মাহির কিছু না বলে চুপ করেছিল। রিতুদা ওকে সেই যে চুল ধরে এই ঘরে মেরেছিল, সেটা ভুলতে পারেনি। সেদিন কোথায় যেন কী একটা উপড়ে গিয়েছিল। নিজেকে এত ছোট আর তুচ্ছ মনে হয়েছিল যে, তারপর থেকে ওর মনটা কেমন হয়ে গিয়েছে যেন। এত ছোট কেউ কাউকে করতে পারে! হ্যাঁ, তারপর ও কাজ করছিল, কিন্তু সেটা করতে হয় বলে! রিতুদা কী করে ওকে অমন অপমান করতে পারল!
ও বলেছিল, “কিছু বলবেন দাদা!”
“হ্যাঁ, তাই তো ডাকলাম। সোনাঝুরির কেস পেকে গিয়েছে খুব। ফাইনাল স্টেজ বলতে পারিস। পার্টি হাইকম্যান্ড থেকে আমাকে বলা হয়েছে যা ঠিক হবে তাই করতে! শোন, তুই এখন থেকে ওইদিকে যাবি। বিজন সরখেল বলে একটা লোক আছে। ওর ওপর তারক চক্রবর্তীর লোকজন হামলা করতে পারে। তুই বিজনকে গার্ড দিবি। যন্তর রাখবি সঙ্গে। এটা ইমপর্ট্যান্ট। কিছু হলে চালিয়ে দিবি। শালা, আমি বুঝে নেব বাকিটা। তারকের খুব পেঁয়াজি বেড়েছে। হাইকম্যান্ডের কাছে আমার নামে নালিশ করেছে! সেখানেও দু’-একটা বুড়ো ঢ্যামনা আছে যারা কাট মানি খায় তারকের কাছ থেকে। তাদের জন্য হাইকম্যান্ড থেকে সরাসরি কিছু করা যাবে না তারকের ওপর। তাই আমায় বলা হয়েছে ব্যাপারটা দেখতে। সোনাঝুরিতে প্রোজেক্ট হতেই হবে। না হলে চাপ আছে। আমাদের সরকারের প্রেস্টিজ ওটা। প্লাস অত শ্রমিক! সামনে ভোট আসছে। বুঝতে পারছিস তো! বিজনের যেন কিছু না হয়।”
মাহিরের কী হয়েছিল কে জানে! আচমকা কী যেন একটা ছিঁড়ে গিয়েছিল ভেতর থেকে। ও বলেছিল, “আমি গুন্ডামো করতে পারব না রিতুদা।”
“কী?” রিতুদা প্রথমে বুঝতে পারেনি।
“আমি বন্দুক-পিস্তল নিয়ে ওসব করতে পারব না রিতুদা। আমি ভদ্রবাড়ির ছেলে। আমায় আপনি গুন্ডা পেয়েছেন নাকি?”
“শালা, কী বলছিস তুই! ব্যাপারটা মেটা অবধি তুই বিজনকে চোখে-চোখে রাখবি। এর জন্য এককালীন দু’লাখ দেওয়া হবে তোকে। প্লাস যা টাকা পাস, তা তো পাবিই। তোর ভাইয়ের কেসটাও আমরা সাল্টে দেব। এত টাকা কোনওদিন বাপের জন্মে দেখেছিস!”
“আমি পারব না, রিতুদা। আমি গুন্ডা নই। আমি প্লেয়ার। আপনি বলেছিলেন আমার ফার্স্ট ডিভিশন টিমে চান্স করিয়ে দেবেন, কিন্তু কিছুই তো হল না! আমি তো পাতি গুন্ডা হয়ে গেলাম!”
