মাহির চুপ করে গেল। আগেও একবার এমন কথা বলেছিল তুয়াদি। তা হলে কি সত্যি কাজটা এবার শুরু করবে? আর ওকে কাজ করতে বলছে কেন! মাহির তো জানে না কী কাজ। জানে না এর ভবিষ্যৎ কেমন। কিন্তু ওর মনে হল রিতুদার কাছ থেকে বেরোনোর এটাও একটা পথ হতে পারে। তবে তুয়াদি বলেই ভয় হয়। ওখানে আটকে গেলে পলির কাছে ও যাবে কী করে?
পলিকে ছাড়া আজকাল আর কিছু ভাবতে পারে না মাহির! জানে, পলিদের সঙ্গে ওর অবস্থার অনেক ফারাক। কিন্তু পলি কেমন মেয়ে সেটা তো জানে। যে সমাজসেবামূলক কাজ করে এত, সে কি আর-পাঁচজনের মতো হবে! তা ছাড়া, এই যে পলি ওকে নিয়ে বেরোয়, এই যে ওকে গিফ্ট দিল, ওকে মাঝে মাঝে রাতে মেসেজ করে, তার মধ্যে কি ন্যূনতম কোনও সংকেত বা ইঙ্গিত নেই? আছে। পলির চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারে মাহির। সে টিটি যাই বলুক। ও তো জানে পলির সঙ্গে ওর কেমন সম্পর্ক!
ও তুয়াদিকে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য বলল, “আমি দেখি। এখনও কিছু বলতে পারছি না।”
তুয়াদি তাকাল ওর দিকে। তারপর মুখটা নামিয়ে নিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমায় সবাই এমন করে দূরে ঠেলে দেয় কেন বল তো? আমি কি মানুষ নই? মা-বাবা নেই আমার। দাদারা অমন করে! তোকে ভাল লাগে আমার। তোর চেয়ে বয়সে বড় আমি, কিন্তু কী করব! ভাল লাগা কি ওভাবে বয়স দেখে আসে! তুই আমার সঙ্গে এমন করলে আমার খুব খারাপ লাগে! ঠিক আছে, তোকে করতে হবে না কাজ। আমার কাছে আসতেও হবে না। আমি তোর ভাইকে যেমন দেখছি দেখব। কেমন? আমি নিজে থেকে তোর কাছে আসি বলে কি আমার মানসম্মান নেই!”
আচমকা এমন কথায় অবাক হল মাহির। সত্যি বলছে তুয়াদি? নাকি এটাও ইয়ারকি! মানে, সত্যি ওকে আর তুয়াদিকে খুশি করতে হবে না!
তুয়াদি বলল, “যা, আজ থেকে ছেড়ে দিলাম তোকে। আর কিছু করতে হবে না। আমি একা, একাই ভাল। তোকে আর জড়াব না। আমি আসি।”
মাহিরের কথার অপেক্ষা না করে তুয়াদি দরজা খুলে বেরিয়ে গেল!
