সতুয়া মুড়ির দুটো ঠোঙা বাড়িয়ে দিল। দুটোর টাকা দিয়ে ব্যালেন্স ফেরত নিল মাহির। টিটি নিজের টাকাটা দিতে গিয়েছিল, কিন্তু মাহির দিতে দিল না।
মুড়ির ঠোঙা নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়াল দু’জনে। ঝিমধরা একটা সন্ধে নামছে। আজ ধোঁয়াশা বেশ। স্ট্রিট লাইটগুলো কেমন আবছা হয়ে আছে। যেন চুনগোলা জলের মধ্যে মাছের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা। মানুষজনকে কেমন জলরঙে আঁকা মনে হচ্ছে।
টিটি বাইকে বসে ঠোঙাটা খুলল। তারপর মুড়ি হাতে ঢেলে খেতে-খেতে বলল, “তোর কেসটা কী? কী হয়েছে তোর?”
মুড়ি মুখে দিয়ে কিছুক্ষণ চিবোল মাহির। সেই তিমিমাছটা কোথায় যে পালাল! তুয়াদির সঙ্গে কথা বলার পরে ওর খিদে-টিদে পাচ্ছে না একদম! তাও জোর করেই খেল।
“শালা, কালা নাকি? উত্তর দিচ্ছিস না কেন?” টিটি বিরক্ত হল, “এটা কি শালা প্রেমের গল্প হচ্ছে! তুই মাঝে মাঝে এমন করবি আর আমি সেখান থেকে তোকে মানাতে আসব! আমায় শালা হিরো পেয়েছ?”
“আমি একটা ডিসিশন নিয়েছি,” মাহির বলল গম্ভীর গলায়।
“কী? থার্ড আম্পায়ার হয়ে গেলি নাকি?” টিটি বাইক থেকে নেমে দাঁত দিয়ে ঠোঙাটাকে কামড়ে ধরে বাইকটাকে স্ট্যান্ড করাল। তারপর ঠোঙাটা হাতে নিয়ে বলল, “আবার কী ভূত ঢুকল মাথায়? দাবিটা কী তোর?”
“আমি কি গুন্ডা? আমায় কী ভাবিস তোরা?” মাহির অর্ধেক মুড়ি খেয়ে ঠোঙাটা দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলল দূরে রাখা একটা ভ্যাটের দিকে।
“না, গুন্ডা নয়। কিন্তু আমাদের সবারই কিছু কাজ আছে। তোরও আছে। এসব বলছিস কেন?”
মাহির কিছু না বলে মাথা নামিয়ে নিল।
“তা কী করবি ঠিক করেছিস?” টিটিও আর খেল না। কিন্তু ও ফেলল না ঠোঙাটা। বাইকের ডিকিতে রেখে দিল।
“আমি আবার ফুটবল শুরু করব। ট্রায়াল দেব বড় ক্লাবে। আমি ওটাই পারি। ওটাই করব। পলি যে-বাড়ির মেয়ে ওর সঙ্গে ভবিষ্যৎ দেখতে গেলে এসব করলে হবে না। প্লাস প্রাইভেটে এইচএস-টা দিয়ে দেব। অনেক ছোটলোকপনা হয়েছে। আর না।”
“ওয়াহ্ বেটা! আমরা এখন ছোটলোক! তোর সঙ্গে সারা জীবন থাকলাম আর এখন আমরা ছোটলোক! আর তোর ভাই? তার চিকিৎসা? সেটার কী হবে?”
মাহির চোয়াল শক্ত করে তাকাল টিটির দিকে। ছেলেটা সারা জীবন ওকে পেছনে টেনে গেল। কিছুতেই এগোতে দিল না। টিটি কি ওর সত্যি বন্ধু! পলির সঙ্গে ওর কিছু একটা হতে পারে জানার পর থেকেই টিটি কেন ওকে সারাক্ষণ এমন করে নেগেটিভ কথা বলে! ওকে কেন এই পাঁক থেকে বেরোতে দিতে চায় না!
