবার অন্যদিকে বাড়িতে গিয়ে ওইসব পাত্রী দেখার মধ্যেও পড়তে ইচ্ছে করছে না। একবার খ্যাপাটে চিন্তা এল মাথায়। ভাবল সব উচ্ছন্নে যাক! একবার কি ঋষিকে ডেকে নেবে? কিন্তু সেটাও ভাল লাগছে না। ছেলেটা শরীর নিয়ে বড্ড হামলে পড়ে! বিরক্ত লাগে।