মাহির কী বলবে কিছু বুঝতে পারল না। কিন্তু মনের ভেতরে কোথাও একটা হাঁপ ছাড়ল যেন! মনে হল বুকের ওপর থেকে বোঝা নামল! হঠাৎ হালকা লাগল মাহিরের। প্রথমে রিতুদা, তারপর তুয়াদি। এক-এক করে এইসব ভুলভাল মানুষগুলোকে কাটিয়ে দিচ্ছে ও। এটা ভাল ব্যাপার। পলির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে ও। মাহির ঠিক করল, জ্বরটা ছাড়লে আবার প্র্যাকটিসে যাবে। পতাদাকে ঠিক হাতে-পায়ে ধরে ম্যানেজ করে নেবে। মন দিয়ে ফুটবলটা খেলবে। স্পোর্টসম্যান ও, এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে না। পড়াশোনায় পারেনি, কিন্তু খেলাটায় পারতেই হবে ওকে। পলির জন্য নিজেকে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই হবে। ভাইয়ের চিকিৎসার ব্যাপারটাও দেখবে। কিছু একটা তো করবেই! কিন্তু আর এসব নয়। মানুষ হওয়ার সময় এসেছে! ও মাথা তুলে দেখল, টিকটিকিটা আরশোলাটাকে ধাওয়া করছে এখনও, কিন্তু বাগে আনতে পারছে না! চোয়াল শক্ত হয়ে গেল মাহিরের। জীবন ওকে খাওয়ার জন্য হাঁ করে রয়েছে! কিন্তু ও সেটা হতে দেবে না। ডিফেন্ডার হয়ে খেলতে-খেলতে ও কেমন যেন গুটিয়ে ছিল এতদিন! বহুত হয়েছে ডিফেন্সিভ, আর নয়! এবার উলটো মার দেওয়ার সময় এসেছে।
নিজের ভেতরে কেমন একটা উদ্দীপনা আসছে মাহিরের। মনে হচ্ছে সব শালাকে একাই দেখে নিতে পারবে। শুধু পলি যেন পাশে থাকে। ও দেওয়ালে ঝোলানো মা কালীর ফোটোর দিকে তাকিয়ে প্রণাম করল। এসব কোনওদিন করে না মাহির। কিন্তু আজ মনে হল একবার স্মরণ করে! মনের মধ্যে একটা জোর পেল ও। ভাল কিছু করার জোর। মানুষের মতো কিছু করার জোর।
টাকাটা হাতে নিয়ে বাইরে বেরোল মাহির। কিন্তু দরজায় তালা দিল না। টেনে দিল শুধু। এখানে সবাই চেনে ওকে। তা ছাড়া এখন বাড়ির সামনে সব পাড়ার ছেলেরা রয়েছে। ক্যারম বোর্ড পেতে খেলছে। মাহিরকে সবাই সমীহ করে চলে।
সতুয়ার দোকানটা তিন-চারটে বাড়ি পরে। মাহির দেখল বেশ ভিড় আছে। ও দাঁড়াল একপাশে। বয়স্ক মানুষ এসেছে কয়েকজন। তার মধ্যে পরানদাকেও দেখল।
পরানদা কিছু না বলে হাসল।
মাহির জিজ্ঞেস করল, “সব ঠিক আছে?”
পরানদা বলল, “হ্যাঁ। আর তোর অমন কিছু হয় না? সেদিন শালা ব্যাপক সাঁটিয়েছিলাম! আর হয় না?”
মাহির হাসল, “হলে জানাব। তুমি মুড়ি নাও। সতুয়া হাত বাড়িয়ে রয়েছে।”
পরানদা ঘুরে মুড়ি নিল এবার। তারপর হাত নেড়ে বেরিয়ে গেল।
“দশ টাকার মুড়ি মেখে দে, তেল কম দিবি, আর দুটো কাঁচালঙ্কা…” চার-পাঁচজনের মাথার ওপর দিয়ে নোটটা সামনে বাড়িয়ে দিল মাহির।
“আরও দশ টাকার দিস আলাদা করে,” মাহির পাশ থেকে গলা পেল একটা। মুখ ঘুরিয়ে দেখল টিটি এসে বাইকটা দাঁড় করিয়েছে পাশে।
“তুই?” মাহির অবাক হল।
“কেন? আসতে পারি না?”
মাহির হাসল, “তোর না আজ বিরাটি থেকে কীসব পেপার দিয়ে আসার কথা ছিল! যাসনি?”
“গেছিলাম। হয়ে গিয়েছে কাজ। রিতুদার কাছে পেপার দিয়ে এসেছি। পার্টি অফিসে শুনলাম তোর ওপর নাকি রিতুদা খচে আছে! তুই যাচ্ছিস না! ফোন তুলছিস না! আমি বললাম ওর জ্বর হয়েছে। কিন্তু মানছে না কেউ। কী করছিস মাহির? নিজের পেছনে নিজে আছোলা দিচ্ছিস! কেন? আগেও একবার এমন করেছিলি মনে আছে? মনে আছে রিতুদা কেলিয়েছিল তোকে!”