মাহির চোয়াল শক্ত করে বলল, “আমি ঠিক করে নিয়েছি। পলির জন্য আমি সব পারি! আমি পরের দিন ওকে বলে দেব আমার মনের কথা। আমায় ভাল হতেই হবে।”
“শালা, এটা কে রে!” টিটি বিরক্ত হল, “এটা কি মানুষ না অন্য কিছু! কী শালা, সব মাথায় উঠে গেল নাকি? ভাইয়ের কথা ভাব। ওর চিকিৎসার কী হবে!”
মাহির উত্তর দিল না। এটা একটা কঠিন প্রশ্ন। কিন্তু এই প্রশ্ন দিয়ে ও নিজেকে আটকে রাখবে না। এই প্রশ্নটা ওকে সামনে আলোর দিকে এগোতে দিচ্ছে না। ভাই! ভাইয়ের কী হবে! আরে বাবা, আগে নিজের কী হবে সেটা কি দেখবে না! আর ঠিক কিছু একটা হয়ে যাবে। তেমন হলে পলিকে বলবে। ওর চেনাশোনা অনেক। ও কিছু করে দিতে পারবে নিশ্চয়ই। পলি যে ওকে পছন্দ করে, সেটা তো মাহির জানে।
“জানি না শালা কী করছিস!” টিটি মাথা নাড়ল, “পুরো ঝাড় কেস হয়ে গেছিস! প্রেম শালা বহুত বেকার জিনিস! ভাল উঠছিলি। কামাচ্ছিলি। সেখানে… এসব কঠিন কাজে মাথা গলাচ্ছিস! কেন কে জানে!”
মাহির বলল, “কঠিন কাজ কেন কঠিন জানিস? সেটা ঠিক বলে। ভাল বলে। যে-কোনও কঠিন জিনিস ভাল হয়। ঠিক হয়। সহজে ভাল কিছু করা যায় না টিটি। এটা বুঝিস না তোরা! আমার বয়স আছে এখনও। আমি ভাল কিছু করতে পারি। আমি গুন্ডা নই।”
টিটি তাকাল ওর দিকে। তারপর বাইকে চড়ে বসল। স্ট্যান্ড থেকে বাইকটা নামিয়ে বলল, “ভাইয়ের কথাটা ভাবিস। কে দেবে তোকে ছ’লাখ টাকা! স্বপ্ন আর বাস্তবটা এক নয়। পেছনে যখন পড়বে না, তখন পলি-টলি সব বেরিয়ে যাবে! পেট বড় বালাই গুরু! তুই প্রেমে পড়ে সব ভুলে গেছিস। শোন মাহির, আমি আছি। দরকারে বলবি। আমরা ছোটবেলার বন্ধু, তুই ভুলে যাচ্ছিস। কিন্তু আমি ভুলছি না।”
টিটি আর না দাঁড়িয়ে বাইক ছুটিয়ে বেরিয়ে গেল।
মাহির দেখল তাকিয়ে। ধোঁয়াশার মধ্যে ধীরে-ধীরে মিশে গেল টিটি। টিটি ওর বন্ধু, কিন্তু শুধু সেটা নিয়ে জীবন চলবে না। জীবনে ওপরে উঠতে গেলে পিছুটান ছাড়তে হয়। কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। পলির সঙ্গে কাল ভাইয়ের ব্যাপারে কথা বলবে মাহির। পলি নিশ্চয় সাহায্য করবে।
ও পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখল। মাকে কি একবার ফোন করবে? রাতের খাবারটা তা হলে নিয়ে নেবে সামনে থেকে। জুঁইদি সন্ধে থেকে রুটি-তড়কা নিয়ে বসে। কিনে নিলেই হবে।
কিন্তু তারপর আর ফোন করল না। টিটির কথাটা মনে পড়ল আবার। পেট বড় বালাই! রিতুদাও এমন বলেছিল না!
এই ডিসেম্বরেও যে কেউ এমন ঘামতে পারে রিতুদাকে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারত না মাহির। সেদিনও একটা তোয়ালে দিয়ে বারবার করে মাথা আর মুখ মুছছিল লোকটা। মাহির গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সামনে। ওকে দেখে একটা লজেন্স ছুড়ে দিয়েছিল ওর দিকে। বলেছিল, “কী রে, আজকাল কী হয়েছে তোর! ভালই তো কাজ করছিলি। ক’দিন এমন ড্যাম্প মেরে আছিস কেন!”