“শোন, আমাদের সবার কাজ থাকে পৃথিবীতে। যেটা যার কাজ, তাকেই মানায়। তুই নিজেও জানিস যে, তুই ঢপের প্লেয়ার! ওটাতে তুই কোনওদিন কিছু করতে পারবি না। যাতে পারবি সেই কাজ দিচ্ছি! এটা তোর কাজ। টাকা পাবি ভাল। টাকা দরকার মাহির। পেটের টান শালা বড়-বড় বাতেলার পেছনে দিয়ে দেয়! যা বললাম কর। ভাল হবে,” রিতুদা উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আবার ঘামছিল গলগল করে। মাথার দু’পাশের শিরা ফুলে উঠেছিল।
দেখে ভয় লাগছিল মাহিরের। ওর মনে হচ্ছিল আবার যদি কিছু ছুড়ে মারে! আবার যদি এসে চুলের মুঠি ধরে! বুঝতে পারছিল এখানে বলে-কয়ে কিছু হবে না। তার চেয়ে সময় নিয়ে নিক কদিন। সুযোগ বুঝে ‘না’ বলে দেবে ফোনে। সব জায়গায় গায়ের জোর চলে না।
মাহির বলেছিল, “আমি একটু ভেবে নিই রিতুদা।”
“ভেবে নিই মানে?” রিতুদা খেপে গিয়েছিল, “শালা, তোকে ভাবতে বলেছি জানোয়ার! ভাবতে হলে ভাইয়ের কথা ভাব। তার অসুখের কথা ভাব। টাকা লাগবে না?”
মাহির চুপ করে গিয়েছিল। সবাই ওর এই একটা বিন্দুতে চাপ দেয়! একটাই বিন্দু, ভাই! পৃথিবী কেন সারাক্ষণ দুর্বল জায়গায় আঘাত করে! রিতুদারও তো ভাই ছিল। তা হলে? ওর মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবন এমন একটা ভাই দিয়ে আসলে ওকেই পঙ্গু বানিয়ে দিয়েছে!
“যা, কাল এসে ডিটেলটা বুঝে নিস। জানবি পেট বড় বালাই। শালা, সব কাপ্তেনি পেছন দিয়ে বেরোবে! এখন ফোট। কাল আসবি।”
বাড়ির দিকে এগোল মাহির। শীতের সন্ধে গাঢ় হয়ে আসছে। ধোঁয়াশার মনখারাপ চেপে আসছে চারিদিকে। সামনের পথ অজানা, কিন্তু তবু এগোতে হবে মাহিরকে। জীবনে দাঁড়াতে হলে শুধু অভিযোগ করলে হয় না। কাজ করতে হয়।
দরজাটা ঠেলে ঘরে ঢুকল মাহির। আর ঢুকেই ঘাবড়ে গেল! আরে, পলি! দরজার দিকে পেছন করে দাঁড়িয়ে আছে পলি। দরজা ভেজানো ছিল বলে ঘরে ঢুকে পড়েছে। কী করছে ও? আসার কথা তো ছিল না! তা হলে!
বুকের ভেতরটা কেমন করছে মাহিরের। তিমিমাছটা আবার জেগে উঠেছে, তবে এবার তার অন্য রকম দাবি! ফাঁকা ঘর। নির্জন বাড়ি! ওরা দু’জন। মাহির কোনওদিন তো ভাবতেই পারেনি এভাবে ও পলিকে পাবে! দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল মাহির। এমন সুযোগ আর পাবে না। ও আজকেই ওর কথাটা বলে দেবে পলিকে।
ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল মাহির। ওর ঘরে ঢোকার শব্দে পেছনে ফিরল পলি! সঙ্গে সঙ্গে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল মাহিরের। দেখল, পলির হাতে চকচক করছে পিস্তল! পাশের বিছানায় কিটব্যাগটা খোলা। তোয়ালেটা পড়ে আছে এক কোণে।
মাহিরের মনে হল পেট থেকে লাফ দিয়ে তিমি এবার বেরিয়ে আসবে বাইরে! পলির হাতে এটা এল কী করে? ইস, ব্যাগটা বেখেয়ালে কেন রেখে গিয়েছিল বিছানায়! পলি কী ভাবল ওকে! এখন কী হবে? কী করে ও পলিকে বোঝাবে যে আসলে ও খারাপ নয়! আসলে এটা রিতুদার! আসলে, পলির জন্য ও সব ছাড়তে পারে! আসলে… আসলে… আসলে…
মাহির লাভায় আটকে যাওয়া মানুষের মতো তাকিয়ে থাকল পলির দিকে। পলি ওর দিকে তাকিয়েই আছে। হাতের পিস্তলটা কাঁপছে সামান্য।
